ভারতের ললাটে সোভিয়েতের বিভক্তি আসন্ন

প্রতিবেশী

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরী

রাশিয়ার কমিউনিস্ট নেতা জোসেফ স্তালিন এক হাতে সমাজতন্ত্রের আদর্শ, অপর হাতে সামরিক শক্তির দম্ভ ও চতুরতায় পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীগুলোকে পদানত করে ১৯২২ সালে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রাষ্ট্র সোভিয়েত রাশিয়া, যার ইংরেজি নাম ইউএসএসআর। সোভিয়েত রাশিয়ার বিস্তৃতি ছিল উত্তর এশিয়া থেকে শুরু করে পূর্ব ইউরোপ, সীমানা ছিল পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, রুমানিয়া, চেকোশ্নোভাকিয়া, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, তুরস্ক, মঙ্গোলিয়া, ইরান, আফগানিস্তান, উত্তর কোরিয়া ও চীনের সঙ্গে। এত বড় দেশ ও শক্তিশালী রাষ্ট্র শতবর্ষ দূরে থাকুক, ৭০ বছর উদযাপন করতে পারেনি। অন্য ধর্মাবলম্বী ও জাতিগোষ্ঠীর প্রতি অসম ব্যবহার এবং অন্যায় আচরণের কারণে। ইসলাম ও খ্রিষ্টান ধর্ম পালনে বিঘ্ন সৃষ্টি, রুশ ভাষা ছাড়া অন্যান্য ভাষা ও সংস্কৃতির উন্নয়ন ও বিকাশে বাধা দেওয়া, ভিন্ন মতের কণ্ঠস্বরদের সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে কেবল রোধ নয়; ব্যাপকভাবে গুম ও নির্বাসন দেওয়া শাসন চালু করেছিল। আঞ্চলিক প্রাকৃতিক সম্পদের স্থানীয় ব্যবহার সৃষ্টি না করে মূল রাশিয়ায় ব্যাপক শিল্প সৃষ্টিতে ব্যবহার করে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ক্ষোভ বাড়িয়েছে। এসব পরবর্তী সময় বিদ্রোহে রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ১৫টি রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পুরো স্বাধীনতা বা স্বায়ত্তশাসন অর্জন করেছে। রাষ্ট্রগুলো হচ্ছে- রাশিয়া, জর্জিয়া, উইক্রেন, মলডোবা, বেলারুশ, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, কাজাকিস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কিরগিজস্তান, তাজাকিস্তান, লিথুনিয়া, লাতবিয়া ও এস্তোনিয়া। শক্তিধর সোভিয়েত রাশিয়া স্তিমিত হয়েছে ১৯৯২ সালে।

সোভিয়েত বিভক্তির প্রায় সব উপাদান ভারত প্রজাতন্ত্রের জন্মকাল থেকে বিদ্যমান ছিল। মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর অহিংসার মূলমন্ত্র ভারত প্রজাতন্ত্রের ভাগ্য নির্ধারণে নিয়োজিত ব্রাহ্মণদের অন্তরে কখনও স্থান পায়নি। ভারতে অন্য ধর্মাবলম্বী বিশেষত, মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ, ধর্মীয় অনুশাসন পালনে বাধা ও ঘৃণা সৃষ্টি এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুদের পদদলিত রাখার ক্রমাগত চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশের বিপরীতে সর্ব ভারতীয় ভাষা হিসেবে হিন্দির প্রচলনের জন্য উত্তর ভারতীয় শাসক ব্রাহ্মণদের ব্যাপক আর্থিক সাহায্য, ক্রমাগত প্রচারণা ও আনুকূল্যে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতের রাষ্ট্রগুলোর ওপর হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ায় আঞ্চলিক ক্ষোভ বাড়তে থাকে। কাশ্মীর-জম্মুর ৮০ শতাংশের বেশি অধিবাসী মুসলমান। তাদের আকাঙ্ক্ষা স্বাধীন কাশ্মীরের। জনগণের মতামতের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে কাশ্মীর-জম্মুর হিন্দু শাসক ডোগরা মহারাজা হরি সিং হিন্দুপ্রধান ভারত প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে চক্রান্তে লিপ্ত হন। ভারত প্রজাতন্ত্র সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে অতর্কিতে ২৭ অক্টোবর ১৯৪৭ সালে কাশ্মীর দখল করে। কাশ্মীরের জনগণের আবেদনক্রমে পাকিস্তান কাশ্মীরের অংশবিশেষ 'উদ্ধার' করলে, ৩১ ডিসেম্বর ১৯৪৭ সালে ভারত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সাহায্য কামনা করে। ১ জানুয়ারি ১৯৪৯ সালে যুদ্ধবিরতি ও কাশ্মীরে গণভোটের প্রস্তাব গৃহীত হয় নিরাপত্তা পরিষদে। প্রতিশ্রুতি ভেঙে ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৪ সালে কাশ্মীরকে বিশেষ বিবেচনাধীন রাজ্যরূপে ভারত অন্তর্ভুক্ত করে এবং সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে নারী ও তরুণদের ওপর নিপীড়ন চালাতে থাকে। প্রায় একই পদ্ধতিতে সিকিম রাজ্যকে ভারত প্রজাতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত করেছে। সম্প্রতি ৫ আগস্ট ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের ৩৫ (ক) ও ৩৭০ ধারা অবলুপ্ত করে আট লাখ সেনা মোতায়েন করেছে এবং সব মৌলিক অধিকার রহিত করেছে। কাশ্মীরের জনগণের ক্ষোভ অগ্নিস্ম্ফুলিঙ্গে রূপ নিচ্ছে।

