স্মৃতিসম্ভারের চিত্ররেখা
শিল্পকর্ম:: বীরেন সোম
দ্রোহী তারা
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
লালমাটিয়ার সি-ব্লকের নীরব গলিতে অবস্থিত গ্যালারি ‘দি ইল্যুশনস’-এ ঢুকতেই রূপময় এক জগতের দুয়ার খুলে যায়। গ্যালারির দেয়ালজুড়ে বিস্তৃত প্রখ্যাত শিল্পী বীরেন সোমের ১৪তম একক চিত্রপ্রদর্শনী ‘স্টোরিজ অব মেমোরিজ’। ‘শিল্পাঙ্গন’-এর আয়োজনে গত ৫ সেপ্টেম্বর সূচিত এই শিল্পপ্রদর্শনী শেষ হতে যাচ্ছে আগামী ২০ সেপ্টেম্বর। প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা গ্যালারির নিস্তব্ধতায় ৫১টি চিত্রকর্মের মধ্য দিয়ে ভেসে ওঠে এক শিল্পীর পাঁচ দশকের দীর্ঘ সাধনা, শিকড়মুখী স্মৃতি আর নিবিড় মানবিক চেতনা। এই আয়োজন কেবল স্রেফ স্মৃতিতর্পণ নয়, রেখা ও রঙের মনস্তাত্ত্বিক বয়ানে মানবাত্মার এক গভীর গদ্যকাব্যের মতো।
প্রদর্শনীতে বিশেষ নজর কাড়ে এচিং আকুয়াটিন্ট মাধ্যমে তৈরি বীরেন সোমের ১০×৭.৫ ইঞ্চির বিশিষ্ট চিত্রকর্ম ‘ইমেজ ফ্রম পাস্ট’। ক্যানভাসটিতে তাকালেই দর্শকের চোখে ধরা দেয় মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও আবেগের এক গভীর বিস্তার। মনোটোন ও মেটে শেডের গাঢ় বুননে আঁকা এই ছবিতে ওপরের অংশে অবয়ব আকারে একটি প্রোফাইল ফেস বা নারীর মুখাবয়ব ফুটে উঠেছে, যার দৃষ্টি সুদূর অতীতের দিকে নিবন্ধিত। তার নিচে শাখা-প্রশাখার মতো আঁকাবাঁকা জটিল রেখা, ঘোড়াসদৃশ প্রাচীন রূপক এবং জালের মতো টেক্সচার এক অদ্ভুত অধরা স্মৃতির উন্মোচন ঘটায়। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতে, এই চিত্রকর্ম স্মৃতির অবচেতন স্তর বা ‘আনকনশাস মাইন্ড’-এর প্রতীক। বহু বছর ধরে সঞ্চিত অভিজ্ঞতা, আঘাত, ভালোবাসা আর স্মৃতির ভগ্নাংশগুলো কীভাবে মানুষের মনোজগতে শিকড় ছড়িয়ে বেঁচে থাকে এবং জটিল জাল তৈরি করে। ছবিটির জটিল হ্যাচিং ও টেক্সচারে সেটিই চমৎকারভাবে রূপায়িত হয়েছে।
বীরেন সোমের ক্যানভাসের মূল প্রাণস্পন্দন হলো মানবিকতা ও ঐতিহ্যের এমন মেলবন্ধন। প্রদর্শনীতে থাকা ‘এ ফেস ফ্রম দ্য পাস্ট ২’ চিত্রকর্মটিতে এক নারীর প্রশান্ত ও গম্ভীর মুখের কাঁধে বসে থাকা পায়রাটি কেবল শান্তির বার্তা দেয় না, যেন অতীত ও বর্তমানের ভেতর এক নীরব মানস-সংলাপের সৃষ্টি করে। জ্যামিতিক রেখা আর মেটে রঙের এই বুনন দর্শনার্থীকে গ্রামীণ জীবনের শাশ্বত শান্তির কথা মনে করায়।
পাশেই মিক্সড মিডিয়ায় আঁকা ‘এ মেমোরেবল ডে ১’ ক্যানভাসটিতে সাবলীল মুক্তরেখার টানে এক নারীর হাতে পদ্মফুল ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আলতো রঙের প্রলেপে এখানে প্রাত্যহিক জীবনের আনন্দ ও ভালোবাসাকে এক অনন্য মানসিক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন শিল্পী। অন্যদিকে গাঢ় কালো ক্যানভাসে জোনাকির আলোর মতো ফুটে ওঠা চিত্রকর্ম ‘রেন্দেভু ২’-এ সূর্য, গাছপালা আর নদীর সান্নিধ্যে নারীর উপস্থিতি যেন প্রকৃতি ও মানবমনের অবিনশ্বর আত্মিক মিলনের এক গভীর রূপক।
কেবল সৌন্দর্যভাবনা নয়, ঐতিহাসিক দায়িত্ববোধ ও নাগরিক জীবনবোধও বীরেন সোমের তুলিতে সমান গুরুত্ব পেয়েছে। পেন অ্যান্ড ইনকে ক্রস-হ্যাচিং কৌশলে আঁকা ‘ওল্ড ঢাকা ১’ ক্যানভাসটি বুড়িগঙ্গার বুকে ভেসে চলা ডিঙি নৌকা এবং নদীর ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন গম্বুজযুক্ত স্থাপত্যের এক অসাধারণ স্মৃতিময় চিত্রপ্রলেখ। রেখার জটিল বুননে এখানে নদী ও নগর যেন দুটি পৃথক সত্তা না হয়ে মানুষের সংবেদনশীল চেতনার এক জীবন্ত ইতিহাস হিসেবে ধরা দিয়েছে। চিত্রকলার সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের নিবিড় দর্শনের ছোঁয়া মেলে তাঁর ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ ড্রয়িংটিতে। গভীর অন্ধকারের মধ্যেও ক্যানভাসে রঙের যে উজ্জ্বল স্পন্দন তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন, তা মানুষের অদম্য জীবনসংগ্রাম, মানসিক দৃঢ়তা ও আশাবাদের কথা বলে।
প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া কাজগুলোতে মাধ্যম ও শৈলীর বৈচিত্র্যময় রূপায়ণ স্পষ্ট। ড্রয়িং, এচিং, পেন-ইনক কিংবা মিক্সড মিডিয়ার সুনিপুণ প্রয়োগে শিল্পী প্রমাণ করেছেন যে মাধ্যমের পরিবর্তন হলেও চিত্রভাষার ভাবগত গভীরতায় বিন্দুমাত্র ঘাটতি পড়ে না। বীরেন সোমের ‘স্টোরিজ অব মেমোরিজ’ কেবল স্মৃতির অ্যালবাম হয়ে থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে আমাদের হারানো অতীত, মাটি ও মানুষের মানসিক ও আত্মিক অনুভূতির এক চিরন্তন আখ্যান। ২০ সেপ্টেম্বর প্রদর্শনী শেষ হলেও গ্যালারি থেকে ফিরে আসার পরও ক্যানভাসের সেই অবচেতন মন ছুঁয়ে যাওয়া রেখা ও রঙের ভাষা দর্শকের মনে দীর্ঘকাল দোলা দিয়ে যাবে।
- বিষয় :
- গল্প