ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অধিকার

নেপচুন গ্রহে নয়, সরই পাহাড় বাংলাদেশে

নেপচুন গ্রহে নয়, সরই পাহাড় বাংলাদেশে
×

পাভেল পার্থ

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৮ জানুয়ারি ২০২৩ | ২২:১৪

খ্রিষ্টীয় বছরের শেষ ও শুরুতে 'ফানুস-পটকাবাজি' নিয়ে কয়েক বছর ধরে ঢাকাসহ নগরগুলোতে আরেক বেতাল শুরু হয়েছে। এর উদ্ভট আওয়াজ ও আগুন দম আটকানো শহরে বহু কষ্টে টিকে থাকা অনেক পাখিকে নিরাশ্রয় করেছে। বৌদ্ধকৃত্যে ফানুস ওড়ানো এক পবিত্র প্রথা হিসেবে পালিত হলেও বর্ষবরণে এর বেতাল ব্যবহার সর্বপ্রাণ ও জীবনে শুধু ভোগান্তিই তৈরি করছে।

নগর থেকে দূর প্রান্তের পাহাড়েও বর্ষবরণের রাতে আগুন জ্বলেছে। পুড়ে ছারখার হয়েছে বসত-জমিন। বান্দরবানের লামার সরই পাহাড়ে রেংয়েনপাড়ায় গভীর রাতে অগ্নিসংযোগ, হামলা ও লুটপাট হয়। ছোট্ট ম্রোপাড়ার মানুষ আতঙ্কে পাহাড় ডিঙিয়ে প্রাণ বাঁচায়। পেছনে পুড়তে থাকে ঘামের দানায় গড়ে তোলা স্বপ্নের গেরস্তালি। সব হারিয়ে গৃহহীন মানুষ পাহাড়ের ওপর আকাশের তলে কোনোমতে আগুন জ্বালিয়ে তীব্র শীতের দিনগুলো পার করছে। ক্ষতিগ্রস্ত পাড়াবাসীর অভিযোগ, লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের লোকজন তাদের উচ্ছেদ করে পাহাড়ি ভূমি জবরদখলের জন্য হামলা ও অগ্নিসংযোগ করেছে।

লামার সরই পাহাড়ের আদিবাসীদের সঙ্গে লাগাতার এই অন্যায় করা হচ্ছে। বহুবার আগুন লাগানো হয়েছে; ফলদ বৃক্ষ ও জুম ক্ষেত ধ্বংস ও হামলা হয়েছে। খাবার পানির ছড়ায় বিষ ঢেলে দেওয়া হয়েছে। এটি প্রমাণিত- এর পেছনে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের ভূমি জবরদখলের বাহাদুরিই মূল কারণ।

সরই পাহাড় কোনো ভিন গ্রহ নয়; নেপচুন নয়; স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অংশ। এই রাষ্ট্র তার সংবিধানে সব নাগরিকের প্রতি সমমর্যাদা ও নিরাপত্তা বিধানের অঙ্গীকার করেছে। লামা রাবার কোম্পানি কি রাষ্ট্র থেকে বড় কিছু হয়ে গেল? আশা করব, লামার সরই পাহাড়ে অঙ্গার হওয়া পাহাড়ি গ্রাম ও ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র নজর দেবে। শঙ্কিত ও নিপীড়িত নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আশা করি, নাগরিক সমাজের প্রতিক্রিয়া সোচ্চার ও সক্রিয় হবে।

ডেটলাইন: ২৬ এপ্রিল ২০২২

লামা উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ে দীর্ঘদিন ধরে জুমের জমিন এবং পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্র জবরদখল করে রাবার বাগান করার জন্য তৎপর নানা কোম্পানি। এমন এক পাহাড়ের ম্রো নাম সরই হোং বা সরই পাহাড়। এর প্রায় ৪০০ একর পাহাড়ি বনাঞ্চল ও জুম জমিন দখলের পাঁয়তারা করে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ। পাহাড়ি বন, জুম ও পাড়া সুরক্ষার দাবি জানিয়ে ২০২২ সালের ২০ মার্চ বান্দরবান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী মানববন্ধন করে। ক্ষতিগ্রস্ত জুমিয়া পরিবারের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা বিবৃতিও দেন। কিন্তু বান্দরবান প্রশাসন উল্লিখিত পাহাড় সুরক্ষায় এলাকাবাসীর দাবিকে গুরুত্ব দেয়নি। ২৬ এপ্রিল এ কোম্পানি সরই পাহাড়ে আগুন লাগায়। এতে শুধু জুম ক্ষেত বা ফলের গাছ নয়; চরম ক্ষতি হয় পাহাড়ের বাস্তুতন্ত্র ও প্রাণবৈচিত্র্যের। কোম্পানির আগুনে পাখি, মৌমাছি, বিড়াল গোত্রের প্রাণী এবং ঝিরির কাঁকড়া ও মাছ মরে পানি দূষিত হয়েছিল। খাদ্য ও খাদ্যের উৎস পুড়ে যাওয়ায় দ্রুতই এক নিদারুণ খাদ্যাভাব তৈরি হয় এই পাহাড়ি গ্রামগুলোয়।

