ডলার সংকট
মালদ্বীপে বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার পথ
মো. ওবায়দুল্লাহ
মো. ওবায়দুল্লাহ
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:০৮
মালদ্বীপে বৈদেশিক মুদ্রার যে ঘাটতি চলছে, তা বৃহত্তর অর্থনৈতিক চাপের অংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং বাইরের ধাক্কায় দেশটির অর্থনীতির ঝুঁকির কথা বলেছে। পর্যটন মালদ্বীপের অর্থনীতিকে সচল রাখলেও বিপুল আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ ও অর্থায়নের চাপ এবং ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশটিকে দুর্বল অবস্থায় রেখেছে। মালদ্বীপের এ ডলার সংকট শুধু দেশটির জন্যই চিন্তার বিষয় নয়; বাংলাদেশও তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ব্যাংক বা অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে ডলার পাওয়া না গেলে শ্রমিকের সামনে সাধারণত দুটি পথ থাকে। হয় তাকে টাকা পাঠানো পিছিয়ে দিতে হয়, নয়তো খোলাবাজারে বেশি রুফিয়া দিয়ে ডলার কিনতে হয়। উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতি প্রথমত দেশে থাকা সংশ্লিষ্ট শ্রমিকের পরিবারের, দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের অর্থনীতির। মালদ্বীপ মুদ্রা কর্তৃপক্ষের (এমএমএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটির ব্যাংকবহির্ভূত অর্থ স্থানান্তরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ১৫ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ বিদেশে পাঠানো হয়েছে। মোট অর্থের ৭২ শতাংশ, অর্থাৎ ১১ কোটি ২০ লাখ ডলারের বেশি গেছে বাংলাদেশে।
বাংলাদেশ হাইকমিশন সমস্যাকে কেবল নিয়মিত কনস্যুলার সেবার বিষয় হিসেবে না দেখে যে বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও শ্রমিক সুরক্ষার প্রশ্ন এতে রয়েছে, তাতে মনোযোগ দিতে পারে। হাইকমিশন মালদ্বীপের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, এমএমএ এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করেছে। উদ্দেশ্য টাকা পাঠানোর প্রক্রিয়া ঠিক কোথায় আটকে যাচ্ছে এবং বাস্তবে কোন সমাধানগুলো কার্যকর হতে পারে, তা বোঝা।
হাইকমিশন বাংলাদেশি শ্রমিক ও তাদের নিয়োগকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রেখেছে। আইন ও বাস্তবসম্মত ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাদের অনুমোদিত পথে শ্রমিকদের ডলার পেতে সহায়তা করা অথবা ডলারের মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতনব্যবস্থা বিবেচনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। সব কর্মক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা করা সম্ভব নাও হতে পারে। তবু এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি রয়েছে, শ্রমিক সুরক্ষা মানে শুধু তার পাসপোর্ট বা চাকরির চুক্তিপত্র রক্ষা নয়। চুক্তি অনুযায়ী পাওয়া বেতনের প্রকৃত মূল্য রক্ষা করাও এর অংশ।
এই আর্থিক সুরক্ষাকে মালদ্বীপে বাংলাদেশের বৃহত্তর শ্রম কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত করা দরকার। এর মধ্যে রয়েছে চাকরি-সংক্রান্ত অভিযোগের সমাধান, দক্ষ কর্মীদের জন্য সুযোগ বাড়ানো এবং বৈধ কাগজপত্র ছাড়া থাকা শ্রমিকদের আইনি কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ। কারণ, বৈধ পরিচয়পত্র বা ব্যাংক হিসাব না থাকা একজন শ্রমিক আনুষ্ঠানিকভাবে টাকা পাঠানোর সুযোগ থেকেও বাদ পড়তে পারেন। তখন তার অনিরাপদ ও অনানুষ্ঠানিক পথে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
মালদ্বীপকে সীমিত বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে দেশের নানা প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশি শ্রমিকদেরও তাদের বৈধভাবে অর্জিত বেতনের মূল্য পাওয়ার ন্যায্য অধিকার রয়েছে। টেকসই সমাধানে এ দুই বাস্তবতাকেই স্বীকার করতে হবে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক ও এমএমএর মধ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের বৈধ পথে টাকা পাঠানো নিয়ে একটি নির্দিষ্ট যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। প্রতি মাসে সম্ভাব্য কত অর্থ পাঠানো হবে; কত বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন; কোথায় বিলম্ব হচ্ছে এবং অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলো কী সমস্যায় পড়ছে; এসব তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনা করা দরকার। এই সমন্বয় ডলারের ঘাটতি দূর করবে না, তবে শ্রমিক ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পনা করতে সাহায্য করবে।

