দ্রব্যমূল্য
চিনির বাজার: ভোক্তাস্বার্থ কে দেখবে?
হাসান মামুন
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৩ | ২০:৪৩
চিনির দাম অব্যাহতভাবে বাড়ছে। সরকার নির্ধারিত দামেও পণ্যটি মিলছে না খুচরা বাজারে। রমজানের আগে থেকেই প্যাকেটজাত চিনির বড় ঘাটতি। খোলা চিনিও কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। একাধিকবার এমনটি ঘটতে দেখে ভোক্তারা বোধ হয় আর জানতে আগ্রহী নয়– চিনির দাম কত নির্ধারণ করা হলো। মাঝে এর দাম কমানোও হয়েছিল। সেটা এ যুক্তিতে যে, সরকার শুল্ক ছাড় দিয়েছে। এসব ছাড়ের সুফল এ দেশে ভোক্তারা কতটা পেয়ে থাকে– সে প্রশ্নও আছে।
শুল্ক ছাড় প্রত্যাহারের পর চিনির বাজার হয়ে পড়েছে আরও অশান্ত। বাণিজ্যমন্ত্রী এ জন্য ‘অসাধু ব্যবসায়ীদের’ ওপর দায় চাপিয়েছেন। খুচরা ব্যবসায়ীরা দলবদ্ধ হয়ে দাম বেশি নিচ্ছেন বা বাজারে সংকট সৃষ্টি করেছেন– এমনটা মনে হয় না। সুনির্দিষ্টভাবে না বললেও মন্ত্রী সম্ভবত বড় ব্যবসায়ীদেরই বুঝিয়েছেন, যাঁরা অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে পরিশোধনের পর বাজারে ছাড়েন। সংখ্যায় তাঁরা বেশি নন। চিনি আমদানি করতে হয় বিপুল পরিমাণে। এটা তাই ছোট বা মাঝারি ব্যবসায়ীদেরও কাজ নয়। এ জন্য মনে করা হয়ে থাকে, এসব পরিশোধনকারীই চিনির বাজারের নিয়ন্ত্রক। সংকটের আরেকটা জায়গা হলো, চাহিদার প্রায় পুরোটা চিনিই আমরা আমদানি করি। রাষ্ট্রায়ত্ত যে কয়টি চিনিকলে এখনও কিছু উৎপাদন হয়ে থাকে, সেগুলোর সক্ষমতা খুব সামান্য। সার্বিক অদক্ষতায় এগুলোর উৎপাদন ব্যয়ও বেশি। মোদ্দাকথা, এর কোনো প্রভাব নেই চিনির মোট সরবরাহ ও দামে।
দেশে চিনির চাহিদা অব্যাহতভাবে বাড়ছে শুধু ব্যক্তিগত ভোগের কারণে নয়; বিভিন্ন ক্ষেত্রে উপকরণ হিসেবে এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে বলে। বেকারি, কোল্ড ড্রিংকস ও আইসক্রিম শিল্পে চিনির বিরাট চাহিদা রয়েছে। এসব খাতে উৎপাদনও বাড়ছে বিপুলভাবে। চিনির দাম বাড়লে ওইসব পণ্যের দামও বেড়ে যায়। স্বাস্থ্যগত দিক থেকে দেখলে, প্রধানত আখ থেকে আহরিত আলগা চিনির ব্যবহার না বাড়াই সাধারণভাবে ভালো। বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য এটা আবার শক্তির সহজ উৎস। চিনির দাম বাড়লে এ উৎসে জনসাধারণের প্রবেশাধিকারও সংকুচিত হয়ে পড়ে। ঘরে শিশুখাদ্য তৈরিতে চিনি তো অপরিহার্য উপকরণ। এসব দিক থেকে এর দাম সহনীয় রাখাটা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনাও বটে। চিনির দাম লাফিয়ে বাড়তে থাকলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন তাই ওটা বেঁধে দিতে উদ্যোগী হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, গত ক’মাসে চিনির দাম অব্যাহতভাবে বাড়ার সময়ে সংস্থাটির পদক্ষেপ কাজে আসেনি। কেজিপ্রতি ৭৫-৮০ টাকা থেকে চিনির দাম বাড়তে বাড়তে ১৩৫-১৪০ টাকায় পৌঁছেছে এরই মধ্যে। নিবন্ধটি ছাপা হতে হতে দাম আরও বেড়ে গেলে অবাক হওয়া যাবে না।
আন্তর্জাতিক বাজারে কিছু জরুরি পণ্যের দাম কমে আসার খবর থাকলেও অপরিশোধিত চিনির মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা রয়েছে– এ দাবি সত্য। আমরা তো পরিশোধিত চিনি তেমন আমদানি করি না। চিনি পরিশোধন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার যে কথা সংশ্লিষ্টরা বলে থাকেন, তারও কিছু সত্যতা রয়েছে। নানান শুল্ক পরিশোধসহ আমদানিতে একটা বড় ব্যয় যুক্ত হয়। ডলারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এ সময়টায় এবং সে জন্যও সামগ্রিকভাবে ব্যয় বেড়েছে আমদানিতে। আমদানি ও পণ্য খালাস প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার খবরও রয়েছে। কথা হলো, এসব বিবেচনা করেই তো ট্যারিফ কমিশন বাজারে চিনির দাম নির্ধারণ করে দিচ্ছে। কিন্তু সেটা কার্যকর হচ্ছে না কেন? পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন, তাঁরা মিলগেট থেকেও নির্ধারিত দামে চিনি নিতে পারছেন না। আর খুচরা বিক্রেতারা বলেন, বেশি দামে আনলে বেশি দামেই তো বেচতে হবে। এ অবস্থায় চিনি পরিভোগ কমানো ছাড়া নিম্নআয়ের লোকদের উপায় কী? এটা খুব কমানোর সুযোগও বাস্তবে নেই। তাই অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকা দামেই তাদের চিনি কিনতে হচ্ছে কম জরুরি ব্যয় কমিয়ে। টিসিবির মাধ্যমে অবশ্য কম দামে চিনি বিতরণ করা হচ্ছে। কিন্তু সে কার্যক্রম প্রয়োজনের তুলনায় সামান্যই। সবার পক্ষে এ সুযোগ গ্রহণের অবস্থাও নেই।