৩-৮ জুন ১৯৮৪ সালে ভারতীয় জেনারেল কুলদীপ সিং ব্রারের নেতৃত্ব অপারেশন ব্লুস্টার পাঞ্জাবের অমৃতসরে শিখদের প্রাণপ্রিয় হরমন্দির সাহিব (স্বর্ণ মন্দির) ধ্বংস করার চিত্র আজও সজ্জন ভারতীয়দের চিত্ত থেকে মুছে যায়নি। হিন্দু গেরুয়াধারী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ (আরএসএস), ডিএইচপি, বজরঙ্গ দল ও শিবসেনা দলিত হিন্দু, সংখ্যালঘু মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের ওপর বিভিন্ন ধরনের অত্যাচার অব্যাহত রেখেছে ভারত প্রজাতন্ত্র সৃষ্টির পর থেকে।

ভারতের প্রায় দুইশ' বছরের (১৭৫৭-১৯৪৭) স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের হিন্দু সরকার সুপরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের অবদানের কথা অনুল্লেখ করে বিস্মৃত করেছেন। ভারতীয় হিন্দু শাসকরা সুপরিকল্পিতভাবে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের অবদান অনুল্লেখ করে তাদের মনে হীনমন্যতা সৃষ্টি করেছে। জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ জেনারেল ডায়ারের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়েছে; কিন্তু জালিয়ানওয়ালাবাগ প্রতিবাদের প্রাণপুরুষ ব্যারিস্টার সাইফুদ্দিন কিচলুর নাম নেই। তার যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয়েছিল। কিশোর ক্ষুদিরামের কাহিনি ইতিহাস। অথচ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ যিনি বিপ্লবীদের অহরহ ফাঁসি দেওয়া কলকাতা হাইকোর্টের বিচারক নরম্যানকে প্রকাশ্য দিবালোকে হাইকোর্টের সিঁড়িতে অসম সাহসে হত্যা করেছিলেন ২০ সেপ্টেম্বর ১৭৭১ সালে, তার স্থান হয়নি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে। নেহরুর সমসাময়িক ব্যারিস্টার খাজা আবদুল মজিদ ও তার স্ত্রীর বহু বছর জেল খাটার উল্লেখ নেই ভারতের সরকার প্রণীত স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস গ্রন্থে। সে ইতিহাসে উল্লেখ নেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর প্রধান সহকারী আবিদ হাসান শাহনেওয়াজ খান এবং অনন্য সাহসী সেনানী কর্নেল জেড কিয়ানী, আবদুল করিম গনি, কর্নেল জিলানীর সাহসিকতার কথা। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ও কংগ্রেস সভাপতি হাকিম আজমল খানকেও অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। ইংরেজদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে আত্মদানকারী পালোয়ান শিশু খানের নামও ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে নেই।

