ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পদ্মায় বৈদ্যুতিক ফাঁদে ধ্বংস হচ্ছে পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ

পদ্মায় বৈদ্যুতিক ফাঁদে ধ্বংস হচ্ছে পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ
×

 সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজশাহীর প্রমত্তা পদ্মা ও তার শাখা-উপশাখাগুলো এখন দেশীয় প্রজাতির মাছের মুক্ত বিচরণক্ষেত্র হওয়ার কথা ছিল। অথচ এই প্রজনন মৌসুমে নদীজুড়ে চলছে বৈদ্যুতিক শকে মাছ নিধন। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাটারি ও ইনভার্টারের মাধ্যমে সৃষ্ট এই বিদ্যুতায়িত ফাঁদে মুহূর্তের মধ্যে ধরা হচ্ছে মা মাছ, পোনা এবং নানা প্রজাতির অগণিত জলজ প্রাণী। চারঘাটের রাওথা, চন্দনশহরসহ দুর্গম চরাঞ্চলে সংঘবদ্ধ চোরের দল রাতের আঁধারে এভাবে সাবাড় করছে হাজার হাজার কেজি পোনা মাছ। 

যেভাবে কাজ করে ‘মৃত্যুফাঁদ’
নৌকা কিংবা বোটে সাধারণ যানবাহনের ব্যবহৃত বড় ও ছোট ব্যাটারির সঙ্গে ইনভার্টার যুক্ত করে তৈরি হয় এই বৈদ্যুতিক সংযোগ। একটি তার পদ্মায় এবং অন্যটি ঝুলিয়ে দেওয়া হয় একটি বিশেষ জালির প্রান্তে। জালিটি পানিতে নামানো মাত্রই মুহূর্তের মধ্যে আট থেকে ৩০ ফুট ব্যাসার্ধের পুরো এলাকা হয়ে ওঠে বিদ্যুতায়িত। বড় ব্যাটারির ওজন প্রায় ২০ কেজি আর দাম পড়ে ৫০ হাজার টাকার মতো। অন্যদিকে আট থেকে ১০ কেজির তুলনামূলক ছোট ব্যাটারি মিলছে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকায়। দাম চড়া হলেও মাত্র কয়েক সপ্তাহের শিকারে উঠে আসে পুরো খরচ। ফলে চড়া মুনাফার লোভে অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে পরিবেশঘাতী এই শিকারের পদ্ধতি।

আশঙ্কাজনক হারে কমছে দেশীয় মাছ
গত ৭ আগস্ট রাওথা এলাকায় এক রাতে বৈদ্যুতিক শকে শিকার করা হয় ১৩০ কেজি পাঙাশ ও বাঘাইড়ের পোনা, যার প্রতিটির ওজন ছিল মাত্র ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম। স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠলে এ পোনাগুলোর একেকটি হতে পারত ১৫ থেকে ২০ কেজির বিশালাকায় মাছ। এর আগে জুনেও ধরা পড়ে শত কেজির ওপর পাঙাশের পোনা। এভাবে নির্বিচারে পোনা নিধনের ধাক্কা সরাসরি এসে পড়েছে চারঘাটের মোট মৎস্য উৎপাদনে। চারঘাট উপজেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে নদী থেকে মাছ আহরণ হয়েছিল ৩৮১  টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৩৭৩ টনে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৬০, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৩৫২ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ৩৪০ টনে। অর্থাৎ গত ৫ বছরে চারঘাটের নদী এলাকা থেকে উৎপাদন কমে গেছে প্রায় ৪১ টন।

সংকটে পদ্মার জীববৈচিত্র্য
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘জীববৈচিত্র্য ও সংরক্ষণ’ (Biodiversity and Conservation)-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে পদ্মার ভয়াবহ গভীরতা কমার তথ্য। ১৯৮০-৮৫ সালে পদ্মার গড় গভীরতা ছিল ১২.৮ মিটার, যা ২০১৫-১৯ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১১.১ মিটারে। গভীরতা কমে সংকীর্ণ হচ্ছে নদী। এ ছাড়া পদ্মার ৭৭ প্রজাতির মাছের মধ্যে ইতোমধ্যে ৩টি সংকটাপন্ন, ১০টি বিপন্ন, ৯টি অতিবিপন্ন এবং আরও ৯টি বিপন্নপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে। 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শামস মুহা. গালিব জানান, শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে মাছের আশ্রয় সংকুচিত হয়, আর বর্ষায় অসাধু চক্র মেতে ওঠে মা মাছ ও পোনা নিধনে। এমনটা চলতে থাকলে পদ্মায় দেশীয় মাছের বিলুপ্তি ঠেকানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। দ্রুত অভয়াশ্রম গড়ে তোলার তাগিদ দেন তিনি।
জেলে ও প্রশাসনের অবস্থান
সাহাপুর মৎস্যজীবী সমিতির সদস্য আবুল বারেকসহ সাধারণ নিবন্ধিত জেলেরা জানান, প্রভাবশালী এই চোর চক্রগুলোকে বাধা দিতে গিয়ে তারা বারবার কোণঠাসা হচ্ছেন। গভীর রাতে দুর্গম এলাকায় অভিযান চালানোর মতো পর্যাপ্ত নৌযান ও জনবল না থাকায় অনেক সময় অধরা থেকে যায় দুষ্কৃতকারীরা। 
চারঘাট নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী পরিদর্শক এনামুল হক ও চারঘাট সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানান, অভিযান চালিয়ে নৌকাসহ সরঞ্জাম জব্দ ও মামলা 
করা হলেও জনবল সীমাবদ্ধতার বিষয়টি সামনে চলে আসছে। তবে চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস স্পষ্ট জানিয়েছেন, মাসিক সভায় বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×