ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজকুমারী

রাজকুমারী
×

অল্ট ন্যাশনাল গ্যালারি

মাসুদার রহমান

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিকেলের বারান্দা ফাঁকা। কোণের চেয়ারটাও ফাঁকা। যেন কারও জন্য পাতা আছে, অথচ কেউ আসেনি। সামনের আমগাছের ডালপালার ভেতর দিয়ে পশ্চিমে ঢলে পড়া সূর্য তার শেষ আলোটুকু উপুড় করে দিয়েছে দোতলার এই বারান্দায়। হাওয়া বইছে ধীরে, ক্লান্ত প্রেমিকের শ্বাসের মতো। মেঝেতে, দেয়ালে– সর্বত্র আলোর কাঁপন। আমপাতার ফাঁক গলে যে রোদ এসে পড়ছে, হাওয়ার তালে তালে তা নাচছে। ছায়া আর আলো মিলে যেন একটা ফাঁকা অডিটোরিয়ামের মঞ্চে রিহার্সাল চলছে। দর্শক নেই। আলো নিজেই নিজের দর্শক।
এই সময়টায় আলো আরও মায়াবী হয়ে ওঠে। আরও অপার্থিব। ঠিক তখনই শয়নঘরের দরজায় শব্দ হয় না। শব্দ হওয়ার দরকারও পড়ে না। রাজকুমারী আসে। তার পরনে টি-শার্ট আর ট্রাউজার। ঘরোয়া, অথচ রাজকীয়। কপালে ছোট্ট একটা টিপ– যেন সন্ধ্যার প্রথম তারাটা কপালেই নেমে এসেছে। খোলা চুল। কাঁধ ছুঁয়ে, বাহু ছুঁয়ে ঝলকে ঝলকে নেমে আসে, তারপর মুখের ওপর উপচে পড়ে। চোখ ঢেকে দেয়। রাজকুমারী হাসে। সেই হাসি দেখা যায় না, শুধু বোঝা যায়। আলতো আঙুলে সে চুল সরিয়ে দেয়। আবার বাতাস এসে ফিরিয়ে দেয়।  
বাতাসের খুনসুটি কি থামে তাতে?
চেয়ারে বসে রাজকুমারী। চারপাশের নাচতে থাকা আলোর সঙ্গে তার উপস্থিতি মিশে যায়। এখন বারান্দাটা আর ফাঁকা নেই। রিহার্সাল শেষ। মঞ্চে নেমেছে মূল চরিত্র। তখন আমি– আমি দূরে কোথাও এক বারান্দায় বসে অনুভব করি, কীভাবে একটা বিকেল রাজকুমারীর ছায়া পূর্ণ হয়ে ওঠে।
গান বাজছে। কোনো যন্ত্র নেই, কোনো যন্ত্রী নেই। তবু বিকেলের বাতাসে রাজকুমারী এভাবেই সুর মিলিয়ে দিতে থাকে। প্রথমে একটু উৎফুল্লতা। বাতাসের মতো চঞ্চল, হালকা। সেই সুর ধীরে ধীরে বারান্দার রেলিং বেয়ে, আমপাতার ফাঁক গলে, আকাশের দিকে উঠে যেতে থাকে। মিশে যেতে থাকে বিকেলের নরম আলোয়। রোদের রং বদলায়। সোনালি থেকে কমলা, কমলা থেকে একধরনের বিষণ্ণ মধু রং। আকাশের ওপরে, যেখানে নীলটা আরও গাঢ় হয়ে আসছে, সেখানে একঝাঁক পাখি ডানা মেলে। যেন রাজকুমারীর সুরটাই ডানা পেয়ে উড়ছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে আমার চোখ পড়ে নিচে। এই যে বারান্দা, যেখানে আমি বসে আছি তার নিচেই একটা বড় উঠোন। অনেকটা অংশ জুড়ে শুধু ফাঁকা মাটি। তারপর নানা গাছপালার জড়াজড়ি। জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে তারা, যেন সবাই মিলে কোনো গোপন কথা বলছে। এক কোণে একটা গন্ধরাজ ফুলগাছ। অজস্র সাদা ফুল ফুটে আছে তাতে।  
আমি এতক্ষণ খেয়াল করিনি। হঠাৎ বাতাসের একঝাপটায় তার সুবাস এসে নাকে লাগে। তীব্র, অথচ কোমল। যেন কেউ খুব কাছে এসে নিঃশ্বাস ফেলল। তখনই বুঝি। রাজকুমারী শুধু গাইছে না। রাজকুমারী নিজেই একটা গান। রাজকুমারী নিজেই একটা সুবাস। তার গলার সুর আর গন্ধরাজের ঘ্রাণ মিলেমিশে যায় বাতাসে। আলাদা করা যায় না কোনটা কার। বিকেলটা তখন আর শুধু সময় থাকে না। বিকেলটা হয়ে ওঠে রাজকুমারীর উপস্থিতির প্রমাণ।
