উচ্চারণের বিপরীতে
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং শুভঙ্করের ফাঁকি
মাহবুব আজীজ
মাহবুব আজীজ
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪৭ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
রোববার এক প্রজ্ঞাপনে প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোয় দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ যুক্তি দিচ্ছে– আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্বিগুণের বেশি হলেও জনস্বার্থে দেশে এতদিন দাম বাড়ানো হয়নি। এ ছাড়া দেশে দাম কম থাকায় প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাচার রোধ, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান কমাতে দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
সরকার অবিরাম লোকসান দিয়ে চলতে পারে না– এটি সত্য। তবে লোকসান মোকাবিলার যাবতীয় দায় জনসাধারণের রুগ্ণ কাঁধে ক্রমাগত চাপিয়ে দেওয়াও যুক্তিসংগত কিনা, সে আলোচনা জরুরি। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদরে শুধু ডিজেলেই বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে। দাম বাড়ানোয় লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব। এর বিপরীত যুক্তি হলো, সরকার ভ্যাট-ট্যাক্স কিছু কমিয়ে দিলেই তেলের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হতো না। ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনমতে, ডিজেল আমদানির সময় সরকার ভ্যাট-ট্যাক্স নেয় ৩১.৮৫ শতাংশ (১২ মার্চ ২০২৬)। সরকার এর কিছু অংশ কমিয়ে দিলেই বিপিসির লোকসান কমে আসত; মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়ত না।
তারপরও সরকার দাম বাড়ানোর পথেই কেন গেল? যাতে রাজস্ব আয় না কমে। প্রশ্ন আসেই– সরকার রাজস্ব আয় বাড়িয়ে কোন খাতে বাড়তি খরচ করতে চাইছে? শনিবার সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। কোনো কোনো গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন বেড়েছে ১৪২ শতাংশ। বৃহস্পতিবার একনেকের সভায় দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি একটি নতুন প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। দুই প্রকল্পে ব্যয় বেড়েছে এক লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা; বৃদ্ধির হার ১১৮ শতাংশ (প্রথম আলো, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।
২.
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ‘মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে আয় যৌক্তিক’ (প্রজ্ঞাপনের ভাষায়) করার সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই সঠিক। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, দেশে সরকারি চাকরিতে বর্তমানে ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন (বাসস, ৭ জুলাই ২০২৬)। অন্যদিকে দেশের আনুষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক মোট শ্রমিকের সংখ্যা কয়েক কোটি। এই বিপুল মানুষের দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবনের প্রতি সরকারের অবশ্যই মনোযোগ দিতে হবে।
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোয় সবচেয়ে নিচের গ্রেডে প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা। এমনও শিল্প খাত আছে, যেখানে শ্রমিকের বেতন পাঁচ-ছয় হাজার টাকা। শ্রম আইন অনুযায়ী, অন্তত ২০টি শিল্প খাতের শ্রমিকরা পুরোনো মজুরি কাঠামোতে বেতন পেয়ে আসছেন। এর মধ্যে ছয়-সাত বছর আগে নির্ধারিত বেতন স্কেলে অনেকে এখনও বেতন পান। মাঝের বছরগুলোর মূল্যস্ফীতি ও ইনক্রিমেন্টের পার্থক্য হিসেবে নিলে এসব খাতে বেতন আসলে কমে গেছে! অনেক প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর ইনক্রিমেন্টের দেখা পান না শ্রমিকরা। শ্রম আইন অনুযায়ী, তিন বছর পরপর বেতন বা মজুরি কাঠামো পরিবর্তন হওয়ার নিয়ম থাকলেও তা দেখার কেউ নেই।
যুক্তি আসতে পারে, বেসরকারি খাতের কতখানি তদারকি সরকারের পক্ষে সম্ভব বা সংগত? সে ক্ষেত্রে ন্যূনতম আর্থিক মান বজায় রাখবার ব্যাপারে অবশ্যই নির্দেশনা ও নিশ্চয়তা থাকতে হবে। সরকারি নতুন বেতন কাঠামো চালু হওয়ার পর দেশের বেসরকারি খাতের ন্যূনতম বেতন নিয়েও ভাবতে হবে। সব খাতেই যাতে ন্যায্য ও ন্যূনতম মানবিক জীবন নির্বাহ করা সম্ভব হয়, সেটিও সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে।

দেশের নাগরিক– সরকারি ও বেসরকারি শ্রমজীবী, পেশাজীবী প্রত্যেকে। কেউই কারও প্রতিপক্ষ নন। তবে সরকারি কর্মকর্তাদের হাতেই যেহেতু সিদ্ধান্ত নেবার চাবি; তারা যদি নিজেদের কোটার কথাই শুধু ভাবেন, তবে পেশাগত বৈষম্য ও দূরত্ব বাড়বে। এতে সামাজিক ভারসাম্য কমবে। মনে রাখতে হবে, মাসে আড়াই লাখ টাকা বেতনের সরকারি কর্মচারী এবং ছয় থেকে আট হাজার টাকা বেতনের শ্রমিক একই বাজারে যান। সবার জন্যই গরুর মাংসের দাম ৮০০ টাকা। রাষ্ট্র তাই কোনো নাগরিককেই দুঃসহ গ্লানি ও অপরিসীম বঞ্চনার সমুদ্রে নিক্ষেপ করতে পারে না।
৩.
