ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাজার

উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে সবজিই যেখানে ভরসা

উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে সবজিই যেখানে ভরসা
×

হাসান মামুন

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ২২:৩০

চাল, আটা, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপণ্যের দাম নতুন করে বাড়ার পর 'নিম্নআয়ের মানুষের আমিষ' বলে পরিচিত ব্রয়লার ও ডিমের দাম এক মাসের ব্যবধানে যেভাবে বেড়েছে, তা নজিরবিহীন। চাষের তেলাপিয়া, পাঙাশ আর কৈ মাছের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। স্থিতিশীল আছে কেবল সবজির দাম। বাজারে নানা ধরনের সবজি। সরবরাহে কোনো ঘাটতি আছে বলে মনে হয় না। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সবজি খাওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে। উচ্চ আয়ের মানুষ অবশ্য স্বাস্থ্যগত কারণে আর নিম্ন আয়ের মানুষ অপেক্ষাকৃত সহজলভ্য বলে বাড়িয়ে দিয়েছে সবজি খাওয়া। গত ১০-১২ বছরে সবজির উৎপাদন কয়েক গুণ হয়েছে বলে সরকারিভাবে দাবি করা হচ্ছে। হাইব্রিড বীজ থেকে উৎপাদিত চারায় এর উৎপাদন দ্রুত বাড়ছে, সন্দেহ নেই। আজকাল সবজি ফলাতে সময়ও লাগছে কম। ফলনও বাড়ানো যাচ্ছে।

এবার শীতের শুরুতে সবজির দাম চড়া থাকলেও ধীরে ধীরে কমে এসে একটা জায়গায় স্থিত হয়েছে। রাজধানীসহ শহরাঞ্চলে বেশ কিছু লোক সবজি ব্যবসায় যুক্ত। তারা পাইকারি বাজার থেকে কিনে ছোট ছোট দোকান ও রিকশাভ্যানে সবজি বিক্রি করে থাকে। রাত ১০-১১টা পর্যন্ত তাদের সবজি বিক্রি হতে দেখা যায়। রাত যত বাড়ে, তাদের সবজির দাম তত কমতে থাকে। রাজধানীর সব বাজারে আবার দামদর এক রকম নয়। অপেক্ষাকৃত কমে পণ্যসামগ্রী পাওয়া যায়, এমন কিছু বাজার আছে। তাদের ব্যবসার খরচ কম বলে অপেক্ষাকৃত কমে বেচতে পারে। মূল্যস্ম্ফীতির চাপে পড়া নিম্ন আয়ের মানুষ এসব বিক্রেতা ও বাজার চেনে। তারা এদের শরণাপন্ন হয়। এসব বলে বোঝাতে চাইছি, গরিব মানুষ এ সময়ে অগত্যা সবজি পরিভোগের দিকে ঝুঁকে পড়েছে।

সবজি ছাড়া বলতে গেলে আর কিছুই অপেক্ষাকৃত কমে পাওয়ার সুযোগ নেই। চাল ও আটা না কিনলে তো তাদের চলে না। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় কমিয়ে কিংবা একেবারে কাটছাঁট করে হলেও চাল, আটা; সেই সঙ্গে ডাল তাদের কিনতেই হবে। ভোজ্যতেলও কিনতে হবে বৈকি। সবজি রান্না করে খেতে তেল লাগবে। সেই ভোজ্যতেলের দাম তো অনেক বেড়ে গেছে এর মধ্যে। এ জন্য দায়ী করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারকে। দেশে ডলারের দামও অনেক বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচ বেড়েছে। বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। চিনির দামও অনেক বেড়েছে এবং রমজান মাস আসতে আসতে দাম আরও বাড়বে মনে হয়। তাতে রোজাদারদের জিলাপি খাওয়ার ব্যয় বাড়বে। ইতোমধ্যে রাজধানীর মোড়ে মোড়ে বানানো জিলাপির দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। ময়দার দামের ঊর্ধ্বগতিও এ জন্য দায়ী। তবে জিলাপি না খেলেও গরিবের চলবে। কিন্তু চালের দাম আরও বেড়ে গেলে কী হবে তাদের?


আমন উত্তোলন মৌসুমে এর দাম সাধারণত কমতে বা অন্তত স্থিতিশীল থাকতে দেখা যায়। এবার ঘটেছে উল্টো। চালের দাম বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এমনকি যখন সরকারও আমদানি করছে। মাঝে খবর বেরিয়েছিল, আটার দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষ চালের দিকে ঝুঁকছে। তাতে চালের চাহিদা বেড়েছে নিশ্চয়। এবার দেশে আলুর উৎপাদন হয়েছে ভালো। দামও কম। চালের ওপর 'চাপ কমাতে' আমাদের শাসকরা বরাবর আলু পরিভোগ বাড়াতে বলেন। এবার তেমন পরামর্শ শোনা না গেলেও চালের বদলে আলু পরিভোগ নিশ্চিতভাবে বাড়বে অসহায় জনগোষ্ঠীতে। একে তো আমিষ থেকে বঞ্চিত, তার ওপর চালের বদলে আলুতে ঝুঁকলে চালের পুষ্টি থেকেও বঞ্চিত হবে তারা।

