পদাবলি
অলংকরণ :: আনিসুজ্জামান সোহেল
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
তোমার মৃত্যুর পরে
মজিদ মাহমুদ
তুমি মরে গেলে, আর সবাই বলল, সব ঠিকঠাক আছে
যেসব সৈন্য সকালে কুচকাওয়াজে বেরিয়েছিল, তারা
সকলেই ব্যারাকে ফিরেছে, এক মগ গরম চায়ের সঙ্গে
শুকনো রুটি চিবুচ্ছে; দেশ দখলের লড়াই যেহেতু শেষ
সেহেতু তোমার মৃত্যুতেও পতনের আশঙ্কা করছে না।
প্রতিদিনের মতো সূর্য পশ্চিমে হেলে যাচ্ছে, বইছে ঠান্ডা
বাতাস, আজ অমাবস্যা, চাঁদ উঠবে না– প্রকৃতির নিয়ম
অন্দরে মেয়েরা কাঁদছে, পরস্পর খোঁজখবর নিচ্ছে, আজ
রান্নার ঝামেলা নেই, এসেছে প্রতিবেশীদের ইলিশ-খিচুড়ি
তোমার শবাধারের পাশে আগরের ধোঁয়ার সাথে মৃদু গুঞ্জরণ
দূরের আত্মীয়রা করছে তোমার শব-সমাধির আয়োজন।
সত্যিই কোথাও অনিয়ম নেই; সবকিছু ঠিকঠাক আছে
কার ঠিকঠাক আছে? সূর্য উঠলেই সব ঠিকঠাক থাকে?
এমন ঠিকঠাক থাকার পৃথিবীতে তুমি অনেক দিন ছিলে
কিন্তু আমার তো ঠিকঠাক নেই; এখন আমার সব বেঠিক;
কারও থাকা না থাকা, সূর্যের ওঠা না-ওঠা– সব সমান
তোমার মৃন্ময় যাত্রার পথে প্রত্যেকে খুঁজছে অন্তরাল।
বল, তুমি কিংবা আমি, আমাদের থাকা না হলে, ক্ষোভে
কেউ তো আমাদের জন্য করেনি আহা-উহুঁ, তবু নিস্পৃহ
সন্তের মতো বলতে হবে, জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক!
তুমি অভিমানে গেছ চলে, এখন কে আর মারবে আমাকে?
তোমার ভালোবাসার বর্ম যখন ছিন্ন, তখন এখানে নৈরাজ্য
মৃত্যু কিংবা বেঁচে থাকার অর্থ অহেতুক সংসারীদের পরে।
কাদামাটির গান
তপন বাগচী
বিল শুকিয়ে গেলে
মাটির নিচে লুকিয়ে থাকে নৌকার হাড়।
শিশুরা সেগুলো খুঁড়ে তুলে
খেলতে খেলতে ভয় পায়।
কারণ মাঝেমধ্যে
একটি বৈঠা কেঁপে ওঠে।
এক নারী
হেলেঞ্চা শাক তুলতে গিয়ে
একদিন পেয়েছিল
তার বহুদিন আগে হারানো
তাঁর স্বামীর হাতে বাওয়া লগি।
তখন আকাশে
কোনো পাখি ছিল না।
আলতাটুকু উড়ে যায় আকাশে বাতাসে
ওবায়েদ আকাশ
জঙ্গল থেকে ঘুরে, বার্তা এলো
সারা রাজ্যে প্রণয়বার্ষিকী—
সুঁই-সুতোয় সেলানো ভবিষ্যৎ, আর নকশাকাটা ফুলের সামগ্রী
পায়ের ওপর পা তুলে কেউ খেল আমাজনের ফল
কারও চুলে বর্ষেছিল মেঘ, এবার শরৎকাল দেখো
টালবাহানায় জানিয়ে দিল সাদা মেঘ তবু অনন্ত যৌবনা
কারা সেদিন বাজিয়েছিল বাঁশি, ইলিশের শরীর থেকে
জোছনার লাবণ্য সব চুরি করে যারা মিশে গেল বনের শোভায়—
গভীর জঙ্গল থেকে বন-বকুল ছিঁড়ে এনে অর্ঘ্য দিল সারাদিনের পায়
ঘাই মেরে উড়ে গেল শারদীয় মেঘ, তবু জলকাদায়
ডুবে থাকা দীর্ঘ প্রতিশ্রুতি—আর হঠাৎ ঘুমিয়ে গেলে জেগে-ওঠা
অবিমর্ষ স্মৃতি—তুমি জাজ্বল্য প্রণয়বার্ষিকী
জলের পাবদার মতো বুক ভরে ভালোবাস নির্বিঘ্ন বাঁচার পদ্ধতি
প্রিয় ফুলের প্রতি
রিমঝিম আহমেদ
কোথায় বা যেতে পারি আজ? সন্ধ্যা ঘন হয়ে আসে
চরাচর ভেঙে পড়ে, দুর্যোগে, ঝড়ের পূর্বাভাসে
যাব? ভয় জাগে, ঘন হয় মনের ভেতর মন
বারান্দায় গিয়ে বসি। তাও শুনি বাতাসে প্লাবন
হাড়ে ও রক্তে অস্থিতি– নিরাশ্রয়, নিরাময়হীন
নিজেকে বিকিয়ে রোজ শোধ করি জন্মপিতৃঋণ
একখণ্ড মেঘ এসে জানালায় ডাক দিয়ে বলে
মৃত্যুফণা জেগে আছে, উঁচুনিচু বিষাক্ত ছোবলে
আত্মবিলাপেও কাজ নেই। অন্ধ-বধির ঈশ্বর
পথেই উপুড় পথ, রাত এসে চেপে ধরে ধড়
দূরত্বে দাঁড়িয়ে দেখি প্রিয় ফুল, ঝরবেই, প্রস্তুত
আশ্রয় কি গৃহ চায়? চেনাপথে পাথর-বিরোধ!
যেতে চাই। অথৈ ঢেউ– জলেরও একনিষ্ঠ হাঁ
নিজেকে পতঙ্গ করে, দ’লে মারি। সর্বাঙ্গে জড়তা...
- বিষয় :
- কবিতা