ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জেলখানা থেকে পলাতক ১২৪ মামলার আসামি আনিচ গ্রেপ্তার

জেলখানা থেকে পলাতক ১২৪ মামলার আসামি আনিচ গ্রেপ্তার
×

ছবি: সমকাল

কুমারখালী (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২১:৪২

অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার ১২৪টি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত এবং সাজাপ্রাপ্ত, জেলখানা থেকে পলাতক আসামি মো. আনিছুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানা পুলিশ। বুধবার রাত ১২টার দিকে ঢাকার বিমানবন্দর থানা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে প্রেরণ করে পুলিশ।

আনিছুর রহমার কুমারখালীর নন্দলালপুর ইউনিয়নের সদরপুর গ্রামের মৃত ইব্রাহিম বিশ্বাসের ছেলে। তিনি ২০০৬ সালে নন্দলালপুর ইউনিয়নের আলাউদ্দিন নগর এলাকায় বিশ্বাস ফাউন্ডেশনের নামে বিশ্বাস সঞ্চয়, ঋণদান ও সমবায় সমিতি লিমিটেড নামক একটি প্রতিষ্ঠান খুলে বসেছিলেন।

পুলিশ, এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আনিছুর রহমান ২০০৬ সালে আলাউদ্দিন নগর এলাকায় বিশ্বাস সঞ্চয়, ঋণদান ও সমবায় সমিতি লিমিটেড নামে একটি এনজিও চালু করেন। আলাউদ্দিননগর থেকে এনজিওর মূল কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। কয়েক বছরের মধ্যে কুষ্টিয়া, রাজবাড়ী, পাবনা, ঝিনাইদহসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলায় কয়েক শ’ শাখা খুলেন। সেখানে তিনি দ্বিগুণ টাকা ফেরত দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে হাজার হাজার গ্রাহকদের কাছ থেকে বিভিন্ন মেয়াদি ডিপিএসের নামে মোটা অঙ্কের টাকা জমা রাখতেন। একপর্যায়ে কয়েক শ’ কোটি টাকা জমা হলে তিনি তা দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি, বাড়ি, গাড়িসহ বিভিন্ন সম্পদের মালিক হতে থাকেন। ২০২৩ সালের শুরুতেই এনজিওকর্মীরা বিষয়টি অনুমান করতে পেরে তাদের লগ্নীকৃত টাকার জন্য চাপ দিতে থাকেন। এরপর ২০২৩ সালের নভেম্বরে তিনি অফিসে তালা ঝুলিয়ে লাপাত্তা হয়ে যান। 

আরও জানা গেছে, ২০২৪ সালের শুরর দিকে কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন আদালতে আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার প্রায় ১২৪ মোট মামলা হয় এবং আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এছাড়াও ১২টি মামলায় বিভিন্ন মেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত হন তিনি। এরপর ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল বিদেশে পালানের সময় ঢাকা আন্তর্জাতিক শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে কুষ্টিয়া জেলখানায় পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট দুপুরে কারাগারের প্রধান ফটক ভেঙে প্রতারক আনিছুর রহমানসহ ১০৪ আসামি পালিয়ে যান।

কুমারখালী থানার উপপরিদর্শক সোহাগ শিকদার বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির সহযোগিতায় এএসআই শরিফ ও কনস্টেবল রাশেদসহ অভিযান চালিয়ে ঢাকা বিমানবন্দর থানা এলাকা থেকে আনিছুরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালতে ১২৪ মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। তারমধ্যে ১২টি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত।

এদিকে, প্রতারক আনিছুর রহমানের গ্রেপ্তারের খবর শুনে অনেক গ্রাহক থানায় ছুটে আসেন। পরে পুলিশ তাদেরকে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেন। আজ বৃহস্পতিবার সকালে কুমারখালী থানা চত্বরে সরেজমিন গিয়ে এ দৃশ্য দেখা গেছে। এ সময় রাজবাড়ীর পাংশার মাছপাড়া এলাকার মৃত আকবর আলীর ছেলে আব্দুল মাজেদ (৬৪) বলেন, সারা জীবন গার্মেন্টসে চাকরি করে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা জমছিল। চার বছরে দ্বিগুণ লাভের আশায় আনিছের বিশ্বাস এনজিওতে রাখছিলাম। কিন্তু দুই বছরের মাথায় সব টাকা নিয়ে পালায়ে গিছিল আনিস। গ্রেপ্তারের খবর শুনে থানায় আসছি। তার স্ত্রী বিনা খাতুন বলেন, দ্বিগুণ লাভের আশায় এখন সব শেষ। সর্বহারা হয়ে থানায় এসেছি। পুলিশ বলছে কোর্টে মামলা করতে।

২০১৩ সাল থেকে বিশ্বাস ফাউন্ডেশনের এনজিওতে চাকরি করেছেন কুমারখালীর শিলাইদহ ইউনিয়নের জাহেদপুর গ্রামের গোলাম রব্বানীর স্ত্রী জাহানারা খাতুন। তিনি বৃহস্পতিবার থানা চত্বরে দাঁড়িয়ে বলেন, চাকরি, বেতন, বোনাস, জমির ইজারা, গরু-ছাগল বিক্রিসহ মোট প্রায় ৩০ লাখ টাকা দিয়েছিলাম আনিছরে। সব মারে দে চলে গেছে। তার ভাষ্য, এনজিওর নামে আনিছ প্রায় ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে নিজের নামে বাড়ি, গাড়িসহ সম্পদের পাহাড় গড়েছে।

প্রতারক আনিছুরের ভাগনি বিনা খাতুন বলেন, দ্বিগুণের লাভের আশায় মামার কাছে তিন লাখ টাকা রাখিছিলাম। কিন্তু এখন সব শেষ হয়ে গেছে। হয় টাকা ফেরত দিক, নইলে ওর ফাঁসি দিক সরকার।

কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে সুকৌশলে আনিছ কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আদালতে মামলার পর তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ৭ আগস্ট জেল থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তারের খবর শুনে অনেক ভুক্তভোগী থানায় এসেছিল বলে জানান ওসি।

আরও পড়ুন

×