ইউএনও কার্যালয়ের সামনে অবৈধভাবে তোলা বালুর স্তূপ
তাহিরপুর ইউএনও কার্যালয়ের সামনে গতকাল শনিবার অবৈধভাবে তোলা বালুর স্তূপ ঘিরে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ক্ষোভ সমকাল
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ইজারাভিত্তিক শান্তিপুর নদী থেকে অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের সামনে মজুত করে রাখার ঘটনা ঘটেছে। ইউএনও কার্যালয়ের সামনে বালু মজুতের ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
শুক্রবার সকালে তিনটি নৌকায় করে কয়েক হাজার ঘনফুট বালু এনে উপজেলা পরিষদ এলাকার ওই স্থানে রাখা হয়। এতে পর্যটকদের বসার দুটি বেঞ্চও বালুর স্তূপের নিচে চাপা পড়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রকাশ্যে তিনটি নৌকায় করে বালু এনে ইউএনও কার্যালয়ের সামনে রাখা হয়। পরে বালুর স্তূপের ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসন ও বিএনপির স্থানীয় নেতারা সমালোচনার শিকার হন এবং অনেকে বিভিন্ন মন্তব্য করেন।
মাজহারুল ইসলাম বাবু নামের একজন তাঁর ফেসবুক পোস্টে নৌকা থেকে বালু তোলার একটি ছবি দিয়ে লেখেন, ‘সাধারণ মানুষ বলাবলি করছে–উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার শেল্টারেই কি এসব হচ্ছে?’ সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা আবুল কাশেম তাঁর ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘যদি সত্যি ইউএনও জড়িত থাকেন, উনার বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। উনার নামে অনেক কিছু শুনছেন।’ সৈয়দ সেলিম আহমদ নামের একজন এই ইস্যুতে এমপির হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল জানান, অসৎ কাজে কাউকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন না তিনি। সে যদি স্বজনও হয় তাও সমঝোতা হবে না। সমালোচকরা না জেনে অনেক কিছু বলেন। বালুর বিষয়টি তিনি জেনেছেন। বালু রাখার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে আটকের জন্য উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছেন।
এদিকে সমালোচনার জবাবে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মেহেদী হাসান উজ্জ্বল ফেসবুকে প্রতিবাদ ও বিবৃতি দিয়েছেন। বিবৃতিতে তিনি বলেন, উপজেলা ভবনের সামনে বালু রাখার ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়া তাঁর নাম জড়িয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এ ঘটনায় প্রতিবাদ ও নিন্দা জানান তিনি।
সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনার পর শনিবার সকালে ইউএনও মেহেদী হাসান মানিক ঘটনাস্থলে গিয়ে বালুর স্তূপ দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি উপজেলা সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) বালু জব্দ এবং এর মালিককে খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন।
বালুর স্তূপ পরিদর্শনের সময় ইউএনওকে বলতে শোনা যায়, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করেছে, বেঞ্চ ভেঙেছে, উপজেলা প্রশাসনের সামনের পরিবেশ নষ্ট করেছে। দিনে-দুপুরে এনে বালু রেখেছে!
ইউএনওর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরিয়ার আলম শান্তিনু, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রহিম, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হারুন অর রশীদ, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক বাদল মিয়া ও উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম।
তাহিরপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক বাদল মিয়া বলেন, শান্তিপুর নদী থেকে বালু নেওয়া ঠেকাতে নদীতে বাঁশের বেড়া দেওয়া রয়েছে। বিএনপির কেউ নদী থেকে বালু নেওয়ার সঙ্গে জড়িত নন। যারা বালু নেয়, তারা মূলত চোর। চুরি করে বালু নেয়। ইউএনও কার্যালয়ের সামনে রাখা বালুর মালিক কে, তা জানা যায়নি। হয়তো শান্তিপুর নদী থেকে চুরি করে এনে এখানে রাখা হয়েছে। ইউএনও বালু জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক বলেন, শান্তিপুর নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে উপজেলা প্রশাসন সবসময় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। শুক্রবার দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকায় উপজেলা পরিষদ এলাকায় বালু রাখার বিষয়টি তিনি জানতে পারেননি। পরে বিষয়টি নজরে আসার পর বালুর মালিককে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পর্যটকদের বসার দুটি বেঞ্চের ওপরও বালু রাখা হয়েছে। সেখানে প্রায় দুই হাজার ঘনফুট বালু থাকতে পারে। বালু জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এর মালিককে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
ইজারা অতিরিক্ত তাহিরপুরের শান্তিপুর নদী থেকে একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার বালু লুটের বিষয়টি গত দুই-তিন বছর ধরে গণমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে। বালু লুট ঠেকাতে উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় বাসিন্দারা বিভিন্ন সময় অভিযান চালালেও কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবার শুরু হয়।
- বিষয় :
- বালুদস্যু