তীব্র সংকটের সময়ে মালদ্বীপ কর্তৃপক্ষ যাচাই করা বেতন থেকে দেশে পাঠানো অর্থের জন্য আরও নিয়মিতভাবে বৈদেশিক মুদ্রা দেওয়ার একটি নীতিমালা বিবেচনা করতে পারে। এর অর্থ, কোনো একটি দেশের নাগরিককে সীমাহীন বিশেষ সুবিধা দেওয়া নয়। বরং মালদ্বীপের মুদ্রানীতি ও রিজার্ভের সীমাবদ্ধতা মেনে বৈধ আয়ের জন্য নিয়মভিত্তিক একটি ব্যবস্থা করা।
মালদ্বীপের রুফিয়া ও বাংলাদেশের টাকার মধ্যে সরাসরি লেনদেন বা হিসাব সমন্বয়ের ব্যবস্থা হলে মুদ্রা বদলের কয়েকটি ধাপ ও কিছু খরচ কমতে পারে। তবে এটি কার্যকর হবে কিনা, তা নির্ভর করবে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ, মুদ্রার চাহিদা, আর্থিক বিধিবিধান এবং জমে থাকা পাওনা কীভাবে মেটানো হবে– এসব বিষয়ের ওপর। তাই রাজনৈতিক ঘোষণা দেওয়ার আগে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে বিস্তারিত পরীক্ষা দরকার।
নিয়োগকর্তা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমাধানের অংশ করতে হবে। আইন অনুমতি দিলে নিয়োগকর্তারা শ্রমিকদের বেতন গ্রহণের ব্যাংক হিসাব খুলে দেওয়া, সেখান থেকে সরাসরি দেশে টাকা পাঠানো কিংবা অনুমোদিত পথে বৈদেশিক মুদ্রা কেনায় সহায়তা করতে পারেন। ব্যাংক ও অর্থ স্থানান্তরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বিনিময় হার, সেবামূল্য, সেবা পাওয়ার শর্ত এবং টাকা পৌঁছাতে সম্ভাব্য সময় স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। স্বচ্ছ তথ্য থাকলে শ্রমিকরা বৈধ সেবাগুলোর তুলনা করতে পারবেন এবং অনানুষ্ঠানিক দালাল বা প্রতারণার ঝুঁকি কমবে।
মালদ্বীপে বাংলাদেশের ব্যাংকিং উপস্থিতি বাড়লে প্রবাসী আয়, বাণিজ্য অর্থায়ন ও বিনিয়োগে সুবিধা হতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বর্তমান সংকট দেখিয়েছে, একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি এবং বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা পরস্পর সম্পর্কিত হলেও এক বিষয় নয়। বাণিজ্যিক লেনদেন, আর্থিক প্রযুক্তি বা কাঠামোবদ্ধ অর্থায়নে বৃহত্তর সহযোগিতার সিদ্ধান্তও নিতে হবে কারিগরি সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা যাচাই করে।
প্রবাসী আয় বৈধ পথে রাখার মধ্যে মালদ্বীপেরও স্বার্থ আছে। অনুমোদিত পথে নিয়মিত ডলার পাওয়া গেলে খোলাবাজারের ওপর নির্ভরতা কমবে; অর্থের প্রবাহ আরও স্বচ্ছ হবে এবং দেশটির অর্থনীতিতে অবদান রাখা বিদেশি শ্রমিকদের আস্থা বাড়বে। অন্যদিকে বাংলাদেশও লাভবান হবে। কারণ নিরাপদে আসা প্রবাসী আয় পরিবারগুলোর জীবনযাত্রায় সহায়তা করবে এবং দেশের আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্ত হবে।
হাইকমিশন সঠিকভাবেই বুঝেছে, বৈদেশিক মুদ্রার এই চাপ সরাসরি শ্রমিককল্যাণের সঙ্গে যুক্ত। এখন এ উদ্যোগকে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় রূপ দিতে হবে, যেখানে কূটনীতিক, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, নিয়োগকর্তা এবং অনুমোদিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান সবাই যুক্ত থাকবেন।
এসব তৎপরতার তাৎক্ষণিক লক্ষ্য একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের বৈধ বেতন অনুমোদিত পথে, স্বচ্ছ ও অনুমানযোগ্য খরচে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা; আর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য এমন একটি বাংলাদেশ-মালদ্বীপ আর্থিক সম্পর্ক গড়ে তোলা, যা ভবিষ্যতের বাজার চাপও সামলাতে পারবে। ডলার ঘাটতি মালদ্বীপের সামষ্টিক অর্থনীতির সমস্যা। কিন্তু সেই সংকটের অসম বোঝা যাতে প্রবাসী শ্রমিকদের কাঁধে না পড়ে।
মো. ওবায়দুল্লাহ: পিএইচডি গবেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র
- বিষয় :
- আইএমএফ