ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আ ন্ত র্জা তি ক

জাতিসংঘ বাহিনীর মালি ত্যাগের পরিণতি যা হতে পারে

জাতিসংঘ বাহিনীর মালি ত্যাগের পরিণতি যা হতে পারে
×

মালিতে শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি সৈন্যদের চিকিৎসাসেবা সংগৃহীত

পল মেলি

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০

মালিতে শান্তিরক্ষী বাহিনীর ভবিষ্যৎ নিয়ে শুক্রবারের জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভোটের ফল অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। এ শান্তিরক্ষা মিশন বন্ধ করার বাইরে তাদের কাছে কোনো বিকল্প ছিল না। এ মিশনটিই ছিল বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী মিশন। ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান এ মিশনে প্রায় ১৮৭ শান্তিরক্ষী প্রাণ হারিয়েছেন।
তবে, এ হতাহতের সংখ্যার সঙ্গে মিশনটি বন্ধের কোনো সম্পর্ক নেই। মূলত দেশটির সামরিক শাসকের চাপের কারণেই ১২০০০ আন্তর্জাতিক সৈন্যকে সেখান থেকে তুলে নিতে হচ্ছে। মালি একটা চরম নিরাপত্তা সংকটে থাকা সত্ত্বেও তার সরকার এ চাপ দিচ্ছে।

ধারণা করা হচ্ছে, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা চলে গেলে মালি রাশিয়ার ভাড়াটে ওয়াগনার গ্রুপের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হবে; দেশটিতে বর্তমানে ওয়াগনার গ্রুপের ১০০০ যোদ্ধা রয়েছে বলে মনে করা হয়।
মালি একটি বিশাল দেশ– গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পশ্চিম আফ্রিকা থেকে সাহারা মরুভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত; এর উত্তর ও মধ্য অঞ্চলজুড়ে বিভিন্ন জিহাদি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় আছে। ভয়ংকর বাহিনী হিসেবে ওয়াগনারের খ্যাতি সত্ত্বেও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে; এমনকি ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অতিরিক্ত যোদ্ধা এনে এর শক্তি বাড়ানো হলেও প্রশ্নটি অযৌক্তিক হবে না। বরং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ভাড়াটে দলটির নেতা ইয়েভজেনি প্রিগোজিনের মধ্যে সাম্প্রতিক সম্পর্কের পতনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্নটি আরও জোরদার হতে পারে।

এটি ঠিক, রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের জন্য মালিতে ওয়াগনারের উপস্থিতি ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রকে খোঁচাতে এবং পশ্চিম আফ্রিকায় রাশিয়ার অবস্থানকে শক্তিশালী করার একটি কার্যকর উপায়। আবার এটিও ঠিক, ওয়াগনার মার্কিন স্যাটেলাইট ইন্টেলিজেন্স সমর্থিত বিমান হামলার শক্তি, সাঁজোয়া ইউনিট এবং লজিস্টিক সহায়তা পাবে না, যা ফরাসি বাহিনী বারখানে থাকার সময় পেত। গত বছর মালি ও তার সাবেক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের মধ্যে বিশ্বাস ভেঙে যাওয়ার পর ফরাসি বাহিনী এলাকাটি ছেড়ে যায়। গত ১১ মাস ধরে সেখানে ওয়াগনার গ্রুপ কাজ করছে, কিন্তু জিহাদি গোষ্ঠীগুলো এ সময়ে তাদের কার্যক্রম তীব্র করেছে।

এখন জাতিসংঘও চলে গেলে জঙ্গি তৎপরতা আরও বাড়বে, যখন ওয়াগনার গ্রুপের কঠোর পন্থা আবাদি তুয়ারেগ এবং পশুপালক পিউল (ফুলানি নামেও পরিচিত) সম্প্রদায়কে পরস্পর থেকে আরও বিচ্ছিন্ন করতে পারে। এ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা ইতোমধ্যে মধ্য মালির কিছু অংশে সহিংসতায় রূপ নিয়েছে– নাইজার নদীর এ উর্বর বদ্বীপ পশ্চিম আফ্রিকার চালের ঝুড়ি বলে পরিচিত।

মালির সামরিক শাসক কর্নেল আসিমি গোইতা ২০২০ সালের আগস্টে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। তাঁর দাবি, জাতিসংঘের বাহিনী, যা মিনুসমা নামে পরিচিত, জাতীয় সেনাবাহিনীর সমর্থনে আরও বেশি আক্রমণাত্মক সন্ত্রাসবিরোধী ভূমিকা নিক। কিন্তু জাতিসংঘের সৈন্যদের একটি নীতিমালার অধীনে কাজ করতে হয়– যার মধ্যে আছে জঙ্গি হামলা থেকে বেসামরিক নাগরিকদের রক্ষা, মৌলিক জনসেবা ও মানবিক ত্রাণ সহায়তা এবং ২০১৫ সালের চুক্তির মান্যতা দেওয়া। সেই চুক্তির অধীনে, উত্তরের জাতিগত তুয়ারেগ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা স্থানীয় স্তরে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের বিনিময়ে একটি ঐক্যবদ্ধ মালির মধ্যে থাকতে সম্মত হয়েছিল। তুয়ারেগরা সাহারায় একটি স্বাধীন আবাসভূমি ‘আজওয়াদ’ প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছে।
কর্নেল গোইতা এ কারণেও বিরক্ত যে, কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করার নামে ওই ২০১৫ সালের শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে তাঁর আগ্রহের ঘাটতির সমর্থনে জাতিসংঘের সৈন্যরা দাঁড়ায়নি। অধিকন্তু, শুধু জাতিসংঘ নয়, বেশ কয়েকটি পশ্চিমা সরকার এবং অনেক আঞ্চলিক প্রতিবেশীর সঙ্গেও মালি সরকারের সম্পর্ক গত দুই বছর ধরে অবিশ্বাস ও অসন্তোষের কারণে তিক্ত হয়েছে।

