ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চিত্রশৈলী আবিষ্কার

চিত্রশৈলী আবিষ্কার
×

মোহাম্মদ ইকবাল [জন্ম ১৯৬৭]

মোহাম্মদ ইকবাল

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমি মূলত ফিগারেটিভ বা হিউম্যান ফিগার নিয়ে কাজ করি। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য মাঝে কিছুটা বিমূর্ত বা অ্যাবস্ট্রাক্ট ধাঁচের কাজ করেছিলাম। পরবর্তী সময়ে মনে হলো, নতুন কৌশল ও উপকরণ ব্যবহার করে যে নিরীক্ষা আমি করেছি, তার সঙ্গে আবার মানব-অবয়ব ফিরিয়ে আনি।
একজন শিল্পী সবসময় অন্বেষণ ও আবিষ্কার করেন। বাস্তবতার রূপান্তর এবং সাময়িক বিশ্বপরিস্থিতি নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন আসে। একজন তরুণ শিল্পী হিসেবে একটিমাত্র চিন্তাভাবনা নিয়ে পড়ে থাকলে চলে না; সমসাময়িক বিশ্বে কী ঘটছে  সমসাময়িক আর্টের ধরন কেমন, তা বুঝে সামনে এগোতে হয়।
এখনকার সময়ে ইনস্টলেশন আর্ট, ডিজিটাল ফটোগ্রাফি কিংবা ভিডিও আর্টের চল এসেছে। পেইন্টিংয়ের ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ের ধরনটা কী, তা বোঝা এবং কাজের স্টাইল ও টেকনিকের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী মেসেজ দেওয়াই আসল কথা।
হিরোশিমা সিটি ইউনিভার্সিটিতে (একটি সিটি গভর্নমেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়) পিএইচডি চলাকালীন আমি বড় ক্যানভাসে কাজ শুরু করি। ২০০৩ সালে ভর্তি হয়ে চিন্তাভাবনা করলাম যে আমার কাজের বিষয়গুলো কী হবে। ওই সময় আফগানিস্তান কিংবা গাজায় যুদ্ধাবস্থা চলছিল। আমি সবসময় আপডেট খবর জানার জন্য নিয়মিত সংবাদপত্র পড়তাম। বিশ্বের কোথায় কী ঘটছে, সে বিষয়ে এখনও প্রতিদিন আমাকে অনলাইনে খবরের কাগজ পড়তে হয়। একজন শিল্পী কিংবা সচেতন ব্যক্তি হিসেবে বিশ্বে বা দেশে কী ঘটছে, তার তথ্য রাখা প্রয়োজন। পেইন্টিংয়ের মাধ্যমে অনেক বলিষ্ঠ বিষয় প্রকাশ করা যায়, এমনকি বিভিন্ন দেশের সরকারকেও সচেতন করা যায়।
তখন অনলাইনে খবরের কাগজে গাজার একটি ছবি দেখেছিলাম, একটি ছোট বাচ্চার মাথা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পড়ে আছে। এত সুন্দর সেই মুখ! ছবিটা দেখে আমার খুব খারাপ লাগে। তখন ভাবলাম, যুদ্ধের বিষয়গুলো তো অনেকভাবে প্রকাশ করা যায়। সচরাচর বন্দুক উঁচিয়ে যুদ্ধ করার দৃশ্য এঁকে যেভাবে বাস্তবতা তুলে ধরা হয়, আমি সেটিকে অন্য কীভাবে উপস্থাপন করতে পারি এবং অন্য কীভাবে এই বার্তাটি দিতে পারি?
তখন যে কৌশলগুলো শিখেছিলাম, তা প্রয়োগ করে বড় ক্যানভাসের মধ্যে শুধু মুখের ছবি আঁকা শুরু করলাম। ক্যানভাসে একটা থেকে আরেকটা মুখ, বড় বড় ফেস আর অনেক চোখ আঁকলাম। এগুলো আমি কোনো ছবি দেখে নয়, বরং নিজের মেমোরি বা স্মৃতি থেকে আঁকছিলাম। তথ্যগুলো নিয়ে মেমোরির মাধ্যমে তা ক্যানভাসে তুলে ধরছিলাম।
আমার জন্ম ১৯৬৭ সালে। ফলে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের স্মৃতিগুলো আমার মনে আছে। শিশুমননে অনেক বিষয় গভীরভাবে দাগ কেটে থাকে। আর যুদ্ধের ভয়াবহতায় সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণায় ভোগে নারী ও শিশুরা। শিশুদের ওপরই এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে। কষ্ট, ভয় ও আতঙ্কের একটি কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাদের যেতে হয়।
আমার বাড়ি চুয়াডাঙ্গাতে। বাবার ব্যবসা-বাণিজ্য ছিল শহরে। ছোটবেলায় যুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে মনে আছে, সেখানে বোম্বিং করা দেখেছি, রাস্তায় মানুষের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেছি। শহরের বাড়ি ছেড়ে আমরা একদম ইন্ডিয়ান বর্ডারের কাছে একটি গ্রামে চলে গিয়েছিলাম। 