কথা হচ্ছিল বাধ্য হয়ে সবজির পরিভোগ বাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে। এতে পেট ভরানো গেলেও গরিবের দেহে প্রয়োজনীয় পুষ্টি বিশেষত আমিষের জোগান আসবে কীভাবে, সে এক প্রশ্ন। এ সময়ে ডালের দাম যদি কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যেত, তাহলেও হতো। সঙ্গে ব্রয়লার ও ডিমের দাম। আমাদের সাফল্য হলো, দীর্ঘদিন ব্রয়লার ও ডিমের দাম একটা সহনীয় অবস্থায় রাখা গিয়েছিল। অতি উৎপাদনের কারণেও এমনটি ঘটে বলে মনে করা হয়। তাতে আবার খামারিরা লাভজনকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে; বিশেষত ছোট খামারিরা। এ অবস্থায় অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম না বেড়ে ব্রয়লার ও ডিমের দাম কিছুটা বাড়লে সেটা হতো আদর্শ পরিস্থিতি। নিম্ন আয়ের মানুষও এতে তেমন আপত্তি করত বলে মনে হয় না। কিন্তু বাজার তো আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী চলবে না। এর নিজস্ব নিয়মবিধি রয়েছে। সবজির দাম যে স্থিতিশীল বা অপেক্ষাকৃত কম, তারও কারণ হলো এর উৎপাদনে কৃষকের ধারাবাহিক সাফল্য। সবজি উৎপাদনের দুনিয়ায় তিন নম্বরে নাকি আমাদের অবস্থান। বাংলাদেশের আগ দিয়ে রয়েছে ভারত ও চীন। বিশাল এ দুটি দেশের সঙ্গে তুলনা করলে সবজিতে আমাদের কৃষকের সাফল্যকে অতুলনীয় বলতে হয়। মূল্যস্ম্ফীতির এ সময়টায় তারা আগ্রহী সবার জন্য প্রয়োজনীয় সবজি সরবরাহ করে যাচ্ছে কোনো হাঁকডাক ছাড়াই। যশোরের মতো কোনো কোনো বেল্ট নাকি দেশের চাহিদার ৫০ শতাংশেরও বেশি ফলিয়ে থাকে। রাজধানীর আশপাশেও প্রচুর সবজি ফলানো হয়। শুধু যশোরের ওপর রাজধানীবাসীকে নির্ভর করতে হয় না তাই। আজকাল তো ছাদবাগানেও ফুলের সঙ্গে ফল ও সবজি করে থাকে অনেকে। নিজেরা পরিভোগ করে বাজারেও সেসব বিক্রি করে কেউ কেউ।

আমাদের চাষিরা সবজিসহ সর্বক্ষেত্রে আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি গ্রহণে কখনও পিছিয়ে থাকেনি। এরই মধ্যে তাদের উৎপাদন খরচ বেড়েছে জ্বালানি তেল, বিশেষত ডিজেল ও সারের দাম বাড়ানোয়। এ ছাড়া অর্থ সংকটে থাকা সরকারের নাকি কিছু করার ছিল না। সবজির চারা যারা উৎপাদন করে, তারাও নাকি বেশি দাম নিয়েছে বীজ ও সারের দাম বেড়ে যাওয়ায়। এ কারণে আবার মনে হচ্ছে, চাষিদের আরও বেশি দাম পাওয়া উচিত ছিল। মাঠে তারা তো রাজধানীর বিক্রেতাদের চেয়ে অনেক কম দাম পেয়ে থাকে। এরই মধ্যে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি একটি দৈনিকে খবর বেরিয়েছে, কার্গো ভাড়া বৃদ্ধিসহ নানা কারণে সবজি রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এটা সংশ্নিষ্ট রপ্তানিকারকদের জন্য খারাপ খবর বৈকি। তবে সবজি যাদের বেশি করে খেতে হচ্ছে, তাদের জন্য কিছুটা সুখবর। বাজার এমনই আচরণ করে থাকে এর বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে। পরিকল্পনাও সেখানে মার খায়। তারপরও সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। যাদের ঘরে নামমাত্র দামে চাল পৌঁছাবে বলে আশ্বস্ত করছে সরকার, তাদের জন্য যেন মানসম্মত চালের ব্যবস্থা হয়। অপমানিত যেন না হতে হয় এ দুর্দশাগ্রস্তদের। টিসিবি কার্যক্রমও নাকি বাড়ানো হবে। এর লাইনে মধ্যবিত্ত থেকে ঝরে পড়া যেসব পরিবারের লোক গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, তাদের যেন খালি হাতে ফিরতে না হয়। এদের অনেকে দুশ্চিন্তায় আছে তলে তলে ওষুধের দাম বেড়ে যাচ্ছে দেখে। ব্রয়লারের বদলে এর গিলা-কলিজায় আমিষের প্রয়োজন মেটাতে চাইছে তারা। কিন্তু ওষুধের বিকল্প কী? সুতরাং এর কাঁচামাল আমদানি ও উৎপাদন যেন কোনোভাবে ব্যাহত না হয়, সেদিকেও নজর থাকুক সরকারের।

হাসান মামুন: সাংবাদিক, বিশ্নেষক

আরও পড়ুন

×