ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অ্যাম্বুলেন্স চালক ও দালাল চক্রে জিম্মি রোগী স্বজনেরা

অ্যাম্বুলেন্স চালক ও দালাল চক্রে জিম্মি রোগী স্বজনেরা
×

ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে বৃহস্পতিবার রাতে দুর্ভোগে পড়েন এক রোগী সমকাল

ভেদরগঞ্জ (শরীয়তপুর) সংবাদদাতা:

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভেদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দালাল চক্রের কাছে রোগী ও স্বজনরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। হাসপাতাল চত্বরে অবস্থান নিয়ে কিছু প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স চালক ও তাদের সহযোগীরা পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। তাদের এই অরাজকতার কারণে ভোগান্তি ও আর্থিক শোষণের শিকার হচ্ছেন অসহায় মানুষ। 

দুটি থানা নিয়ে গঠিত ভেদরগঞ্জ উপজেলার ৪ লাখ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবার জন্য ১৯৭২ সালে ৩১ শয্যার এই হাসপাতালটি নির্মিত হয়। ২০১১ সালে এটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। পাশের চাঁদপুর ও মুন্সীগঞ্জ জেলাসহ আশপাশের এলাকা থেকে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ৯০০ রোগী জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। হাসপাতালের একমাত্র সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি নষ্ট পড়ে আছে এবং কোনো চালক নেই। এই সুযোগে হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরোক্ষ সহায়তায় স্থানীয় ছৈয়দ মো. সুমন, টিটু খানসহ কয়েকজন শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন।
জরুরি বা মুমূর্ষু রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য শরীয়তপুর সদর বা ঢাকায় স্থানান্তরের প্রয়োজন হলেই চক্রটি সক্রিয় হয়ে উঠে। ভেদরগঞ্জ থেকে ঢাকার যে কোনো হাসপাতালে স্বাভাবিক ভাড়া পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা হলেও রোগীদের জিম্মি করে আদায় করা হচ্ছে সাত থেকে আট হাজার টাকা। এমনকি অ্যাম্বুলেন্স সংকট দেখিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়। বাইরের কোনো চালক কম ভাড়ায় যেতে চাইলে তাঁকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না এবং হুমকি-ধমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
সিন্ডিকেটের নির্মমতার একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে গত ১০ সেপ্টেম্বর দুপুরে। ডিএমখালি ইউনিয়নের প্রসূতি বৃষ্টি আক্তারকে হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসক দ্রুত ঢাকায় স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। রোগীর বোন রিক্তা আক্তার চক্রের সদস্য টিটুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে সে সাত হাজার টাকা ভাড়া দাবি করে। পরে সদর থেকে পাঁচ হাজার টাকায় অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে আনলেও টিটু চালককে হুমকি দিয়ে অন্য রোগী তুলে নিয়ে চলে যেতে বাধ্য করে। ৪ ঘণ্টা ওই প্রসূতি প্রসববেদনায় হাসপাতালের সামনে ছটফট করলেও কোনো অ্যাম্বুলেন্স মেলেনি। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় অন্য একটি গাড়িতে ওই নারীকে ঢাকায় পাঠানো হয়।

অনিয়ম শুধু অ্যাম্বুলেন্সেই সীমাবদ্ধ নয়, হাসপাতালের ভেতর সরকারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও এক্সরে মেশিন দীর্ঘদিন নষ্ট থাকার সুযোগে গড়ে উঠেছে ক্লিনিক কেন্দ্রিক একাধিক দালাল চক্র। রোগী ডায়াগনস্টিক টেস্টের ব্যবস্থাপত্র পেলেই তারা ছিনিয়ে নিয়ে নির্দিষ্ট ক্লিনিকে নিয়ে যায় এবং অতিরিক্ত মূল্যে পরীক্ষা করাতে বাধ্য করে।
সদরের অ্যাম্বুলেন্স চালক দুলাল মিয়া জানান, রোগী নিতে গেলে সিন্ডিকেট সদস্য সুমন ও টিটুকে প্রতি ট্রিপে এক থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত 
চাঁদা বা কমিশন দিতে হয়। এই চাঁদার কারণেই রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করতে বাধ্য হন চালকরা।
অভিযুক্ত ছৈয়দ সুমন নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, তাঁর একটি গাড়ি হাসপাতালের ভেতরে থাকে বলেই অনেকে ভুল বোঝেন। অপর অভিযুক্ত টিটু খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু নাঈম মো. ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, ‘ড্রাইভার ও যন্ত্রাংশের সংকটে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবা বন্ধ রয়েছে। কিছু বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালকের কারণে চিকিৎসাসেবার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। বিষয়টি ইতোমধ্যেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুবকর সিদ্দিক বলেন, রোগীদের ভোগান্তি কমাতে কাজ চলছে এবং নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×