মুইসা
শিল্পকর্ম:: সাফায়েত সাগর
মাসুদুল হক
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
দুটি পাহাড় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে—একটির নাম থুইসা, অন্যটির রেংখিয়ং। তাদের মাঝখানে গভীর এক উপত্যকা। বর্ষায় সেই উপত্যকার বুক বেয়ে নেমে আসত পাহাড়ি ঝরনা, শীতে যার জল সকালের রোদের মতো চিকচিক করত। ম্রোদের কাছে এই উপত্যকা শুধু পাহাড়ের মাঝখানে একটি নিচু জমি নয়; ওটা জীবনের উপত্যকা—পূর্বপুরুষের পদচিহ্ন, শিকারির পথ, জুমের গান আর পুরোনো গল্পের আশ্রয়। থুইসা আর রেংখিয়ংয়ের পেছনে আরও কত পাহাড়, কত টিলা, কত অচেনা উপত্যকা! দূর থেকে তাদের দেখে মনে হতো, তারা যেন ঘুমিয়ে থাকা বিশাল হাতি। বৃষ্টি নামে, কুয়াশা নামে, শিশির পড়ে, রোদ উঠে সব শুকিয়ে যায়, কিন্তু পাহাড়েরা নড়ে না। তারা যেন আকাশের নিচে বসে থাকা বৃদ্ধ পূর্বপুরুষ—সব দেখে, সব শোনে, কিন্তু খুব কম কথা বলে।
এই পাহাড়গুলোর বুক চিরে একটি ঝরনা নেমে এসেছে। ম্রোরা তাকে ডাকে রুইমা নামে। বর্ষায় সে পাহাড়ের বুক কাঁপিয়ে ছুটে, শীতে ধীরে চলে, কিন্তু কখনও থামে না। পাথরের গায়ে গায়ে জল ঘষে সে নিজের সুর তৈরি করে নেয়। রুইমা পাহাড় থেকে জন্ম নিয়ে পাহাড়ের বুকেই নিজের পথ করে নেওয়া এক নদী। জুমের ধান, পাহাড়ি মরিচ, বাঁশ, বেত, কলা, বনফল—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে তার জল। সকালে মেয়েরা বাঁশের পাত্র হাতে ঝরনার কাছে আসে; তারা জল তুলে, হাসে, গল্প করে। দূরের কোনো ঘর থেকে ধোঁয়া ওঠে, কোথাও মুরগির ডাক, কোথাও শূকরের শব্দ, কোথাও বাঁশের বেড়ায় বাতাসের মৃদু ধাক্কা। মানুষ, পাখি, হরিণ, বুনো শূকর, গাছপালা—সবাই যেন সেই স্রোতের সঙ্গে এক অদৃশ্য বন্ধনে বাঁধা।
তবু পাহাড়ের ওপর থেকে থুইসা ও রেংখিয়ংকে যেমন দেখাত, উপত্যকায় নেমে এলে তেমন লাগত না। চূড়া থেকে তারা দেখতে একই মাটির সন্তান; নিচ থেকে মনে হতো, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা দুই পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বী। যেন তাদের নীরব প্রশ্ন—এই ভূমির স্মৃতি কার? এই জঙ্গলের অধিকার কার? এই উপত্যকার প্রথম গান কে গেয়েছিল? প্রশ্নটির উত্তর ছিল বহু পুরোনো। বৃদ্ধরা বলতেন, একসময় মানুষের প্রথম পূর্বপুরুষেরা কুয়াশা, বুনো ফুল আর পাখির ডাকের মধ্য দিয়ে এই পাহাড়ে এসেছিলেন। তারা মাটিতে হাত রেখেছিলেন; মাটি ছিল ভেজা, বাতাসে ছিল বৃষ্টির গন্ধ। এক বৃদ্ধ শিকারি বলেছিলেন, “যে মাটিতে পূর্বপুরুষের পায়ের ছাপ আছে, সেই মাটি কখনও শুধু মাটি থাকে না।” সেই কথার ভেতরেই যেন পাহাড়ের মানুষের ইতিহাস ঘুমিয়ে ছিল।
