ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অধিকার

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও প্রশ্নহীন প্রণোদনার বীজ

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও প্রশ্নহীন প্রণোদনার বীজ
×

পাভেল পার্থ

প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ০৩:১৯

সমকালের খবর- কুষ্টিয়ার কুমারখালীর যদুবয়রা ইউনিয়নের খড়িলা বিলের কৃষক তারিকুল ইসলাম দুই বিঘা জমিতে পেঁয়াজ রোপণ করেছিলেন। কৃষি বিভাগ থেকে তাঁকে এক কেজি বীজ সহায়তা দেওয়া হয়। বীজতলা থেকে জমিতে রোপণের পর সব পেঁয়াজের চারা মারা গেছে। পটুয়াখালীর বাউফলের মদনপুরা ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া গ্রামের কৃষক সেলিম হাওলাদার কৃষি অফিস থেকে এক কেজি সরিষা বীজ বপন করেছিলেন, কিন্তু অর্ধেকের বেশি বীজ থেকে চারা গজায়নি। রবি মৌসুমে ফসল উৎপাদন বাড়াতে কৃষি মন্ত্রণালয় ৬৪ জেলার ১৬ লাখ ৭০ হাজার ৫০০ কৃষককে বিনামূল্যে বীজ সুবিধা দেয়। বীজ বাবদ ব্যয় হয়েছে ৮০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সরকারের এই প্রণোদনার বীজই এখন বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। (প্রণোদনার বীজে কৃষকের সর্বনাশ, সমকাল, ২৪ জানুয়ারি, ২০২৩)।
শুধু এ বছর বা একটি মৌসুম নয়; একটি এলাকা নয়; প্রণোদনার বীজে দেশের নানা অঞ্চলের কৃষক অনেক বছর ধরেই ক্ষতিগ্রস্ত। অনেকবার সংবাদমাধ্যমে এসব খবর প্রকাশিতও হয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি বদলায়নি।

আমরা জানি, দুর্যোগ, মন্দা বা কোনো সংকট কাটিয়ে ওঠা কিংবা ফসলের উৎপাদন বাড়াতে সরকার নানাভাবে কৃষি সহযোগিতা ও সম্প্রসারণ কর্মসূচি পালন করে। এর মধ্যে বীজ প্রণোদনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সরকারি প্রণোদনার বীজে দেশের কৃষি খাত আরও নিম্নগামী হচ্ছে। কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারি প্রণোদনার বীজ চাষ করে কৃষকের সময়, শ্রম, জমি, অর্থ নষ্ট হচ্ছে। আর এসব বীজের মান পরীক্ষা বা জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পাশে রাষ্ট্র দাঁড়াচ্ছে না। এ ঘটনা দেশের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যব্যবস্থায় এক প্রকার চাপও তৈরি করছে। কারণ উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত না হওয়ায় খাদ্যের পূর্বাভাস ও ফলনের পরিমাণে গরমিল হচ্ছে।

কৃষির অন্যতম কেন্দ্রীয় খাত হলো বীজ। খনার বচন বাদে বাংলাদেশে বীজের বিজ্ঞাপন কেমন ছিল? দীর্ঘ সময় বীজের বিজ্ঞাপন গ্রামীণ নারীর মাধ্যমেই প্রচারিত হতো। যেমন 'অমুক গৃহস্থবাড়ির লাউবীজ ভালো', 'তমুক পাড়ার ঝিঙ্গা ভালো', 'পাহাড়ি কুমড়া বেশি মিঠা', 'চরের মরিচ বেশি ঝাল', 'ময়মনসিংহের লাফা বেগুন নরম', 'সিলেটি লাই শাক', 'বালাম ধানে মুড়ি ভালো', 'মি. মিদ্দিমের চু ভালো', 'বিন্নি ধানের খৈ ভালো' ইত্যাদি। এই তালিকা দীর্ঘতর করা সম্ভব।

১৯৪১-৪২ সালে প্রকাশিত 'কৃষি-কথা' সাময়িকীর তৃতীয় বর্ষের প্রথম সংখ্যার (এপ্রিল-মে) শেষ পৃষ্ঠায় বড় ফন্টে একটি বীজের বিজ্ঞাপন আছে। তাতে বলা হয়েছে, '...আলগা ভিতের ওপর যেমন শক্ত ইমারত গড়া যায় না, তেমন খারাপ বীজে ভালো ফসল জন্মায় না। বেশি ফসল যদি পেতে চান কৃষি-বিভাগের প্রবর্তিত উন্নত বীজ বুনুন।'