লর্ড মেয়োর আন্দামান পরিদর্শনকালে বিপ্লবী কার্যকলাপের কারণে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত শের আলী হঠাৎ আক্রমণ করে লর্ড মেয়োকে হত্যা করে ফাঁসিতে আত্মদান করেন। শের আলী মুহাম্মদ আবদুল্লাহর মতো স্থান পাননি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং অধ্যাপক শান্তিময় রায় এই বিষয়ে সম্প্রতি একটি বই লিখেছেন ভারতের মুক্তি সংগ্রাম ও মুসলিম অবদান।

উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিতাড়নের জন্য ভারতের শাসকগোষ্ঠী অনুসরণ করেছে শিবাজীর অনুকরণে বিভক্তির এক পন্থা এনআরসি। ফলে ৪০ লাখ মুসলমান গৃহহারা ও কর্মচ্যুত হচ্ছে। এনআরসি কার্যকর করা হয়েছে ৩১ আগস্ট ২০১৯ তারিখে। এনআরসির নামবহির্ভূত আসামের হিন্দু-মুসলমানদের বিশেষ সেনাছাউনিতে স্থানান্তর শুরু হয়েছে। হতাশায় আত্মহত্যার সংবাদ আসছে। কেন্দ্রীয় ভারত সরকার সামরিক বাহিনীর দ্বারা নিয়ন্ত্রণ রাখছে আসাম, কাশ্মীর, তামিলনাড়ু, খালিস্তান, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, অরুণাচল, মণিপুর ও ত্রিপুরা। এসব রাজ্যের জনগণ উত্তর ভারতের উপনিবেশতুল্য আচরণ এবং ধর্মীয় বর্ণবৈষম্যবাদের যাতনায় জর্জরিত। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে উচ্চবর্ণের শাসকদের অত্যাচার থেকে মুক্তির জন্য সংগঠিত হচ্ছে মাওবাদী নকশালপন্থিরা। বিস্তারিত হচ্ছে তাদের বিচরণ ক্ষেত্র পশ্চিমবঙ্গ থেকে দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক পর্যন্ত। মাওবাদীদের অবাধ বিচরণের কারণে এই অঞ্চল 'লাল অলিন্দ' নামে পরিচিতি লাভ করেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী, পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের কথা ভারতীয় মিডিয়াতে স্থান পাচ্ছে। ২০১৫ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাত সিং অল্প্রব্দ, তেলেঙ্গানা, ছত্রিশগড় এবং লাল অলিন্দের নিরাপত্তার জন্য ২৫ ব্যাটালিয়ন নিরাপত্তা সেনাবাহিনী সৃষ্টি করেছেন জনগণকে সাহায্যের জন্য নয়, চরম নিপীড়নের মাধ্যমে দমনে।

ভারতে মুসলমানরা নিজের পছন্দমতো খাদ্য ও সংস্কৃতিচর্চা করতে পারে না। সরকারি চাকরিতে তাদের অবস্থান দলিতদেরও নিচে। অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংস ও দখল করার ঘটনা ভারতীয় আদালতে বিচারাধীন। এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গেরুয়া সরকারের প্রধান পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ (আরএসএস) প্রধান মোহন ভগবত বলেছেন, উন্নত হিন্দু সংস্কৃতির কারণে ভারতের মুসলমানরা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে সুখী। বিদ্রূপ না কাটা গায়ে লবণের ছিটা? ভিন্নমতাবলম্বীদের জোর করে শ্রীজয়রাম বলানো ব্রাহ্মণ্যবাদের বিকাশ এবং সরকারের অলিখিত নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত। 'সাত কন্যা' রাজ্যে 'উলফা' কার্যক্রম স্তিমিত হয়েছে বটে; তবে আসামের জনগণের আকাঙ্ক্ষা কখনও মুছে যাবে না।

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মাওবাদীদের আখ্যা দিয়েছেন একক বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জরূপে। ভারতের স্বরাষ্ট্র সচিব জি কে পিল্লাই বলেছেন, মাওবাদী নকশালদের লক্ষ্য ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের অবসান! ২০৪৭ সালে ভারত প্রজাতন্ত্রের শতবার্ষিকী কি কেবল পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা, মহারাষ্ট্র, মধ্য প্রদেশ ও উত্তর প্রদেশে পালিত হবে? না দক্ষিণ ও উত্তর-পূর্ব ভারতেও? ভারত প্রজাতন্ত্রের কপালে কি সোভিয়েত রাশিয়ার (১৯২২-১৯৯১) ভাগ্য লিখন নির্ধারিত?

ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র