সাক্ষাৎকার : এমা জু
কৃষকের দোরগোড়ায় সংরক্ষণ সুবিধা পৌঁছানো জরুরি
এমা জু
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিতে চীনের একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি বাংলাদেশে আসে। চীনের ইউনান ফরেস্ট্রি টেকনোলজিক্যাল কলেজের শিক্ষক, গবেষক ও সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত প্রতিনিধি দলটির নেতৃত্ব দেন দেশটির ইউনান প্রদেশের বাণিজ্যবিষয়ক বৈদেশিক প্রতিনিধি কার্যালয়ের কর্মকর্তা এমা জু। চীনের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নে কাজ করেন তিনি। প্রশিক্ষণের এক ফাঁকে এমা জু বাংলাদেশে কৃষিতে বিভিন্ন উদ্যোগ ও বাংলাদেশ-চীন কৃষি সহযোগিতা নিয়ে সমকালের সঙ্গে কথা বলেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাহিদুর রহমান
সমকাল: আপনারা যে প্রশিক্ষণ দিতে এসেছেন, এর উদ্দেশ্য কী? ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-চীন কৃষি সহযোগিতা কোন দিকে যেতে পারে?
এমা জু: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ছয় দিনের প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছে। এতে মাঠপর্যায়ের ৪৬ জন কর্মকর্তা অংশ নিচ্ছেন। আমাদের চারজন বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। তারা মূলত মাটি ছাড়া কীভাবে চাষাবাদ করা যায়, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। বাংলাদেশে এসে এই প্রশিক্ষণ দিতে পেরে আমরা আনন্দিত। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পেঁয়াজ সংরক্ষণাগার পরিদর্শনের সুযোগ হয়েছে। বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য এগুলো খুব দরকারি উদ্যোগ বলে মনে হয়েছে।
চীনের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, কৃষির আধুনিকায়ন শুধু উৎপাদনের প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না। উৎপাদনের পর কৃষিপণ্য কীভাবে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করা হচ্ছে, তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশেও উৎপাদনের পাশাপাশি পণ্য সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিনির্ভর প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
আমি আশা করি, এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে কৃষি প্রযুক্তি বিনিময়ের সুযোগ আরও বাড়বে। আমরা ভবিষ্যতে বিশেষ করে
কৃষি খাতে আরও প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করতে আগ্রহী। বাংলাদেশের কৃষকের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া, তাদের ফসলের অপচয় কমানো এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার–এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে এগিয়ে নিতে পারলে এ দেশের কৃষিতে বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সমকাল: বাংলাদেশের কৃষকদের ছোট আকারের হিমাগার বা ফারমার্স মিনি কোল্ডস্টোরেজ এবং সৌরশক্তিচালিত পেঁয়াজ সংরক্ষণব্যবস্থা দেখেছেন। এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
এমা জু: দুটি উদ্যোগই আমার কাছে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও সম্ভাবনাময় মনে হয়েছে। কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু উৎপাদিত ফসল সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারলে কৃষক তার সুফল পান না। বিশেষ করে ফল ও সবজি দ্রুত নষ্ট হয়। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কৃষক অনেক সময় ফসল তোলার পরপরই বিক্রি করতে বাধ্য হন। তখন বাজারে সরবরাহ বেশি থাকলে দামও কমে যায়।
কৃষকের কাছাকাছি ছোট আকারের হিমাগার থাকলে তিনি কিছু সময়ের জন্য সেখানে পণ্য সংরক্ষণ করে বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী বিক্রি করতে পারবেন। এর ফলে সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমবে এবং কৃষকের বাজারজাত করার সক্ষমতা বাড়বে। ছোট হিমাগারের বড় সুবিধা হলো সংরক্ষণ সুবিধাটি কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। দূরে পণ্য পরিবহনের প্রয়োজন কমে যায়, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণও তুলনামূলক সহজ। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা ঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে টমেটো, কাঁচামরিচ, গাজর ও বিভিন্ন ফলের মতো পচনশীল পণ্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ভালো রাখা সম্ভব।
এতে খাদ্যের অপচয় কমবে এবং কৃষক কখন বাজারে পণ্য ছাড়বেন, তা নিজের মতো করে ঠিক করতে পারবেন।
পেঁয়াজ সংরক্ষণের মডেলটিও খুব আকর্ষণীয়। আমরা যে ব্যবস্থা দেখেছি, সেটি সম্পূর্ণ সৌরশক্তিতে পরিচালিত এবং প্রায় ২০০ মণ বা সাড়ে সাত টন পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে। উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় সেখানে ছয় থেকে আট মাস পর্যন্ত পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যাবে। পেঁয়াজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্তরের মধ্যে তাপ ও আর্দ্রতা জমে গেলে পচন ও অঙ্কুরোদ্গম বাড়তে পারে এবং ওজন ও গুণগত মান কমে যায়। সৌরশক্তিচালিত ফোর্সড এয়ারফ্লো ব্যবস্থায় পেঁয়াজের স্তরের ভেতর দিয়ে বাতাস চলাচল করানো হয়। এতে অতিরিক্ত তাপ ও আর্দ্রতা অপসারণে সহায়তা পাওয়া যায় এবং সংরক্ষণের পরিবেশ ভালো থাকে।
মৌসুমে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ একসঙ্গে বাজারে আসে। তখন সংরক্ষণের সুযোগ না থাকলে কৃষক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হতে পারেন। স্থানীয় পর্যায়ে কম খরচে সংরক্ষণ করা গেলে তিনি ধাপে ধাপে পেঁয়াজ বাজারজাত করতে পারবেন। এতে সংগ্রহোত্তর ক্ষতি কমার পাশাপাশি কৃষকের আয় বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সমকাল: বাংলাদেশে সৌরশক্তি ব্যবহারকে আপনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?
এমা জু: চীনে কৃষি, শিল্প, আবাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সৌরশক্তির ব্যবহার বিস্তৃত হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও কৃষি এলাকায় নবায়নযোগ্য শক্তি দীর্ঘ মেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশেও প্রচুর সূর্যালোক পাওয়া যায়। তাই কৃষিতে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়; সেচ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, শুকানো, বায়ু চলাচলসহ বিভিন্ন সংগ্রহোত্তর প্রযুক্তিতে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
আমি যে উদ্যোগগুলো দেখেছি, সেখানে কৃষি প্রযুক্তির সঙ্গে সৌরশক্তির সমন্বয়ের চেষ্টা
রয়েছে। এটি পরিচালন ব্যয় কমাতে পারে এবং যেখানে গ্রিড বিদ্যুতের সুবিধা সীমিত, সেখানেও প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে জলবায়ু সহনশীল ও টেকসই কৃষির জন্যও এটি ইতিবাচক।
সমকাল: এসব প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের আগে কোন বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া দরকার?
এমা জু: নতুন প্রযুক্তি সম্প্রসারণের পর নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ দরকার। বিভিন্ন মৌসুমে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, পণ্যের ওজন হ্রাস, পচন, অঙ্কুরোদ্গম এবং সংরক্ষণকাল পর্যবেক্ষণ করতে হবে। স্থানীয় আবহাওয়া, কৃষকের ব্যবহার, পণ্যের ধরন এবং পরিচালন ব্যয় বিবেচনায় নিতে হবে। মাঠপর্যায়ের ফল ও কৃষকের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করা সম্ভব।
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার