ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডোপ টেস্টের শুরুতে হোঁচট, সরকারি বরাদ্দ নেই

ডোপ টেস্টের শুরুতে হোঁচট, সরকারি বরাদ্দ নেই
×

ফাইল ছবি

শাহারিয়ার রহমান রকি, ঝিনাইদহ

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪০ | আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঝিনাইদহে মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গত ১৪ জুলাই মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের নমুনা পরীক্ষা (ডোপ টেস্ট) শুরু করে জেলা পুলিশ। তবে এ খাতে সরকারি বরাদ্দ না থাকায় শুরুতে এ কার্যক্রম হোঁচট খেয়েছে। সূত্র জানায়, সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা উপপরিদর্শকদের ডোপ টেস্টের খরচ দিতে হয়। এ কারণে মাদকসেবী শনাক্ত কার্যক্রম থমকে যাওয়ার শঙ্কা করছেন অনেকে। 
পুলিশের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ জুলাই থেকে তারা ডোপ টেস্ট শুরু করেছে। মাদক ব্যবসায়ী, সেবনকারী ও মাদকে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আটক বা গ্রেপ্তার ব্যক্তির নমুনা পরীক্ষা করা হয়। রিপোর্ট পজিটিভ এমন ব্যক্তিদের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত বিচারের (সামারি ট্রায়াল) মাধ্যমে বিচারক অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় দণ্ডাদেশ দেন। 
পুলিশ ও আদালত থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে। ১৪ জুলাই থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২২২ মাদকসেবীর বিরুদ্ধে ১৭৫টি মামলা হয়েছে। বিচারক তাদের অপরাধ বিবেচনায় নিয়ে ১৫ দিন থেকে এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন। তাদের মধ্যে সদর থানার ৩৫ মামলায় ৫০ জনকে, শৈলকুপায় ৭৮ মামলায় ৮৫ জনকে, হরিণাকুণ্ডুতে ৮ মামলায় ১২ জনকে, কালীগঞ্জে ২৩ মামলায় ২৯ জনকে, কোটচাঁদপুরে ৮ মামলায় ১০ জনকে ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ২৩ মামলায় ৩৫ জনকে দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার জেলা সদর হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট থানা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে দেখা যায়, একই সময়ে ২৩৫টি ডোপ টেস্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে ২২২টির ফল পজিটিভ আসে। সর্বোচ্চ ১০০টি টেস্ট করেছে শৈলকুপা থানা। এ ছাড়া সদর থানা ৫৩টি, ডিবি ৩৫টি, কালীগঞ্জ থানা ২৯টি, কোটচাঁদপুর ১০টি ও হরিণাকুণ্ডু থানা পুলিশ ৮টি টেস্ট করেছে। মহেশপুর থানা কোনো টেস্ট করেনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডোপ টেস্টের জন্য ল্যাব, কিট ও অন্যান্য সুবিধা নেই। এ কারণে শুধু জেলা সদর হাসপাতালেই টেস্ট করা হয়। এ জন্য জনপ্রতি খরচ হয় ৯৫০ টাকা। মামলার তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা এসআই, ওসিরাই ব্যক্তিগতভাবে এ খরচ দেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন এসআই সমকালকে বলেন, প্রতিটি টেস্টে যে খরচ হয়, তারা কোথা থেকে পাবেন? জরুরি প্রয়োজনেই তারা নিজের থেকে দেন। কিন্তু পরে যদি টাকা না পান তাহলে এই ঘাটতি পূরণ হবে কী করে?

কালীগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গৌরাঙ্গ কুমার বসুর ভাষ্য, এই খাতে সরকারি কোনো বরাদ্দ নেই। এখন পর্যন্ত প্রতিটা টেস্ট তারাই টাকা দিয়ে করিয়েছেন। শৈলকুপা থানার ওসি হুমায়ূন কবির মোল্লা বলেন, ‘শুধু আগামীর শৈলকুপা থেকে ৪২ হাজার টাকা পেয়েছি। আরও কিছু সহযোগিতা দিতে চেয়েছেন। বাকি টেস্ট আমাদের নিজেদের টাকা দিয়ে করেছি।’ তাঁর ভাষ্য, ‘নিজের পকেট থেকে কত টাকা এভাবে খরচ করতে পারব, জানি না। খরচের জন্য মানুষের কাছে হাত পাততেও পারব না।’ সরকার টাকা বরাদ্দ না দিলে এক সময় তাদের মধ্যে আগ্রহ হারিয়ে যাবে বলেও স্বীকার করেন। 

স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী শরিফা খাতুনের ভাষ্য, ডোপ টেস্ট হলে সঠিকভাবে মাদকসেবী শনাক্ত করা যায়। এটি মাদক নিয়ন্ত্রণে খুবই উপকারী। এ জন্য সরকারি বরাদ্দ জরুরি। তা না হলে এই উদ্যোগ অবহেলায় হারিয়ে যেতে পারে।

কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে, এই কয়েক মাসের মধ্যে স্থানীয় কিছু সংস্থা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পুলিশকে কিছু টাকা সহায়তা করেছে। এর মধ্যে সামাজিক সংগঠন ‘আগামীর শৈলকুপা’ থেকে শৈলকুপা থানা পুলিশকে ৪২ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। জেলা পরিষদ ৭০টি পরীক্ষার খরচ দিয়েছে। জোহান পার্ক কিছু টেস্টের খরচ দিয়েছে। জেলা প্রশাসকও এ জন্য টাকা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সেই টাকা এখনও হাতে পায়নি পুলিশ। 

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তারা দিনে ২০-৩০টি ডোপ টেস্ট করছেন। এদের মধ্যে পুলিশ কখনও চার-পাঁচজন করে আসামি নিয়ে আসে। ডোপ টেস্টের কিট সরকারি এমএসআর সামগ্রীর মাধ্যমে বরাদ্দ হয়। প্রতিটি পরীক্ষার জন্য সরকার নির্ধারিত ৯০০ টাকা ফি নেওয়া হয়। এই টাকা রাজস্ব খাতে জমা দেন। এই টেস্ট বিনা খরচে করার কোনো নির্দেশনা নেই।

ঝিনাইদহের পুলিশ সুপার মিয়া মোহাম্মদ আশিস বিন্‌ হাছানের ভাষ্য, ‘সমাজের মানুষ, বিভিন্ন পরিবার থেকেও চাইছে মাদক সেবনকারী শনাক্ত হোক, তারা আইনের আওতায় আসুক। সে কারণেই ডোপ টেস্ট। তবে এই কাজে আমাদের সরকারি বরাদ্দ নেই। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাই খরচ বহন করছেন। এই টাকা তারা ফেরত পাবেন অনুদান পেলে। তবে ঠিক কবে, বলা যাচ্ছে না।’ এভাবে পকেটের টাকা খরচ করতে হলে পুলিশ কর্মকর্তাদের আগ্রহ হারাবে কিনা– এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কেউ টাকা না দিলে সামারি ট্রায়ালে যাব না; তখন গতানুগতিক মামলা হবে। এ ক্ষেত্রে আগ্রহ হারানো অস্বাভাবিক না।’ সরকারি হাসপাতালে ডোপ টেস্ট বিনা খরচে করা গেলেই ভালো হয় বলে মনে করেন তিনি। 

আরও পড়ুন

×