ধীরে সন্ধ্যা নামে চোখের সামনে। যেন কেউ খুব যত্ন করে একটা পর্দা টেনে দিচ্ছে দিনের ওপর। রাজকুমারীর গান এবার সন্ধ্যা রাগে বাজছে। আর কোনো উৎফুল্ল চঞ্চলতা নেই তাতে। আছে বিষাদের মায়া, আছে শেষ হওয়ার সৌন্দর্য। সুরটা আর বাতাসে ভাসে না। সুরটা এখন মাটির দিকে নামে, দেয়ালে ঠেকে, আমপাতায় জড়িয়ে যায়। অল্প অল্প অন্ধকার মিশতে থাকে আলোতে। বারান্দার মেঝেতে নাচতে থাকা আলোর টুকরোগুলো একে একে নিভে যায়। শুধু কোণের চেয়ারটার পাশে একচিলতে শেষ রোদ লেগে থাকে, জেদি কোনো স্মৃতির মতো।
রাজকুমারী কি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে?  
হ্যাঁ। উঠে দাঁড়িয়েছে।
ধীর পা। শব্দহীন। যেন পা ফেললে বিকেলটা ভেঙে যাবে। সে পায়চারি করে বারান্দা জুড়ে। একবার এ-মাথা থেকে ও-মাথা। আবার ফিরে আসে। তার ছায়াটা লম্বা হয়ে পড়ে দেয়ালে। আরেকটা রাজকুমারী, যে অন্ধকারের সঙ্গে হাঁটে। তারপর হঠাৎ থেমে যায়। গ্রিলে হাত রাখে। লোহার অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা স্পর্শে আঙুলগুলো স্থির হয়ে থাকে কিছুক্ষণ।
দূরে, দিগন্তরেখার ওপারে তাকিয়ে থাকে রাজকুমারী। সেখানে আকাশ আর মাটি মিশে গেছে। আলাদা করা যাচ্ছে না। তার চোখে কী আছে? কোনো অপেক্ষা? কোনো পুরোনো চিঠির কথা? নাকি কিছুই না– শুধু তাকিয়ে থাকা? বাতাসটা এখন আর খুনসুটি করে না। বাতাসও চুপ। গন্ধরাজের সুবাসটা আরও গাঢ় হয়েছে। অন্ধকারে ফুলেরা বেশি করে কথা বলে।  
আর রাজকুমারীর সুরটা এখন আর গান না। ওটা এখন একটা নীরবতা। যে নীরবতা সব শব্দের চেয়ে জোরে বাজে। আমি দেখি। কিছু বলি না। কারণ সন্ধ্যা রাগে কথা বলতে নেই। সন্ধ্যা রাগে শুধু দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, গ্রিলে হাত রেখে, দিগন্তের দিকে তাকিয়ে। আর বুঝতে হয়– রাজকুমারী দিনের শেষ আলোটুকু নিজের ভেতরে জমিয়ে রাখছে।
অন্ধকার গাঢ় হয়। দিনের শেষ রংটুকুও মুছে যায় দেয়াল থেকে। বারান্দাটা এখন কালির মতো। রাজকুমারী তখনও দাঁড়িয়ে। গ্রিলে হাত রাখা। নড়ে না, নড়াচড়ার দরকারও পড়ে না। অন্ধকার নিজেই তার শরীরের মাপ নিয়ে নেয়। দু-একটি করে ঝিঁঝি ডাক ওঠে। প্রথমে লাজুক, তারপর সাহসী। ধীরে ধীরে সেই ডাক সমবেত হয়ে ওঠে। উঠোন, গাছপালা, মাটির নিচ– সবখানে ছড়িয়ে পড়ে। মনে হয় রাজকুমারীর পায়ের আঙুলগুলোই ওই শব্দ ছড়িয়ে দিচ্ছে। প্রতিটি পায়ের চাপে মাটির গভীর থেকে উঠে আসছে ঝিঁঝির কোরাস। যেন মাটি নিজেই গান ধরেছে তার পায়ের তলায়। বেগনোভ্যেলিয়ার ঝোপটা অন্ধকারে কালো হয়ে আছে। হঠাৎ সেখান থেকে একটা আলো। তারপর আরেকটা। দু-একটি জোনাকি। একটি, দুটি করে। তারপর অজস্র। তারা উড়ে আসে না। তারা ছড়িয়ে পড়ে। বারান্দার চারপাশে, বাতাসে, রাজকুমারীর চুলের ফাঁকে।
আর আমি বুঝি– এই জোনাকিগুলো বেগনোভ্যেলিয়া থেকে আসেনি। এই আলোগুলো রাজকুমারীর চোখ থেকেই ছড়িয়ে পড়ছে। তার চোখের গভীরে যে অন্ধকার, সেখানেই জন্ম হয় আলোর। যে নীরবতা, সেখান থেকেই জন্ম হয় ঝিঁঝির শব্দের।
রাজকুমারী তখনও তাকিয়ে আছে দূরে। কিন্তু এখন আর দিগন্ত দেখছে না। এখন সে নিজেই দিগন্ত হয়ে গেছে– একদিকে অন্ধকার, আরেকদিকে জোনাকি। বারান্দাটা আর ফাঁকা না। বারান্দাটা এখন একটা আকাশ। আর রাজকুমারী– সে আকাশের মাঝখানে দাঁড়ানো একমাত্র তারা। 

আরও পড়ুন

×