ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিষ্যুদবারের ভেলা ভাসান

বিষ্যুদবারের ভেলা ভাসান
×

চাঁদপুরের বেলতলির লেংটার মাজারে ভাদ্রের দ্বিতীয় ও চতুর্থ বৃহস্পতিবার ভেলা ভাসানো হয়

ইমরান উজ-জামান

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৬ | আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

মুন্সীগঞ্জ শহরের কাছেই মুক্তারপুরের মনাই ফকিরের দরগাহর আঙিনায় চলছে এই ভেলা তৈরির কাজ। পাশাপাশি সারি সারি বড় হাঁড়িতে চলছে খিচুড়ি রান্নার কাজ। এই খিচুড়িতে কোনো রকমের আমিষ থাকে না, ভেলা ভাসানির খিচুড়ির এটা বৈশিষ্ট্য। সম্ভবত সব ধর্মের মানুষের খাবার উপযোগী করতে এমনটা নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে। বাগান থেকে বিজোড় সংখ্যার কলাগাছ কেটে আনা হয়েছে। গাছের গুঁড়িগুলো সমান করে কেটে বাঁশের কঞ্চি দিয়ে একসঙ্গে গেঁথে ঘরের ভিটি তৈরি করা হয়েছে। বাঁশের কঞ্চির বেড়া দিয়ে তার ওপর কলাগাছের খোল ও কাগজ দিয়ে মুড়িয়ে তৈরি হয়েছে বেড়া। সব শেষে বেড়ায় রঙিন কাগজ কেটে সজ্জিত করা হয়েছে। বেলুন, ঝালর, চুমকি, রঙিন ফিতা দিয়ে সাজানো হয়েছে। চালাঘরের চূড়ায় লাল, নীল, হলুদ, বেগুনি রঙের ত্রিকোণ পতাকায় এবং কোথাও চাঁদতারায় সাজিয়ে জলযানের রূপ দেওয়া হয়।

ভেলা সাজানো সম্পন্ন হলে নারিকেল, দুধ, কলা, মিষ্টি, ধান, দূর্বা, নানা ধরনের ফল, ফুল, শিন্নি, জোরা কবুতর, খিচুরি, পায়েশ রাখা হয় ভেলায়। আগরবাতি, মোমবাতি, গোলাপ জল ও সিঁদুর দিয়ে ভক্তির শেষ আচর টানা হয় ভেলায়। পরে ভেলা নিয়ে যাওয়া হয় নদীর তীরে, দম-দম আর পীরের নামে নদীতে ভাসানি হয় ভেলা। ভেলা ধলেশ্বরীর জলে ভাসাতে ভাসাতে সন্ধ্যা নামে। ভেলা ভাসালে জলকেন্দ্রিক অমঙ্গল ও বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। এ ছাড়া নানা পার্থিব কল্যাণ কামনা করা হয় ভেলার কাছে। উৎসবে খোয়াজ খিজিরের পাশাপাশি গঙ্গাদেবীও পূজিত হন। ঢাকার মুন্সীগঞ্জের পূর্বাঞ্চলে মুসলমানরা খোয়াজ খিজিরের উদ্দেশ্যে ভেলা ভাসালেও, পশ্চিমাঞ্চলে হিন্দু মেয়েদের ব্রতাচারধর্মী পারিবারিক ভেলা ভাসান উৎসবটি গঙ্গাদেবীর উদ্দেশ্যে উদযাপিত হয়। কোথাও ‘জিন্দাপীর’ আবার কোথাও ‘পরাণ ফকির’-এর উদ্দেশে ভেলা ভাসানো হয়।

ঢাকার আশপাশের প্রায় সব জেলাতেই ভেলা ভাসানি হয়ে থাকে। রাজধানীর মিরপুর, খিলক্ষেত, উত্তরখান, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, নবাবগঞ্জ, কোলাকোপা, আগলা গ্রামে ভেলা ভাসানি হয়। বিক্রমপুরের সর্বত্র ভেলা বাসানো হয়, এর মধ্যে সিরাজদিখানের কদম আলী মস্তানের মাজারে হয় বড় ভেলা ভাসানি এবং বড়শিকারপুর গ্রামে ‘নিমু চাঁন শাহ্’-এর দরগার ভেলা ভাসানি। এ ছাড়া শহরের মোক্তারপুরের মনাই পাগলের মাজারে, জোসনা চিশতির মাজারে বুড়ি ভাদ্দুরিতে ভেলা ভাসানি হয়ে থাকে। তবে দেশের সবচেয়ে বড় ভেলা ভাসানি হয় চাঁদপুরের বেলতলির লেংটার মাজারে। লেংটার মাজারের দুই গদিনশিন ভাদ্রের দ্বিতীয় ও চতুর্থ বৃহস্পতিবার ভেলা ভাসিয়ে থাকেন।

