ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হুইলচেয়ারে বসে আলোর পথ দেখান অপূর্ব লাল

হুইলচেয়ারে বসে আলোর পথ দেখান অপূর্ব লাল
×

হুইলচেয়ারে বসে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করেন শিক্ষক অপূর্ব লাল মণ্ডল সমকাল

হাসানউজ্জামান, ফরিদপুর

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৩ | আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

হুইলচেয়ারে বসে আছেন এক মধ্যবয়সী ব্যক্তি। চেয়ারটি ঠেলে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করছে নীল জামা পরা এক কিশোর। খেলার মাঠ পেরোতেই আরেক কিশোর এগিয়ে এসে চেয়ার ধরলো। দুজন চেয়ারটির দুই প্রান্তে উঁচু করে বারান্দায় তুললো। ষষ্ঠ শ্রেণির কক্ষে ঢুকতেই উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিল বেঞ্চে বসা শিক্ষার্থীরা। এরপর শুরু হলো পাঠদান।

চেয়ারে বসা ব্যক্তি অপূর্ব লাল মণ্ডল। তিনি ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার বামুন্দী বালিয়াকান্দী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক। তিনি দুই পায়ে শক্তি হারিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার সামর্থ্য নেই। কিন্তু থেমে যায়নি তাঁর জীবনযুদ্ধ। থামেনি শিক্ষার আলো ছড়ানোর অদম্য চেষ্টা। প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা নিয়ে হুইলচেয়ারে বিদ্যালয়ে আসেন, পাঠদান শেষে ছাত্রদের ভরসায় বাড়ি ফেরেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।

জানা গেছে, জন্মের পর থেকে সুস্থই ছিলেন অপূর্ব লাল। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ালেখার সময় পায়ে সামান্য সমস্যা লক্ষ্য করেন। এই সমস্যা নিয়েই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া করে বিএসসি পাস করেন। ১৯৯৯ সালে নিজের এলাকায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। তার কয়েক বছর পর থেকে ধীরে ধীরে পায়ের শক্তি হারাতে থাকেন। এরপর দুই পায়ে ভর করে আর চলা হয়নি অপূর্ব লালের। গত ১০ বছর ধরে হুইল চেয়ারই তাঁর যাতায়াতের একমাত্র বাহন। এত চ্যালেঞ্জের মাঝেও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব থেকে একটুও পিছপা হননি। অপূর্ব বিদ্যালয়ের পাশেই ভাড়া বাড়িতে থাকেন। সেখান থেকে ছাত্রদের সহযোগিতায় বাড়ি থেকে স্কুলে যাতায়াত করেন তিনি।

অপূর্ব লাল বলেন, ‘প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার সময় ছাত্ররাই আমার চলার সঙ্গী হয়ে ওঠে। কারও কাঁধে ভর করে, কখনও একাধিক শিক্ষার্থীর সহযোগিতায় বিদ্যালয়ে যাতায়াত করি।’ তিনি জানান, এত কষ্ট ও চ্যালেঞ্জের মাঝেও শিক্ষাকতাকে তিনি পেশা নয়, শিক্ষার আলো ছড়ানোর নেশা হিসাবে নিয়েছেন। তাঁর এই অদম্য চেষ্টায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সহকর্মীরা সব সময় পাশে থেকে সহযোগিতা করেন। বিল, বাঁওড়, মেলা ও দর্শনীয় কোনো জায়গায় তাঁর কোথাও বেড়াতে মন চাইলে বা ছাত্ররাও সেখানে গেলে তাকে নিয়ে যায়।

যে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন তাঁকে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেয়, তারাই আবার তার কাছ থেকে শিক্ষা নেয় জীবনের সবচেয়ে বড় পাঠ– প্রতিকূলতার কাছে হার না মানা। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রাকিব উল্লাহ ও দেব কুমার বলে, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অপূর্ব স্যারকে পেয়েছি। তখন থেকেই দেখেছি, বড় ক্লাসের ভাই-বোনেরা স্যারকে হুইলচেয়ারে করে বিদ্যালয়ে আনা-নেওয়া করছেন। এখন আমরা সেই দায়িত্বটা পালন করি। এত কষ্ট করেও স্যার আমাদের পাঠদান করান। অনেক সুন্দর করে ক্লাস নেন। তিনি আমাদের অনুপ্রেরণা।

সহকারী শিক্ষক ফরিদ শেখ জানান, অপূর্ব লাল মণ্ডল তাঁর বাল্যবন্ধু। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কলেজে লেখাপড়াও একসঙ্গে। একবছর আগে পরে একই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন তারা। তাই অসুস্থ বন্ধু বা সহকর্মীর জন্য খারাপ লাগলেও শেষ দিন পর্যন্ত এভাবে পাশে থাকার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সহকারী প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম বলেন, শুধু স্কুলে যাতায়াত নয়, শ্রেণিকক্ষে ঢুকেও দায়িত্ব পালনে অপূর্ব লালের কোনো ক্লান্তি নেই। শিক্ষার্থীদের যত্ন করে পাঠ বুঝিয়ে দেন। তবে চলাচলের জন্য তাঁর একটি আধুনিক হুইলচেয়ার হলে পাঠদান ও যাতায়াতে সুবিধা হতো। 
 

আরও পড়ুন

×