বীজ তো জীবন্ত এক প্রাণসত্তা, যা কৃষিচর্চার মাধ্যমে বংশপরম্পরায় টিকে থাকে। এই বীজ তো কৃষকের ঘরে সুরক্ষিত থাকার কথা; বহুজাতিক কোম্পানির প্যাকেট আর ডিলারের দোকানে নয়। বীজের রূপ আর রূপের রূপান্তর তো কৃষিচর্চার ভেতর দিয়ে বিকশিত হওয়ার কথা। কোনো কোম্পানির গবেষণাগারে জোর করে এর জেনেটিক অদলবদল তো হওয়ার কথা না। কিন্তু তাই ঘটে চলেছে। দেশি বীজবৈচিত্র্যকে হটিয়ে চালু হলো আধুনিক কৃষির নামে 'উচ্চফলনশীল' (উফশী) বীজ। এর পর এলো হাইব্রিড; অনুমোদন দেওয়া হলো জেনেটিক ফসল ও বীজকে। তথাকথিত সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে দেশের বীজ খাত থেকে জনমালিকানা, বলা উচিত নারীর বীজ অধিকার কেড়ে নিয়ে করপোরেট বীজ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠিত হলো। আর এখন বীজ হারানো কৃষক শুধু কোম্পানি নয়; রাষ্ট্রের প্রণোদনার বীজেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
১৯৭৭ সালে বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় বীজ অধ্যাদেশ প্রণীত হয়। ১৯৮৯ সালে প্রথম জাতীয় বীজনীতির খসড়া তৈরি হয়। কৃষি মন্ত্রণালয় ১৯৯৩ সালের ২৫ জানুয়ারি বিজ্ঞপ্তি আকারে জাতীয় বীজনীতি ঘোষণা করে। পরে ধারাবাহিকভাবে বীজ (সংশোধন) আইন (১৯৯৭), জাতীয় বীজ বিধিমালা (১৯৯৮), জাতীয় খাদ্যনীতি (২০০৬), বায়োসেফটি গাইডলাইন (২০০৮), উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ আইন (২০১১), বায়োসেফটি রুলস (২০১২), জাতীয় জৈব কৃষিনীতি (২০১৭), বীজ আইন (২০১৮), জাতীয় বীজনীতি (২০১৮), উদ্ভিদের জাত সংরক্ষণ আইন (২০১৯), উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ বিধিমালা (২০১৯)- বীজ সম্পর্কিত এসব নীতি, বিধি ও আইন প্রণীত হয়।

এসব বিধি মূলত বীজকে দেখেছে 'পণ্য' হিসেবে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ও রাজনীতির ধারাবাহিক পরিবর্তনই এসব বিধিকে বারবার প্রভাবিত করেছে এবং পরিবর্তন ঘটিয়েছে। তাই কোনো বীজ কোম্পানির প্যাকেট, না সরকারি প্রণোদনা প্যাকেজে থাকছে, সেটি নিয়ে আমরা ভাবছি না। কিন্তু কৃষকের কাছে বীজের এক ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক, পরিবেশ ও সামাজিক মানে ও রূপকল্প আছে। বীজ বুনে যদি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন, তবে সে আঘাত কৃষকের মাটি ও মন- সবখানেই দারুণ ক্ষতের দাগ রেখে যায়। রাষ্ট্রকে কৃষকের এই ক্ষত সারাতে হবে; দাগের দিকে তাকাতে হবে।
২০১০ সালে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর কৃষকরা সিনজেন্টার হাইব্রিড সবল টমেটো বীজ চাষ করে প্রতারিত হন এবং দীর্ঘ আন্দোলন গড়ে তোলেন। সিনজেন্টার বিরুদ্ধে মামলা হয়। সিনজেন্টা বাজার থেকে সবল টমেটো বীজ তুলে নিতে বাধ্য হয়। এরপরও কৃষকের সঙ্গে কোম্পানির বীজ নিয়ে প্রতারণা বন্ধ হয়নি। হাইব্রিড ঝলক ধান কিংবা মনসান্টোর হাইব্রিড ভুট্টা বীজ বুনেও কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। একটি বীজ প্রতারণারও বিচার হয়নি।

প্রতিদিন কৃষিজমি কমছে; বাড়ছে জলবায়ু সংকট। নানা আঘাত ও সংকট সামলে গ্রামীণ কৃষি পরিবারগুলো এখনও কৃষি নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। দীর্ঘ করোনা মহামারিতে দেশ-দুনিয়া লকডাউনে গেলেও কৃষক সমাজ ছিল নির্ঘুম। তারা আমাদের সামনে হাজির করেছে খাবারভর্তি থালা। কৃষকের সম্মান ও মর্যাদা এখনও আমরা নিশ্চিত করিনি। কিন্তু বারবার বীজ নিয়ে কৃষকের সঙ্গে নানামুখী অনাচার, প্রতারণা ও ক্ষতি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
যে বীজ আমাদের ভবিষ্যতের বেঁচে থাকার শর্ত পূরণ করে, সেই বীজ ব্যবস্থাপনাকে রাষ্ট্র সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দেখবে এবং শক্তিশালী পাবলিক কাঠামো গড়ে তুলবে- এটি দীর্ঘদিনের দাবি। আশা করি, রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার বীজ কৃষকের হাতে দেওয়ার আগে এর যাবতীয় নিরীক্ষা ও যাচাই সম্পন্ন করা হবে। এই কর্মসূচিকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পাশে যাবতীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ নিয়ে দাঁড়াবে রাষ্ট্র।

পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক
animsitbangla@gmail.com

আরও পড়ুন

×