ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নদীর বুকে নোঙর করা ‘জীবনতরী’

নদীর বুকে নোঙর করা ‘জীবনতরী’
×

আধুনিক চিকিৎসাবঞ্চিত চরবাসীর কাছে এই নৌযান এক আস্থার ঠিকানা

এমদাদুল হক মিলটন

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:৫৫ | আপডেট: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:০০

ভোরের স্নিগ্ধ আলো ফুটতে না ফুটতেই ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে ওঠে অন্য রকম এক কর্মচাঞ্চল্য। নদীর হিমেল হাওয়া উপেক্ষা করে বালুচর ধরে হেঁটে আসছেন শত শত মানুষ। কারও হাতে পুরোনো জীর্ণ চিকিৎসাপত্র, কেউ এসেছেন স্বজনের কাঁধে ভর করে, আবার কারও কোলে অসুস্থ শিশু। দুর্গম চর পেরিয়ে আসা এসব মানুষের গন্তব্য একটিই–ভাসমান এক হাসপাতাল। আধুনিক চিকিৎসাবঞ্চিত চরবাসীর কাছে এই নৌযান যেন এক আস্থার ঠিকানা।

শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে গাইবান্ধার কামারজানি চরে এসেছেন ৭২ বছর বয়সী আনছার আলী। দীর্ঘ এক বছর ধরে তাঁর বাম চোখে বাসা বেঁধেছিল ছানি। ধীরে ধীরে দৃষ্টি ঝাপসা হতে হতে একসময় তা অন্ধত্বের পর্যায়ে চলে যায়। ছেলে আবদুল আউয়ালের হাত ধরে ভাসমান এ হাসপাতালে এসেছিলেন আনছার আলী। মাত্র ২০ টাকা খরচে তাঁর চোখে সফল অস্ত্রোপচার হয়েছে। চোখের ব্যান্ডেজ খোলার পর হারিয়ে যাওয়া দৃষ্টি ফিরে পেয়ে আনছার আলীর মুখের রেখায় যে তৃপ্তির হাসি ফুটেছে, তা অমূল্য। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ছেলে আবদুল আউয়াল বলেন, ‘এত দূর থেইকা আইছি, কষ্ট হইছে ঠিকই, কিন্তু বাপজানের চোখ ভালো হইছে– এইডাই সবচেয়ে বড় কথা।’

একই রকম স্বস্তির ঝিলিক বগুড়ার সারিয়াকান্দি থেকে আসা মিজানুর রহমানের চোখেমুখেও। ভাসমান হাসপাতালে এসে চোখের অস্ত্রোপচার করানোর পর ৫৫ বছর বয়সী এই মানুষটি তাঁর চিরচেনা পৃথিবীটাকে যেন নতুন করে ফিরে পেয়েছেন। 

শুধু বয়স্করাই নন, জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলা থেকে আট বছরের শিশু আলিফকে নিয়ে এসেছিলেন তার বাবা নূর হোসেন। ছেলেটি দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছিল। ভাসমান হাসপাতালের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, আলিফ জন্মগতভাবে রক্তের একটি জটিল রোগে আক্রান্ত। সঠিক রোগ নির্ণয়ের পর একটি সুস্পষ্ট চিকিৎসাপত্র হাতে নিয়ে কিছুটা নিশ্চিন্ত মনে বাড়ি ফিরেছেন আলিফের স্বজনরা।

বাংলাদেশের চরাঞ্চলের মানুষের জীবন প্রতিনিয়ত নদীভাঙন আর বন্যার সঙ্গে যুদ্ধ করে কাটে। দীর্ঘ নৌপথ আর অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে সময়মতো চিকিৎসকের কাছে যাওয়া তাদের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। চরবাসীর এই ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার দেয়াল ভাঙতে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছে ‘লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল’। ২০০২ সালে ফ্রান্স থেকে আনা একটি বার্জকে পূর্ণাঙ্গ ভাসমান হাসপাতালে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এই মানবিক যাত্রার শুরু। ইউনিলিভারের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্র্যান্ড ‘লাইফবয়’ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা ‘ফ্রেন্ডশিপ’-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই হাসপাতালের মূল লক্ষ্য–দুর্গম এলাকার সুবিধাবঞ্চিত মানুষের দোরগোড়ায় বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া।

তীরে ভেড়ানো এ নৌযানের নিচের ডেকে থাকেন চিকিৎসক ও কর্মীরা। সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি এখানে মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, চোখ, দাঁত ও চর্মরোগের চিকিৎসা এবং বিভিন্ন জটিল অস্ত্রোপচার ও প্যাথলজি পরীক্ষা করা হয়। প্রত্যন্ত চর থেকে রোগীদের আনা-নেওয়ার জন্য রয়েছে হাসপাতালটির নিজস্ব দুটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স ও ট্রলার।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত হাসপাতালটি আট লাখ ১৬ হাজারের বেশি রোগীকে দিয়েছে ১৩ লাখ ৫০ হাজারের বেশি চিকিৎসাসেবা। ৪৮৯টি সার্জিক্যাল ক্যাম্পের মাধ্যমে ১৯ হাজারেরও বেশি সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ২০২৫ সালেই ৪৮ হাজার ৭৮৪ জন রোগী এখান থেকে সেবা পেয়েছেন।

সম্প্রতি গাইবান্ধার কামারজানি চরঘাট এলাকায় হাসপাতালটির কার্যক্রম পরিদর্শনে আসেন ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুহুল কুদ্দুস খান। এ সময় ফ্রেন্ডশিপ হেলথের উপপরিচালক ডা. রাফি আবুল হাসনাত সিদ্দিক এবং লাইফবয় ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. জিয়াউল করিমসহ অন্যান্য কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। 

রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে রুহুল কুদ্দুস খান বলেন, ‘সুস্বাস্থ্য মানুষের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়। একজন মানুষ সুস্থ হয়ে উঠলে এর সুফল কেবল তাঁর নিজের জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, পুরো পরিবারে ফিরে আসে স্বস্তি। চরাঞ্চলের মানুষের জন্য চিকিৎসা মানে শুধু রোগ সারানো নয়; এর মানে হলো, কারও কাজে ফিরে যাওয়া, কারও সংসারের চাকা সচল হওয়া এবং কোনো শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ।’

আরও পড়ুন

×