কোনো পুরোনো গাছের গোড়া পবিত্র হয়ে উঠেছে, কোনো পাথর বা ঝরনা হয়ে উঠেছে স্মৃতির চিহ্ন। ম্রোদের কাছে বন শুধু কাঠের ভান্ডার নয়—আত্মীয়ের মতো। কোন গাছ কখন ফুল দেয়, কোন পাতায় ওষুধ হয়, কোন বাঁশ কাটার সময়, কোন পাখির ডাকে বৃষ্টি নামে—এসব জ্ঞান বই থেকে শেখা নয়; শেখা হয় মায়ের কাছ থেকে, বাবার কাছ থেকে, দাদির গল্পে, শিকারিদের মুখে। রাতে আগুনের পাশে বসে তারা গল্প শুনত। কোনো গল্প শিকারির, কোনোটি যোদ্ধার, কোনোটি এমন এক জ্ঞানীর, যিনি স্বপ্নে বিপদের আভাস পেতেন। তাদের কাছে বীরত্ব শুধু অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা নয়। বীর সে-ও, যে জঙ্গলকে চেনে, দুর্দিনে খাবার খুঁজে আনে, নদীর স্রোত পড়তে পারে, ঝড়ের আগে আকাশের রং বুঝতে পারে, নিজের জীবন দিয়ে অন্যের জীবন বাঁচাতে পারে।
এমনই একজন মুইসা—বৃদ্ধ শিকারি। পাহাড়ের পথ তাঁর চেনা, বনের গন্ধ তাঁর কাছে পরিচিত, পাখির ডাক তাঁর কাছে ভাষার মতো। এক রাতে তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, পাহাড়ের ওপার থেকে অচেনা মানুষ আসছে। তাদের পোশাক আলাদা, ভাষা আলাদা। তারা গাছের দিকে তাকাচ্ছে এমনভাবে, যেন গাছ তাদের সম্পত্তি; নদীর দিকে এমনভাবে, যেন নদীও তাদের। ঘুম ভেঙে মুইসা বলেছিলেন, “যে মানুষ পাহাড়ের ভাষা বোঝে না, সে পাহাড়ের মালিক হতে পারে না।” কেউ হেসেছিল, কেউ বলেছিল, “স্বপ্ন তো শুধু স্বপ্ন।” কিন্তু মুইসা জানতেন, সব কথা দিনের আলোয় আসে না। কিছু কথা আসে ঘুমের ভেতর দিয়ে, পাখির ডাকে, কিংবা অকারণে কেঁপে ওঠা পাতার শব্দে।
তখনও পাহাড় ছিল তাদের নিজস্ব পৃথিবী। সকালে মানুষ জুমে যেত, নারীরা বোনা কাপড় নিয়ে বসত, শিশুরা উঠোনে খেলত। সন্ধ্যায় ঘরে ঘরে আগুন জ্বলত। কোনো রাতে দূরের পাড়া থেকে বাঁশির সুর ভেসে আসত; কোথাও বিয়ের উৎসব, কোথাও ফসল ঘরে তোলার আনন্দ, কোথাও কোনো বৃদ্ধের মৃত্যুকে ঘিরে নীরবতা। জীবন আর মৃত্যু—দুটোই পাহাড়ের জীবনের অংশ। তবু পাহাড় সব মানুষকে আটকে রাখতে পারে না। কেউ বেরিয়ে যায় নতুন পথের সন্ধানে, কেউ বিপদের সময় নিজের মানুষকে রক্ষা করতে, কেউ দূরের পৃথিবী দেখতে। কেউ আর ফিরে আসে না, কেউ ফিরে আসে বহু বছর পর।