গত জুলাইয়ে, জাতিসংঘ বাহিনীর মালি ত্যাগের সময়সীমা নিয়ে আঞ্চলিক সংস্থা ইকোওয়াসের সঙ্গে অব্যাহত বিরোধের মধ্যেই, মালি সরকার আইভরি কোস্ট থেকে আসা ৪৯ জন সৈন্যকে গ্রেপ্তার করে; যারা একটি দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থার অধীনে জাতিসংঘের প্রাঙ্গণ পাহারা দিতে এসেছিল। তিনজন ছাড়া বাকি সবাই জানুয়ারি পর্যন্ত আটকে ছিল, যখন দীর্ঘ আলোচনার পর তারা মুক্তি পায়।
জাতিসংঘ বাহিনীর জন্য সেখানে কার্যক্রম চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠলে, আইভরি কোস্ট, জার্মানি, যুক্তরাজ্য এবং সুইডেন তাদের সৈন্য দল প্রত্যাহারের পরিকল্পনা ঘোষণা করে।

কিন্তু সম্পর্কের চূড়ান্ত ভাঙনটি ঘটে এই মে মাসে, যখন ২০২২ সালের মার্চ মাসে মধ্য মালির মৌরা গ্রামে সংঘটিত বেসামরিক নাগরিক হত্যার বিষয়ে জাতিসংঘ তাদের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। জান্তার বাধা উপেক্ষা করে জাতিসংঘ বাহিনী ওই হামলার শিকার সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়, বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেয় এবং ২২৮ ভুক্তভোগীর পরিচয়ের প্রমাণ পেতে সক্ষম হয়। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয় : মৌরাতে সেনাবাহিনী এবং সহযোগী ‘বিদেশি’ যোদ্ধাদের দ্বারা ৫০০ জনেরও বেশি লোক নিহত হয়– ইঙ্গিতটা স্পষ্টত  ওয়াগনারের প্রতি।
তদন্ত দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগীয় তদন্তের হুমকি দিয়ে সরকার ক্ষোভ প্রকাশ করে। এতে তাদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি, ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি তৈরির অভিযোগ আনা হয়। ফলে, জাতিসংঘের বাহিনী দ্রুত মালি ত্যাগের দাবি মোটেই অবাক হওয়ার মতো কিছু হতে পারে না।
জাতিসংঘ বাহিনীতে যারা কাজ করছে তাদের অধিকাংশই আফ্রিকান; তারপরও মিনুসমা বিরোধী মতামত কয়েক মাস ধরে সংগঠিত হচ্ছিল।

কর্নেল গোইটা সম্প্রতি একটি নতুন সংবিধানের জন্য গণভোটে সমর্থন পেয়েছে, যা প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে এবং সামরিক নেতাদের পরের বছরের জন্য পরিকল্পিত নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুমতি দেয়। জাতিসংঘের এখতিয়ারের বাইরে থাকায়, তার এজেন্ডা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তার আরও সুবিধা হবে এখন।
যাই হোক, সাধারণ মালিয়ানরা, বিশেষ করে ভঙ্গুর কেন্দ্র এবং উত্তরে, জাতিসংঘের বাহিনীর অভাব বোধ করতে পারে। যদিও এটি জিহাদি আক্রমণ থামাতে পুরো সফল হয়নি, জাতিসংঘ বাহিনী অন্তত একটি পর্যায় পর্যন্ত জিহাদিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে; প্রধান শহরগুলোতে ন্যূনতম শান্তি এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছে, যাতে মৌলিক পরিষেবা, প্রশাসন এবং কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা সম্ভব হয়। এর উপস্থিতি অন্ততপক্ষে উত্তরের দলগুলোর সঙ্গে চুক্তিকে বাঁচিয়ে রেখেছে, যারা সামরিক সরকারের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীদের চলে যাওয়ায়, উত্তরের কিছু অংশ– যেখানে সেনাবাহিনী এবং ওয়াগনার নিজেদের অবস্থান তৈরির জন্য সংগ্রাম করছে– আসলে বাস্তবিক স্বায়ত্তশাসনের দিকে আরও এগিয়ে যেতে পারে। ফলে বামাকোর উত্তপ্ত নাগরিক রাজনীতি থেকে অনেক দূরে অবস্থানকারী অনেক সম্প্রদায়ের জন্য দৈনন্দিন জীবন সম্ভবত আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

পল মেলি: লন্ডনের চ্যাথাম হাউসে আফ্রিকা প্রোগ্রামের একজন পরামর্শক; বিবিসি থেকে ভাষান্তরিত করেছেন সাইফুর রহমান তপন।

আরও পড়ুন

×