বুড়িগঙ্গার তীরে এক সময় মোগল শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে ভেলা ভাসান উৎসব উদযাপিত হতো বলে জানা যায়। সেই নবাবি আমল থেকে লালবাগে উদযাপিত হয়ে আসছে ‘ভেলা’ ভাসান উৎসব। কমবেশি ৩০০ বছর ধরে ভাদ্র মাসের শেষ বৃহস্পতিবার ওই ভাসান উৎসব উদযাপিত হয়। ড. এম এ রহিম সাহেব তাঁর ‘বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস’ গ্রন্থের ২৪৬ নম্বর পৃষ্ঠায় লিখেছেন–বাঙ্গালী মুসলমানরা ‘বেড়া’ উৎসব পালন করত বলে জানা যায়। এই উৎসব পয়গম্বর খোয়াজ খিজিরের সম্মানার্থে পালন করা হতো। খোয়াজ খিজিরকে সব জলরাশির অভিভাবক বলে বিশ্বাস করা হতো। নবাব মুশির্দকুলি খান বিরাট আড়ম্বরের সঙ্গে এই উৎসব পালন করতেন। কলাগাছ এবং বাঁশের তৈরি নৌকা সাজান এবং তদুপরি কাগজ নির্মিত গৃহ ও মসজিদ ইত্যাদি ছিল ‘বেড়া’ উৎসবের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য।

মুশির্দকুলি খান ৩০০ ঘন ফুট আকারের একটি নৌকা নির্মাণ করেন এবং এর ওপরে তিনি ঘর ও মসজিদ নির্মাণ করেন। তিনি খুব জাঁকজমকের সঙ্গে জাহাজটি আলোকসজ্জিত করে নদীতে ভাসান। জাহাজের আলোক-মালা বহুদূর থেকে দেখা যেত। এই উপলক্ষে আতশবাজির প্রদর্শনীও থাকত। ‘বেড়া’ উৎসবটি বাংলা ভাদ্র মাসের শেষ বৃহস্পতিবার দিনে উদযাপিত হতো। বহু মুসলমান এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করত। নবাব মুকাররম খান কর্তৃক ঢাকায় ১৬২৬-২৭ খৃষ্টাব্দে এ উৎসবটি প্রথম প্রবর্তিত হয়েছিল। কে পি সেন বাংলার ইতিহাস (নবাবি আমল) গ্রন্থের ৭১ নম্বর পৃষ্ঠায় একই রকম তথ্য দিয়েছেন।

ভেলা ভাসানির সারাদিন মাইকে গান বাজে। ছোট বেলায় মাইকে মুজিব পরদেশীর গান বাজতে শুনেছি। তবে বর্ষীয়ানদের মুখে একান্তই ভেলা ভাসানির গান শুনেছি। প্রচলিত ভেলা ভাসানির গান এর মধ্যে একটি–

কলার ভেলায় ঘর বান্দিলাম
সেই ঘরেতে বাত্তি দিলাম
নকুল, বাতাসা, সবরি কলা, আরও কলার থোড়
সেই না ভেলায় দিলাম আমি, বাবার নামে জোরা কইতর।।

বাবা আর খোয়াজ খিজির
একই সাথে করে জিকির
ইছামতী নদীর নিচে, করেন খেলা মিছামিছি।
গঙ্গী মায়ের দাওয়াত পেয়ে
গেছেন তারা উজান বেয়ে
সেই দাওয়াতে দরবেশ ফকির
গরিব দুঃখি সবাই হাজির
আনন্দেরই এমন দিনে, করে সবাই 
চেঁচামেচি।। 

আরও পড়ুন

×