মুইসা একদিন পাহাড় ছেড়ে বেরিয়েছিলেন। ফিরে এসে তিনি আর আগের মানুষটি ছিলেন না। বাইরের পৃথিবীতে তিনি দেখেছিলেন মানুষ কীভাবে জমি মাপে, নদীকে ভাগ করে, বনকে সম্পত্তি ভাবে, আর ভয়ের ওপর ক্ষমতা দাঁড় করায়। ফিরে এসে তিনি শুধু বললেন, “মানুষ পাহাড়ের সন্তান। পাহাড় মানুষের নয়।” কথাটি ধীরে ধীরে তাঁর নতুন পথের ভিত্তি হয়ে উঠল। তিনি কোনো নতুন দেবতার নাম ঘোষণা করলেন না, কোনো মন্দির বানানোর কথা বললেন না, কাউকে অস্ত্র ধরতে বললেন না। তিনি বললেন—মাটিকে সম্মান করো, জলের অপমান কোরো না, বনকে লুট কোরো না, দুর্বলকে একা ফেলে রেখো না, অতিথিকে অন্ন দাও, মৃতকে স্মরণ করো, পূর্বপুরুষের পথ ভুলে যেও না। আর নিজের হৃদয়ের সত্যকে অন্যের ভয় দিয়ে হত্যা করতে দিও না।
তিনি বলতেন, “ধর্ম যদি মানুষের হৃদয়ে দয়া না জাগায়, তবে সে শুধু শব্দ। পাহাড়ের কাছে শব্দের মূল্য নেই; কাজের মূল্য আছে।” তরুণরা তাঁর কাছে আসতে শুরু করল। কেউ জুম শেষে, কেউ অসুস্থ মাকে নিয়ে, কেউ নিজের দুঃখ নিয়ে। মুইসা সবার কথা শুনতেন। “তোমার কষ্ট আমার কষ্টের চেয়ে বড় নয়, ছোটও নয়,” তিনি বলতেন, “কষ্টের কোনো মাপ নেই।” এইভাবেই তাঁর চারপাশে জন্ম নিল একটি নতুন পথ। পরে মানুষ সেই পথের নাম দিল—ক্রামা।
ক্রামা কোনো নতুন দেবতার নাম ছিল না। ছিল মানুষের ভেতরের আলো জাগিয়ে রাখার স্বপ্ন; পাহাড়, জল, বন, পূর্বপুরুষ ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ককে পবিত্র মনে করার এক পথ। মুইসা বলতেন, “ক্রামা আমার নয়। তোমাদেরও নয়। ক্রামা সেই পথ, যে পথ মানুষকে নিজের ভেতর থেকে সত্যের দিকে নিয়ে যায়।” কিন্তু মানুষ মানুষকে যতটা তার কথায় চেনে, তার চেয়ে বেশি চেনে তার কাজে। আর কাজ যখন কথার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, মানুষটির চারপাশে অন্যরকম নীরবতা তৈরি হয়। তার বলা কথা অন্যের মনে নিজের মতো করে ফিরে আসে; তার চলে যাওয়ার পরও তার ব্যবহার করা শব্দ মানুষ নিজের জীবনে ব্যবহার করতে থাকে। মুইসার ক্ষেত্রেও ধীরে ধীরে তেমনই হলো।
পাহাড়ের ওপার থেকে একদিন অন্য এক গোষ্ঠীর লোকেরা এলো। পুরোনো বিরোধ ছিল—জুমের জমি, শিকারক্ষেত্র, পথ। সেই বিরোধের সঙ্গে যুক্ত হলো ভয়। মুইসার নতুন পথ তাদের কাছে বিপদ হয়ে উঠল। মানুষ যদি নিজের বিবেকের কথা শুনতে শেখে, তবে ভয়ের ওপর দাঁড়ানো ক্ষমতা টেকে না। মুইসাকে তাই তারা শত্রু ভাবল।
এক সন্ধ্যায় এক তরুণ শিষ্য বলল, “তুমি চলে যাও। তারা তোমাকে মেরে ফেলবে।” মুইসা ঝরনার দিকে তাকিয়ে রইলেন। “আমি চলে গেলে কি পাহাড় বেঁচে যাবে?” “তুমি বেঁচে থাকবে।” মুইসা মৃদু হেসে বললেন, “শুধু আমি বেঁচে থাকলেই কি আমার পথ বেঁচে থাকবে?”