১৮ মে’র সংবাদপত্রে খবর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান থেকে টিসিবির জন্য পরিশোধিত চিনি আমদানির ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদনের। সাড়ে ১২ হাজার টন চিনি আনা হবে এবং সে ক্ষেত্রে দাম নাকি পড়বে কেজিপ্রতি প্রায় ৮৩ টাকা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আনা হলেও এ চিনির উৎস দেশ ব্রাজিল বলে জানা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে হামেশাই এমনটা হয়ে থাকে। দেখার বিষয়, যথাসম্ভব কম দামে আমদানি হচ্ছে কিনা। কেনাকাটায় বেসরকারি খাত তো আরও দক্ষ হয়ে থাকে। জাহাজ ভাড়াসহ পরিবহন ব্যয় কমাতে এবং দ্রুত হাতে পেতে অনেক সময় নিকটবর্তী দেশ থেকে পণ্য আনা হয়। চিনি আমদানিতে ভারত একটি ভালো বিকল্প আমাদের। দেশটি অন্যতম প্রধান রপ্তানিকারকও বটে। ভারতে চিনি উৎপাদন পরিস্থিতি, দাম ও তার রপ্তানিপ্রবণতা কেমন– এগুলো এ ক্ষেত্রে বড় বিবেচ্য। প্রধান প্রধান চিনি উৎপাদনকারী দেশে সম্ভাব্য উৎপাদনও এর দামে প্রভাব ফেলে। আর উৎপাদনে প্রভাব ফেলে আবহাওয়া পরিস্থিতি। হালে আখের মতো পণ্য আবার চলে যাচ্ছে বায়োফুয়েল উৎপাদনে। প্রচলিত জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়লে এর বিকল্প হিসেবে বায়োফুয়েল উৎপাদন বাড়বে এবং তখন চিনির উৎপাদন কমে বাড়বে দাম। নতুন এ প্রবণতার দিকেও তাই দৃষ্টি রাখতে হবে।
এখন আমরা কি আখের উৎপাদন বাড়াব? উৎকৃষ্ট মানের আখ ফলাব, যাতে বেশি চিনি আহরণ করা যায়? বন্ধ চিনিকলকে উৎপাদনে ফেরাব, নাকি সেগুলোকে হস্তান্তর করব বেসরকারি খাতে? এসব নীতিগত প্রশ্ন রয়েছে। তবে এ মুহূর্তে জরুরি হলো চিনির বাজার শান্ত করে আনা। এটা আরও জরুরি, যখন ভোজ্যতেলসহ নিত্যপণ্যের দাম একযোগে বাড়ছে। এমনকি উত্তোলন মৌসুমে চালের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে প্রচেষ্টা নিতে হচ্ছে সরকারকে। কোল্ড ড্রিংকস, আইসক্রিম না খেলেও চলে। কিন্তু রুটি-বিস্কুট খেতেই হয় সর্বস্তরের মানুষকে। চায়ের দোকানেও চিনির চাহিদা আছে এবং এর সঙ্গে জড়িত অনেকে। চিনির দাম বাড়লে এসবের দামও বেড়ে যায়। সে ক্ষেত্রে আবার দেখা যায়, তুলনায় বেশি হারে বাড়ছে দাম। দাম নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় বড় গলদ রয়েছে আমাদের বাজারে; আর এটা আছে উৎপাদন ও বিপণনের প্রায় সব পর্যায়ে। সম্প্রতি ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণে ট্যারিফ কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বলা হচ্ছে, ভোক্তাপক্ষের বক্তব্য তারা শোনেনি।
যাহোক, চিনির বাজারে অল্প কয়েকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ তথা সিন্ডিকেশনের অভিযোগ আছে। এটা থেকে থাকলে এক টিসিবির পক্ষে তা ভাঙার কোনো সুযোগ নেই। আখ ও চিনি উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর দাবি করেও ফায়দা হবে না। চিনি পরিভোগ কমিয়ে সরবরাহের সঙ্গে একটা ভারসাম্যে আসার সুযোগও প্রায় অনুপস্থিত। এ অবস্থায় চিনির বাজারে স্বচ্ছতা আনতে হবে। কর-শুল্ক যথাসম্ভব কমিয়ে তার সুফল করতে হবে নিশ্চিত। গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়িয়ে সরকার কি পারবে চিনি পরিশোধন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে? মিলগেটে চিনি বুঝে পেতে বিলম্বের কারণেও দাম বাড়ে। দেশে পরিবহন ব্যয় কিছুটা কমানো যেত ডিজেলের দাম কমানো গেলে। আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম কিন্তু নিম্নমুখী এখন।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, বিশ্লেষক
- বিষয় :
- দ্রব্যমূল্য
- হাসান মামুন
- চিনির দাম
- চিনির ঘাটতি