সরকারি প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোতে জ্বালানি তেলের দাম বেশি থাকায় তেল পাচার রোধে দাম বাড়ানো হয়েছে! হা-হতোস্মি! বিপুল সীমান্তরক্ষী বাহিনী, বিস্তর আইনকানুন তবে আর সরকারের লালন করবার হেতু কী! অজুহাত দেওয়া ভালো, তবে তার উপযুক্ততা অনিবার্য। প্রতিবেশী দেশগুলোতে তারা তাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় পণ্যের দাম নির্ধারণ করে ও করবে; আমরা আমাদেরটা করি ও করব। সে ক্ষেত্রে পাচার হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা মাথায় রাখা উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে দেবার মতোই।
সিদ্ধান্ত গ্রহণে ন্যায্যতা ও অধিকাংশ মানুষের পরিস্থিতি সবার আগে ভাবা জরুরি। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শেষ ধাপে তা নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায়। সীমিত আয়ের মানুষের জীবন ও জীবিকা তাতে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
আওয়ামী লীগ সরকারের লুণ্ঠনবাজি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের চরম অব্যবস্থাপনায় দেশের আর্থিক কাঠামো ক্ষতবিক্ষত। নতুন বিনিয়োগ প্রায় শূন্য। চাকরিহীন মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে। এর মধ্যে নানা পক্ষ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরিতে সক্রিয়। নির্বাচিত সরকারকে তাই দেশে শৃঙ্খলা ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে অর্থনৈতিক স্থিতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতেই হবে। অধিকাংশ মানুষের জন্য প্রয়োজনে ভর্তুকি দিতে হবে। মানুষের জন্য সরকার; সরকারের জন্য মানুষ নয়– এই মৌলিক সত্য বিবেচনায় রেখে মানবিক রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল হিসেবে মানুষের দায় ও দুর্ভোগ দেশের নির্বাচিত সরকারকেই কাঁধে নেবার মানসিকতা রাখতে হবে। নাগরিক তার কর, ভ্যাট ও ট্যাক্স অবশ্যই রাষ্ট্রকে প্রদান করবেন, নইলে রাষ্ট্রই অচল হবে। তবে তা সহনীয় ও যার জন্য যতটা সম্ভব, তাকে ততটা করের আওতায় আনা জরুরি।
যার বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ বাড়বে; আর যার বেতন গত পাঁচ বছরে ১ শতাংশও বাড়েনি; তাদের দুজনকে এক পাল্লায় বসিয়ে বিবেচনা থেকে সরে আসতে হবে। উপযুক্ত করদাতাদের কাছ থেকে কর আহরণে সরকারের ধারাবাহিক ব্যর্থতার কথা আমাদের জানা। জিডিপির তুলনায় এ খাতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তলানিতে। এনবিআরের তথ্যমতে, টিআইএনধারী বা করদাতাদের নিবন্ধিত সংখ্যা কোটির ঘর ছাড়ালেও প্রকৃত করদাতার সংখ্যা এর তুলনায় অনেক কম। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ গত বছর বলেছিলেন, ‘দেশে মাত্র ১৮ লক্ষ মানুষ ট্যাক্স রিটার্ন জমা দিয়েছেন। তাদের ৭০ শতাংশেরই শূন্য আয়কর।’ শুভঙ্করের ফাঁকির এই অশুভ চক্রকে শনাক্ত করতে হবে বর্তমান সরকারকেই।
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
mahbubaziz01@gmail.com
- বিষয় :
- মাহবুব আজীজ
- জ্বালানি তেল
- মূল্যবৃদ্ধি