পরদিন ভোরে তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো। হাত বাঁধা, পায়ে কাদা, পরনে আগের দিনের পোশাক। কিন্তু চোখে ভয় ছিল না। পথের ধারে কয়েকজন ম্রো নারী কাঁদছিল। একটি শিশু মায়ের আঁচল ধরে জিজ্ঞেস করল, “মুইসাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?” মা উত্তর দিতে পারল না। মুইসা শিশুটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “শিশুটিকে ভয় দেখিও না।” তারপর তিনি হাঁটতে লাগলেন।
এক খোলা জায়গায় তাঁকে দাঁড় করিয়ে অভিযোগ আনা হলো। বলা হলো, তিনি পুরোনো নিয়মের বিরুদ্ধে মানুষকে দাঁড় করিয়েছেন, তাদের মনে বিদ্রোহ ঢুকিয়েছেন, তাদের বিশ্বাস নষ্ট করছেন। মুইসা অনেকক্ষণ চুপ করে শুনলেন। তারপর বললেন, “আমি কারও বিশ্বাস কেড়ে নিইনি। আমি শুধু বলেছি—বিশ্বাস যেন মানুষকে নিষ্ঠুর না করে।”
এরপর আর কোনো কথা হয়নি। তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো।
পাহাড় সেদিন কোনো শব্দ করেনি। ঝরনা তার নিজের গতিতে বয়ে গেছে। বাতাস বাঁশপাতা নাড়িয়েছে। দূরে পাখি ডেকেছে। আর মুইসার রক্ত মাটিতে মিশে গেছে। সন্ধ্যার লাল আলোয় পাহাড়ের ঢাল দেখে মনে হচ্ছিল, কোথাও আগুন জ্বলছে। কিন্তু কোনো আগুন ছিল না—ছিল শুধু সূর্যাস্ত।
রাতের বৃষ্টি তাঁর দেহের ওপর পড়ল। মাটি নরম হলো। ভোরে কয়েকজন ম্রো নারী তাঁকে খুঁজে পেল। তারা কোনো রাজকীয় আয়োজন করেনি। কয়েক মুঠো মাটি, কিছু বুনো ফুল, ঝরনার জল আর মানুষের কান্নায় তাঁকে পাহাড়ের ঢালে শুইয়ে দিল।
তারপর তাঁর কথা ছড়িয়ে পড়ল আরও দ্রুত। কেউ বলল, মৃত্যুর আগে তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসছিলেন। কেউ বলল, তাঁর শেষ কথা ছিল—“মানুষকে ভালোবাসো।” কেউ বলল, তাঁর মৃত্যুর রাতে পাহাড়ের ওপর আলো দেখা গিয়েছিল। কেউ বলল, তাঁর সমাধির পাশে বসলে ঝরনার শব্দে তাঁর কণ্ঠ শোনা যায়। কোনটি সত্য, কেউ জানত না। কিন্তু মানুষ যখন কোনো প্রিয় মানুষের চলে যাওয়াকে মেনে নিতে পারে না, তখন তার অনুপস্থিতির চারপাশে স্মৃতি নিজের মতো করে একটি মুখ গড়ে নেয়।
মায়েরা সন্তানকে ঘুম পাড়াতে তাঁর গল্প বলত। জুমে যাওয়ার আগে বৃদ্ধরা তাঁর নাম স্মরণ করত। ঝরনা থেকে জল নেওয়ার সময় নারীরা বলত, “জলকে অপমান কোরো না—মুইসা তাই বলেছিলেন।” বনের ভেতর গাছ কাটতে গিয়ে কোনো তরুণের হাত থেমে যেত। তার মনে হতো, গাছটির গায়ে কুঠার বসানোর আগে যেন কেউ তাকিয়ে আছে। সে চারদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখত না। শুধু পাতার ভেতর দিয়ে বাতাস বয়ে যেত।
