ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অধিকার

কওমি সনদের স্বীকৃতি বনাম নিয়োগে বৈষম্য

কওমি সনদের স্বীকৃতি বনাম নিয়োগে বৈষম্য
×

অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী

মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৩০ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৩০

সম্প্রতি কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) সনদপ্রাপ্ত আলেম, হাফেজ ও কারিদের আলিয়া মাদ্রাসায় শর্তসাপেক্ষে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ-এনটিআরসিএ কর্তৃক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তারা আলিয়া মাদ্রাসার সর্বনিম্ন গ্রেডে সহকারী মৌলভি ও ইবতেদায়ি কারি পদে নিয়োগ পাবেন। কিন্তু নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিয়োগের শর্ত ও কাম্য যোগ্যতা ২০১৮ সালের ৪৮ নং আইনের পরিপন্থি ও বৈষম্যমূলক। 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এমপিও শাখা কর্তৃক ২৩ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (আলিয়া মাদ্রাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা ২০২৬’ সহকারী মৌলভি (কারি) ও ইবতেদায়ি কারি নিয়োগের কাম্য শিক্ষাগত যোগ্যতা সংক্রান্ত পরিপত্র প্রকাশিত হয়েছে। 

উভয় পদে কাম্য সর্বনিম্ন শিক্ষাগত যোগ্যতা বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড (আলিয়া) থেকে দাখিল (মুজাব্বিদ) আলিম (মুজাব্বিদ মাহির) এবং সরকার স্বীকৃত যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাজিল অথবা সরকার স্বীকৃত যে কোনো শিক্ষা বোর্ড থেকে ইলমে কিরাত বা হাফেজে কোরআন উত্তীর্ণ সনদসহ সরকার স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হতে ফাজিল, অনার্স অথবা আল হাইয়াতুল উলয়ালিল জামিআতিল কওমিয়া বাংলাদেশ থেকে দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রিসহ ৬টি কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে ইলমে কিরাত, হিফজুল কোরআন সনদ থাকলে উক্ত পদে এনটিআরসিএর যথযাথ নিয়ম অনুসরণ করে নিবন্ধন হতে হবে।

নিবন্ধন পরীক্ষা তিনটি ধাপে হয়ে থাকে। প্রাথমিক ধাপে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও সাধারণ জ্ঞান ১০০ নম্বরের এমসিকিউ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। দ্বিতীয় ধাপে, যে বিষয়ের শিক্ষক হতে আগ্রহী, ওই বিষয়ে ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। এসব পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হবেন, তাদের তৃতীয় ধাপে মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে। সমস্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর যোগ্যতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণদের মেধা তালিকা করে সার্টিফিকেট প্রদান করা হবে। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে এনটিআরসিএ শূন্য পদের জন্য তালিকাভুক্তদের অনলাইনে আবেদন করার জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলে তখন চাকরিপ্রার্থীদের মেধা তালিকায় সর্বাধিক যোগ্য বলে যারা বিবেচিত হবেন; ধারাবাহিকভাবে তাদেরকেই শূন্য পদে নিয়োগের জন্য যে প্রতিষ্ঠানের পদ শূন্য রয়েছে, সে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে নিয়োগ প্রদানের সুপারিশ করবেন। 

প্রতিযোগিতা ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সাধারণত যেসব সাধারণ বিষয়ে পরীক্ষায় আলিয়া ও জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত, তারা নিবন্ধন পরীক্ষায় ভালো ফল করে থাকেন। বর্তমান প্রক্রিয়ায় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষিতদের সাধারণ বিষয়ের ফলে অকৃতকার্য হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেখা গেল, ১০ হাজার কওমি আলেম এনটিআরসিএর পরীক্ষায় অংশ নিয়ে খুব কম সংখ্যক পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হলেন। পরে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সবখানে। এর মাধ্যমে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে।

যেহেতু এনটিআরসিএর মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ পর্যায়ে নিয়োগ একটি প্রতিযোগিতামূলক দীর্ঘমেয়াদি নিয়োগ প্রক্রিয়া। অন্যদিকে কওমি শিক্ষা কারিকুলাম একটি বিশেষায়িত দ্বীনি শিক্ষাব্যবস্থা। যেখানে মৌলিক দ্বীন শিক্ষাকে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়। অন্য সাধারণ শিক্ষার সিলেবাসকে সময়ের প্রয়োজন অনুসারে বিন্যস্ত করা হয়েছে। এমতাবস্থায় চাকরির বাজারে কর্মসংস্থানের উপযোগী করে কওমি শিক্ষাকে নতুনভাবে কারিকুলামে সাধারণ বিষয় প্রতি স্তরে নেসাবভুক্ত করার চাপ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে আসতে পারে। 

অন্যদিকে সহকারী মৌলভি কারি ও ইবতেদায়ি কারি পদটি বেতন স্কেল ও গ্রেড নতুন নিয়োগবিধি অনুযায়ী জাতীয় বেতন স্কেল ও গ্রেড অনুযায়ী সর্বনিম্ন স্তরের। এমতাবস্থায় মাস্টার্স ডিগ্রির সমমানসম্পন্ন কওমি আলেম, হাফেজ, কারি পদে যোগদান করলে তাকে ওই পদেই চাকরিজীবন শেষ করতে হবে। কারণ ওই পদ থেকে পেশাগত পদোন্নতি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যেমন তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (অফিস সহকারী, দপ্তরি, নৈশপ্রহরী) আজীবন একই পদে চাকরি করে থাকেন। একই শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে পদমর্যাদা ও বেতন খুবই বৈষম্যমূলক। দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের সমমান দেওয়া হলেও কওমি আলেমদের সহকারী মৌলভি-কারিদের গ্রেড-১১ ও ইবতেদায়ি কারিদের গ্রেড-১৬ বেতন স্কেলও অমর্যাদাকর। 

এতে প্রতীয়মান, রাষ্ট্র কওমি সনদের স্বীকৃতি দিয়েছে কিন্তু সমমর্যাদা দেয়নি। অদূর ভবিষ্যতে এই বৈষম্য কেবল বেতন-ভাতা নয়; রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত যেমন- সরকারি মসজিদ, সেনাবাহিনীসহ সকল বাহিনীর ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও এ নীতিমালার সংস্কৃতি চালু হবে। বিশ্ববিদ্যালয় আলিয়া মাদ্রাসার সমমান হওয়ার পরও আলিয়া মাদ্রাসার মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ফকিহ পদে কওমি আলেমদের কোনো সুযোগ প্রদান হয়নি।

আমরা আশা করি, এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসা বোর্ডগুলোর দায়িত্বশীলরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে আন্তরিক হবেন।

অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী: সভাপতি, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষক পরিষদ ও নায়েবে আমির, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ

আরও পড়ুন

×