সেখানে একটি পরিবার আমাদের আশ্রয় দিয়েছিল এবং সাত মাস আমরা সেখানে ছিলাম। জায়গাটির নাম ছিল দামুড়হুদা। আমরা ইন্ডিয়াতে যাইনি, দামুড়হুদাতে ছিলাম।
ওই সময়ে আমরা অনেক ভাইবোন ছিলাম, ছয় ভাই। ভীষণ অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কেটেছে। যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরে এসে দেখি বাবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বোম্বিং করে একদম গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শিশুমনে এসব ঘটনার গভীর প্রভাব পড়ে। শুধু বাংলাদেশ নয়, আফগানিস্তানের ছোট বাচ্চারাও জন্ম থেকে যুদ্ধ দেখে বড় হচ্ছে। গাজাতে এখনও একই অবস্থা। বিশ্বজুড়ে এই যে সাম্রাজ্যবাদ আর অস্ত্রের ব্যবসা, এসব চিন্তাভাবনা থেকে আমি ছবিগুলো এঁকেছিলাম। আমার থিসিস ও চিত্রকর্মের বিষয় ছিল, লস্ট চিলড্রেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড। 
সেখানে আমি শিশুদের ওপর যুদ্ধের প্রভাব তুলে ধরেছিলাম। মধ্যপ্রাচ্যে ছোট শিশুদের যেভাবে উটের দৌড় প্রতিযোগিতায় ব্যবহার করা হতো, শিশু শ্রম কিংবা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যে পরিবেশ বিপর্যয়, এসব বিষয় থিসিসে উল্লেখ করেছিলাম। সামনের পৃথিবীকে সুন্দর করতে হলে শিশুরা যাতে সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে পারে, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। এসব ভাবনা থেকে মূলত তেলরঙে অনেক সময় নিয়ে মুক্তভাবে শিশুদের মুখগুলো তুলে ধরেছিলাম।
এখানে শিশুদের অবয়ব কোনো ফটোগ্রাফ দেখে আঁকা হয়নি, সম্পূর্ণ স্মৃতিনির্ভর। কারণ, কোনো ছবি দেখে আঁকলে সেখানে নিজস্ব ক্রিয়েশন বা সৃজনশীলতা থাকে না, কেবল কপি করা হয়। তাই আগে থেকে বিষয়টির ইমেজ মাথার মধ্যে সাজিয়ে নিতাম, এমনকি ছোট কোনো লেআউটও করতাম না, সরাসরি ক্যানভাসে আঁকা শুরু করতাম।
এসব ছবির বৈশিষ্ট্য হলো, একটি ক্যানভাসে একটির পর একটি মুখ রিপিট হতে থাকে। এর পাশাপাশি মূল বিষয় হলো, কেবল মুখ আঁকা নয়, ইমোশন বা এক্সপ্রেশন ফুটিয়ে তোলা। মানুষের অভিব্যক্তি প্রকাশ পায় তার চোখের মাধ্যমে। চোখ দেখে বোঝা যায় মানুষটি কষ্টে আছে, নাকি আনন্দে। তাই আমার মূল ফোকাস ছিল চোখ। চোখের অভিব্যক্তিতে মানুষের দুঃখ-কষ্ট বোঝা যায় বলে আমি চোখকে খুব প্রাধান্য দিই। আমার আঁকা চোখগুলো যেন মায়াবী এবং কিছু বার্তা দিতে চায়।
জাপানে দেশজুড়ে একটি বড় ন্যাশনাল কম্পিটিশন হয়। আমি সেখানে শিশুদের মুখ নিয়ে আঁকা দুটি কাজ জমা দিলাম। প্রতি বিভাগ থেকে একটি করে কাজ নেওয়ার নিয়ম ছিল। ২০০৩ সালে ভর্তি হয়ে কাজগুলো শুরু করেছিলাম। ২০০৫ সালে পুরো জাপানের মধ্যে আমি ‘গ্র্যান্ড প্রাইজ’ পেয়ে গেলাম। পুরস্কার পেলে যে বড় আর্টিস্ট হয়ে যাবে তা নয়, তবে আমার কাজের নতুন স্টাইল ও বিষয়গত ভাবনার যে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলাম, তা খুব ভালো লেগেছিল। পুরস্কারমূল্য ছিল বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩০ লাখ টাকা। 

আরও পড়ুন

×