রংপুরে ৪ খুন
রাত থেকেই ছাদে ছিলেন অভিযুক্তরা, হত্যাকাণ্ড ভোরে: পুলিশ কমিশনার
ছবি: সমকাল
মিঠাপুকুর (রংপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:১৩ | আপডেট: ২৭ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:৫৩
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের তিনজনকে হত্যার ঘটনায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন দুই অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তাদের জবানবন্দির বিস্তারিত তুলে ধরেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
তিনি জানান, ঘটনার দিন ভোরে ছাদে হাঁটাহাটি করতে গিয়ে অভিযুক্ত মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে ইয়াবা সেবন করতে দেখেন গণপতি চক্রবর্তী। তিনি তাদের ধমক দেন। তখন ইয়াবা সেবনের বিষয়টি যাতে জানাজানি না হয়, সেজন্য গণপতিকে হত্যা করেন দুই অভিযুক্ত।
ফরেনসিক, ময়নাতদন্ত ও জবানবন্দি অনুযায়ী মা-মেয়ে ধর্ষণের শিকার হননি বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
জবানবন্দির সূত্রে তিনি আরও জানাযন, ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দাস তাদের বন্ধু সীমান্ত দাসের বাড়িতে তিনটি ইয়াবা বড়ি সেবন করেন। পরে মোবাইল বন্ধক রেখে ইয়াবা ব্যবসায়ী শান্তর কাছে আরও কয়েকটি ইয়াবা নিয়ে পাশের নির্মাণাধীন ভবন হয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান। ভোরে ছাদে হাঁটাহাটি করতে গিয়ে তাদের দেখে ফেলেন গণপতি চক্রবর্তী।
রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার জানান, গণপতি চক্রবর্তীর গলায় থাকা গামছা দিয়েই তাকে হত্যা করে দুই অভিযুক্ত। এ সময় ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। শব্দ পেয়ে ছাদে ওঠেন গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী। এ সময় তারা প্রীতিলতা ও আগামীকে ধরে ফেলেন। প্রীতিলতাকে গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন। পরে পাশের কবুতরের বাসার দড়ি গলায় পেঁচিয়ে আগামীকে হত্যা করেন। এরপর পাশের বাসার ছাদ থেকে যাতে দেখা না যায়, এ জন্য প্রীতিলতা ও আগামীর লাশ টেনে সিঁড়ির দিকে নিয়ে যান।
পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘এর মধ্যে ওই বাড়ির ছোট ছেলে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের ঘুম ভেঙে যায়। সিদ্ধার্থকে দেখে প্রিয়ম বলে, ‘দাদা তুমি এখানে কেন?’ এ কথা বলার পরপরই তাকেও হত্যা করে অভিযুক্তরা।’
তিনি আরও জানান, চারজনকে হত্যার পর তারা গোসল করে। পরে তারা কাছে থাকা একটি ইয়াবা সেবন করে। খেজুর ও শসা খায়। হত্যাকাণ্ডটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে ভাঙচুর ও জিনিসপত্র এলোমেলো করে রাখে। বাড়িতে তারা স্বর্ণের গয়না ও ১৫ হাজার টাকা পায়। স্বর্ণ আসল না নকল, সেটি পরীক্ষা করে দেখে। এসব ঘটনার পর বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকার সন্দেহে ছাদে পাওয়া একটি প্লায়ার্স দিয়ে বৈদ্যুতিক লাইন বিচ্ছিন্ন করে। সুযোগ বুঝে দুপুরের দিকে সেখান থেকে বেরিয়ে যায় তারা।
মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, গণপতি চক্রবর্তী ব্রাহ্মণ সমাজের মানুষ ছিলেন। আর মাসুয়াপাড়ায় অধিকাংশই দাস জাতের মানুষ বসবাস করেন। প্রতিবেশী সিদ্ধার্থরাও দাস। ব্রাহ্মণ সমাজের হওয়ায় তিনি খুব একটা মিশতেন না অন্যদের সঙ্গে। এ ছাড়া গণপতি চক্রবর্তী বেশি টাকা দিয়ে সিদ্ধার্থ দাসের পরিবারের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে জমি কেনেন। তিনি জানান, জমি-সংক্রান্ত বা জাতের ভিন্নতার কারণে কোনো ক্ষোভ থেকে হত্যার ঘটেছে কিনা, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, যখন সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস যখন প্রীতিলতা ও আগামীর গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরে, তখন চিৎকার করেন তারা। এই চিৎকার প্রতিবেশীরা শুনলেও বিষয়টি নিয়ে কেউ মুখ খোলেননি। এরই মধ্যে এক ভদ্রমহিলা চিৎকার শোনার কথা বললেও পরবর্তীতে স্বামীর নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয়ে তিনি এ বিষয়ে আর কোনো তথ্য দেননি।
রংপুরের পুলিশ জানিয়েছে, গণপতি ও তার পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে অভিযুক্ত সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। তারা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তাদের ডোপ টেস্ট করা হবে বলে জানিয়েছেন মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। ডোপ টেস্ট ও ডিএনএ টেস্ট করার প্রক্রিয়া চলমান বলে জানান তিনি।
এ ঘটনায় মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের বন্ধু সীমান্ত দাস ও শ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাসের সাক্ষ্যগ্রহণ আদালতের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তাদের দুজনের সাক্ষ্যের সঙ্গে অভিযুক্ত মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের বক্তব্যের মিল রয়েছে বলে উল্লেখ করেন মহানগর পুলিশ কমিশনার।