ড্রেজিংয়ে প্রস্তুত চিলমারী-রৌমারী নৌপথ, বন্ধ ফেরি চলাচল
খননকাজে চিলমারী-রৌমারী নৌপথে ফিরেছে নাব্য। বৃহস্পতিবার চিলমারীর খেরুয়ারচর এলাকা থেকে তোলা সমকাল
চিলমারী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
খননকাজ শেষে চিলমারী-রৌমারী নৌপথে প্রয়োজনীয় পানির গভীরতা ফিরলেও সচল হতে পারেনি ফেরি সার্ভিস। নাব্য সংকটের অজুহাতে গত আগস্টে ফেরি চলাচল বন্ধ হওয়ার পর একে একে সবগুলো ফেরি সরিয়ে নেওয়া হয়। সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর একমাত্র সচল ফেরি ‘কদম’ মেরামতের কথা বলে নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডে পাঠানোর পর থেকে রুটটি এখন সম্পূর্ণ ফেরিশূন্য।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এই নৌপথে শুরুতে ‘কুঞ্জলতা’ এবং পরে ‘বেগম সুফিয়া কামাল’ ও ‘কদম’ নামে তিনটি ফেরি চালু করা হয়। এর মাধ্যমে চিলমারী নদীবন্দরে যোগাযোগ ব্যবস্থার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল। তবে তিন বছর না যেতেই এই নৌপথে নানা অজুহাতে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। তারা এই নৌপথে সরকারের বৃহৎ বিনিয়োগ ও সুফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্রে জানা গেছে, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিইজিআইএসের কারিগরি সহায়তায় জুলাইয়ের শেষ থেকে চারটি কাটার সাকশন ড্রেজার দিয়ে নিবিড় খননকাজ চালানো হয়েছে। চিলমারী ঘাট, রৌমারী ঘাট ও খেরুয়ার চর-সংলগ্ন সংকটাপন্ন পয়েন্টগুলোতে এখন ফেরি চলাচলের জন্য পর্যাপ্ত গভীরতা নিশ্চিত হয়েছে। নাব্য ধরে রাখতে বর্তমানে সংরক্ষণমূলক ড্রেজিং অব্যাহত রয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বিভাগের চিলমারী নদীবন্দরের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার কামরুজ্জামান সমকালকে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ‘ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নৌপথের সংকটাপন্ন এলাকায় প্রয়োজনীয় গভীরতা নিশ্চিত করা হয়েছে। বর্তমানে ফেরি চলাচলে কোনো বাধা নেই।’
এদিকে নৌপথে নাব্য ফিরলেও ফেরি চলাচল শুরু না হওয়ায় দ্রুত সার্ভিসটি চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএর পুরকৌশল শাখা (ড্রেজিং বিভাগ)। ফেরি সার্ভিস চালুর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গত ১০ সেপ্টেম্বর বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) সমীর চন্দ্র পাল স্বাক্ষরিত একটি চিঠি বিআইডব্লিউটিসির চিলমারী নদীবন্দরের সহব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) ও এরিয়া ইনচার্জের কাছে পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ড্রেজিংয়ের পরপর চ্যানেলটি সচল রাখা এবং নিয়মিত ফেরি চলাচল নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে অল্প সময়ের মধ্যে আবার পলি জমে নাব্য সংকট তৈরি হতে পারে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নৌপথ প্রস্তুত হলেও ফেরি না থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন পণ্যবাহী যানবাহনের চালকরা। বিকল্প দীর্ঘ পথ ঘুরে যাতায়াত করতে গিয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি ও সময় অপচয় হচ্ছে। পাশাপাশি পচনশীল পণ্য পরিবহনে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। এতে ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের ব্যয়ও বাড়ছে।
ট্রাকচালক মকবুল হোসেন বলেন, ‘ফেরি বন্ধ থাকায় আমাদের বিকল্প পথে ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও জ্বালানি দুটোই বেশি লাগে। পণ্য নিয়ে চলাচল করলে একেকটি ট্রিপে বাড়তি খরচ হয়। সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে। নৌপথ প্রস্তুত থাকলে দ্রুত ফেরি চালু করা দরকার।’
চিলমারী প্রেস ক্লাবের সভাপতি নজরুল ইসলাম সাবু বলেন, ‘এক দিকে নৌপথ সচল রাখতে ড্রেজিংয়ে সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে নৌপথ প্রস্তুত হওয়ার পরও ফেরি না থাকাটা সমন্বয়হীনতার প্রকাশ। ফেরি ছাড়া নৌপথ সচল রাখার সুফল মানুষ পাবে না। সংশ্লিষ্ট দুই সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করে দ্রুত ফেরি চালু করা এবং নাব্যতা ধরে রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং নিশ্চিত করা দরকার।’
রেল, নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটির সাবেক সভাপতি নাহিদ হাসান বলেন, ‘সরকারের বড় ধরনের অবকাঠামোগত বিনিয়োগের পর এভাবে ফেরি বন্ধ থাকা হতাশাজনক। দ্রুত বিকল্প ফেরি বরাদ্দের পাশাপাশি এ রুটে নাব্য ধরে রাখতে নিয়মিত ড্রেজিং করতে হবে। নদীর তলদেশে দ্রুত পলি জমলে আবারও নাব্য সংকট তৈরি হতে পারে। তাই ফেরি রুট সচল রাখতে নাব্য পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়মিত ড্রেজিং কার্যক্রম অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।’
বিআইডব্লিউটিসির চিলমারী নদীবন্দরের ম্যানেজার (বাণিজ্য) আতিক সোহেল আকাশ বলেন, ‘খনন বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী মেরিন অফিসার ও পাইলট বিভাগ পানির গভীরতা পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। সেই সঙ্গে ফেরি আসার জন্যও চিঠি দেওয়া হয়েছে।’
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসির পরিচালক (বাণিজ্য) এসএম আশিকুজ্জামান বলেন, ‘চিলমারী-রৌমারী নৌপথে প্রয়োজনীয় নাব্য থাকার বিষয়টি আমরা জেনেছি। ফেরি পাঠানোর বিষয়ে এখনই কিছু বলতে পারছিনা।’
- বিষয় :
- ফেরি চলাচল