শিশুরা আগুনের পাশে বসে জিজ্ঞেস করত, “মুইসা কি সত্যিই পাহাড়ের সঙ্গে কথা বলতেন?” বৃদ্ধরা বলত, “হয়তো।” “তিনি কি সত্যিই ভবিষ্যৎ দেখতে পেতেন?”—“হয়তো।” “তাহলে তিনি আবার আসবেন?” বৃদ্ধ তখন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলত, “তিনি তো আছেন।”
শিশু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত।
বৃদ্ধ নিজের বুকের ওপর হাত রেখে বলত, “যখন তুমি অন্যায় দেখে ভয় পাও, কিন্তু তবু সত্য কথা বলো—সেখানে মুইসা আছে। যখন ক্ষুধার্ত মানুষকে নিজের খাবার ভাগ করে দাও—সেখানে মুইসা আছে। যখন নদীকে নোংরা করতে গিয়ে থেমে যাও—সেখানে মুইসা আছে। যখন পাহাড়কে শুধু কাঠ আর পাথর বলে না বরং নিজের ঘর বলে মনে করো—সেখানেও।”
এইভাবে ক্রামা ধীরে ধীরে মানুষের উচ্চারিত কথার সীমা ছাড়িয়ে মানুষের আচরণের মধ্যে ঢুকে গেল। কেউ তাকে আলাদা করে খুঁজল না; বরং নিজের ভেতরেই তার উপস্থিতি টের পেতে লাগল। মুইসার নাম উচ্চারণ না করেও মানুষ তাঁর শেখানো পথ অনুসরণ করত। কোনো মা সন্তানের হাতে জল তুলে দিয়ে বলত, “অপচয় কোরো না।” কোনো বৃদ্ধ জুমে যাওয়ার আগে মাটিতে হাত রাখত। কোনো তরুণ বনে ঢুকে অকারণে গাছ কাটত না। কেউ অন্যায়ের সামনে দাঁড়ালে পাশে থাকা মানুষটি হয়তো শুধু বলত, “ভয় পেও না।”
কথাটুকু কোথা থেকে এসেছে, কেউ আর জিজ্ঞেস করত না।
বছর গেল। মানুষ বদলাল। পাহাড়ের পথ বদলাল। বাইরের পৃথিবী আরও কাছে এলো। পুরোনো ভয় সরে গিয়ে নতুন ভয় এলো। কিন্তু মুইসার গল্প থেকে গেল—আগুনের পাশে, জুমের ধোঁয়ায়, বোনা কাপড়ের নকশায়, শিশুর ঘুমের গল্পে, বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাসে।
এক সন্ধ্যায় এক তরুণ সেই পুরোনো ঝরনার পাশে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করল, “মুইসা কি সত্যিই ছিলেন?”
বৃদ্ধ ঝরনার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কী মনে করো?”
“আমি জানি না।”
বৃদ্ধ একমুঠো জল তুলে তার হাতে দিল। “ধরে রাখো।”
জল আঙুলের ফাঁক দিয়ে নেমে গেল।
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বলল, “এই জন্যই তো সে বেঁচে আছে।”
তরুণ ঝরনার দিকে তাকিয়ে রইল। থুইসা আর রেংখিয়ংয়ের ঢালে তখন সন্ধ্যার ছায়া। কুয়াশা নামছে। রুইমা পাথরের গায়ে আঘাত করে বয়ে যাচ্ছে—নিরবচ্ছিন্ন, নিজের পথের প্রতি অবিচল।
মুইসার শরীর মাটিতে মিশে গেছে। তার কণ্ঠ বাতাসে, তার স্মৃতি মানুষের মুখে, আর তার স্বপ্ন ক্রামার ভেতর দিয়ে চলেছে। দূরে কোথাও একটি বাঁশি বেজে উঠল। তারপর আর কিছু শোনা গেল না।
শুধু রুইমা বয়ে চলল—অন্ধকারের ভেতর দিয়ে, মাটির ভেতর দিয়ে, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের দিকে।
- বিষয় :
- গল্প