কোম্পানির 'দোষ' প্রমাণিত

গত বছর ২৬ এপ্রিল অগ্নিকাণ্ডের পর লাংকম ম্রোপাড়ার কারবারী লাংকম ম্রো লামা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। আসামিদের মধ্যে রাবার কোম্পানির ব্যবস্থাপক মো. আরিফ হোসেন ও মাঝি মো. দেলোয়ারকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ২৯ এপ্রিল এ ঘটনার নিন্দা ও বিচারের দাবিতে ২৮ নাগরিক বিবৃতি দেন। লামা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৮ মে ত্রাণ নিয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামগুলো ত্রাণ ফিরিয়ে দেয়। কারণ সেখানে অভিযুক্ত রাবার কোম্পানির লোক ছিল। পরবর্তী সময়ে লামার পাহাড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে অনেকেই বিভিন্ন সহযোগিতা নিয়ে দাঁড়ান। ঘটনার তদন্ত করতে জেলা পরিষদ সদস্য মো. মোজাম্মেল হককে আহ্বায়ক করে ৫ মে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ। এ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্যশৈহদ্মার কাছে ১৮ মে প্রতিবেদন দেয় তদন্ত কমিটি। ১৯৯৫-৯৬ সালে রাবার চাষের জন্য শর্তসাপেক্ষে পাহাড়ি ভূমি বন্দোবস্ত নেয় লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ। শর্তমতে, বন্দোবস্ত নেওয়ার তিন বছরের মধ্যে রাবার চাষে যেতে না পারলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চুক্তি বাতিল হওয়ার কথা। বন্দোবস্ত জমিতে দীর্ঘ দিনেও রাবার চাষে যায়নি লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ এবং বন্দোবস্ত বাতিল হওয়া জমিকে চাষের উপযোগী করে চাষাবাদ শুরু করে স্থানীয় গরিব আদিবাসী জনগণ। অগ্নিকাণ্ডে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের জড়িত থাকার তথ্য খুঁজে পায় তদন্ত কমিটি।

ঝিরির পানিতে বিষ

গত বছর ৬ সেপ্টেম্বর রেংয়েন ম্রো কারবারীপাড়া, জয়চন্দ্র ত্রিপুরাপাড়া ও লাংকম ম্রোপাড়ার মানুষের খাবার ও ব্যবহারের পানির একমাত্র উৎস পাহাড়ি ঝিরিতে বিষ দেয় রাবার কোম্পানির লোকজন। পাহাড়ি পথের চড়াই-উতরাই ডিঙিয়ে বেশ কিছুদিন অন্য ঝিরি থেকে তাদের পানি সংগ্রহ করতে হয়। বিষ দেওয়াতে ঝিরির মাছ, কাঁকড়া, শামুক, চিংড়ি, পতঙ্গ এবং শৈবাল মরে যায়। লামা রাবার কোম্পানির চলমান এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার চেয়ে ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় বিক্ষোভ সমাবেশ করে ঢাকাস্থ আদিবাসী ছাত্র সংগঠনগুলো।

রাষ্ট্র ন্যায়বিচার করবে

লামার সরই পাহাড়ে মানুষ থাকে। এখানে গ্রাম-বসতি আছে। আছে জুম চাষ ও ফলের বাগান। এখানে ঝিরি-পাহাড় মিলিয়ে বহু বুনো প্রাণের বাস্তুতন্ত্র আছে। রাষ্ট্রের আইন ও বিধি এসব প্রাণ-প্রতিবেশ সুরক্ষায় দায়বদ্ধ। লামা রাবার কোম্পানির কাছে এটি শুধু ৪০০ একরের এক টুকরো জায়গা, যেটি জবরদখল করে তারা মুনাফা করতে চায়। সেখানে বিরাজিত প্রাণ-প্রকৃতির জটিল বিজ্ঞান ও প্রতিবেশগত সম্পর্ক তাদের কাছে গুরুত্ব বহন করে না। সরই পাহাড়ের আদিবাসী নাগরিক এবং রাবার কোম্পানির ভেতর এই বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গিকে বোঝা জরুরি। রাষ্ট্র সরই পাহাড়ের আদিবাসী নাগরিকের পক্ষেই থাকবে। কারণ সংবিধানে রাষ্ট্র প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশ এবং মানুষের অধিকার সুরক্ষায় অঙ্গীকার করেছে। অঙ্গার হওয়া সরই পাহাড়ের গ্রাম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কাছে বারবার ন্যায়বিচার দাবি করেছে। আশা করি, রাষ্ট্র ন্যায়বিচারের সংস্কৃতি সরই পাহাড়েও প্রতিষ্ঠা করবে।

পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক
animistbangla@gmail.co

আরও পড়ুন

×