ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংস্কার

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতির অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতির অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো
×

মো. আবু নাসের

মো. আবু নাসের

প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৯ | আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিত। শেখ হাসিনা কি সত্যিই বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে মুছে গেছেন? গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই সংবাদমাধ্যম কিংবা সামাজিক মাধ্যমে নজর দিলে এটা স্পষ্ট– জনপরিসরে অনুপস্থিত থেকে তিনি এখনও প্রাসঙ্গিক হয়ে আছেন। 

শেখ হাসিনার শাসনামল নিয়ে সমালোচনার যথেষ্ট কারণ আছে। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় টিকে থাকা ছাড়াও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব; বিরোধী দলের ওপর দমনপীড়ন; মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকোচন এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে দেশ-বিদেশে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্গঠনের বড় সুযোগও তৈরি হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, আমরা সেই পথে এগোতে পারিনি।

গত দুই বছরে শুধু ক্ষমতার পালাবদল ঘটেনি; ধর্মনিরপেক্ষ, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রাজনৈতিক আখ্যানও কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক ইসলামের পুনরুত্থান; সামাজিক রক্ষণশীলতার বিস্তার এবং সংখ্যালঘু ও নারীর অধিকারের ওপর বাড়তি চাপের কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণপন্থার দিকে দৃশ্যমানভাবে সরে গেছে। জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামপন্থি দলগুলোর রাজনৈতিক পরিসর দ্রুত বেড়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় দলটির বিপুল কর্মী-সমর্থক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অনুপস্থিত থাকছে। এর ফলে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অধরাই থেকে গেছে। 

এ পরিস্থিতি শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নয়; আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যে বাংলাদেশের অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগরীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা, ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত, রোহিঙ্গা সংকট এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ইস্যুর সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, উগ্রবাদ বা চরমপন্থার বিস্তার হলে তার প্রভাব দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পড়তে পারে। তাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার তাৎপর্য রয়েছে। 
বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক শক্তি। দলটির কোটি কোটি সমর্থক রয়েছে। শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়েও মানুষের মধ্যে তীব্র সমর্থন ও তীব্র বিরোধিতা দুই-ই আছে। গণঅভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন বটে; দলীয় কর্মী-সমর্থকের মধ্যে তিনি এখনও অদ্বিতীয় জনপ্রিয়। তাই আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা স্থায়ী কোনো সমাধান নয়। কতদিন রাখা যাবে– সেটাও গুরুতর প্রশ্ন। 

ইতিহাস সাক্ষী– রাজনৈতিক শক্তিকে জোর করে দমিয়ে রাখলে তা সাধারণত আরও তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে; বিলুপ্ত হয় না। জামায়াতে ইসলামী এর উদাহরণ। দলটি স্বাধীনতার পর নিষিদ্ধ ছিল। গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুতির আগে আওয়ামী লীগ তাকে নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু তাতে দলটির কর্মীরা দমে যায়নি; সমর্থনও কমেনি। বস্তুত দেশের বিশাল ভোটারগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকে অস্বীকার করা হলে দীর্ঘ মেয়াদে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমে যায়।

গণতন্ত্রের মৌলিক শিক্ষা হলো, কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতাকে অনুমিত জনপ্রিয়তা বা জনক্ষোভের প্রেক্ষিতে নয়, বরং জনগণের ভোট ও আইনের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হয়। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিচার হতে হবে এবং তা অবশ্যই স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ায়। কেননা, রাজনৈতিক প্রতিশোধের মাধ্যমে আর যা-ই হোক, গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ তৈরি করা যায় না।

শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের অন্য কোনো নেতা বা বাংলাদেশে কোনো সাধারণ নাগরিক দেশে ফিরতে পারবেন কিনা– সেই সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তির প্রতি ক্ষোভ বা সমর্থনের ভিত্তিতে হতে পারে না। প্রত্যেক বাংলাদেশি নাগরিকের নিজ দেশে ফেরার অধিকার রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং বাংলাদেশের নিজস্ব সংবিধান উভয়ই যে কোনো নাগরিকের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। রাজনৈতিক মতের কারণে কাউকে দেশ থেকে দূরে রাখা কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আদর্শ হতে পারে না।

আওয়ামী লীগ সমর্থকদেরও মনে রাখতে হবে– শেখ হাসিনার দেশে ফেরা মানেই ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন নয়। তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকশ মামলা হয়েছে। অনুপস্থিত বিচারে তাঁকে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা নিজেই একাধিকবার জানিয়েছেন, তিনি দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে চান। গ্রেপ্তার, কারাবরণ, এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও তিনি দেশে ফিরতে চান। এ পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে নির্বাসিত রাখার নৈতিক বা সাংবিধানিক কোনো ভিত্তি নেই।

শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বাংলাদেশের রাজনীতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে– এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। কিন্তু রাজনৈতিক উত্তেজনা এড়ানোর জন্য কোনো রাজনৈতিক নেতাকে অনির্দিষ্টকাল দেশের বাইরে রাখা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। বরং এর ফলে একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি হতে পারে। আজ একজন, কাল আরেকজন। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দেশছাড়া করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে সরকার পরিবর্তনের অর্থ রাষ্ট্রের চরিত্রের পরিবর্তন নয়। যেখানে ক্ষমতাসীন দল বিরোধীদের শত্রু মনে করবে না এবং বিরোধী দলও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের রাজনীতিতে যাবে না। ধর্ম, জাতীয়তাবাদ কিংবা মুক্তিযুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোও যেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত না হয়।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনীতির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল একটাই: আমরা কি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব? আমরা কি প্রতিশোধের রাজনীতি পেছনে ফেলে পুনর্মিলনের রাজনীতিচর্চা করতে পারব? সেই পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল এখনও প্রকাশ হয়নি। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের এই আকাঙ্ক্ষা দেদীপ্যমান: এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে কোনো নেতা চিরস্থায়ী নন; কোনো দল রাষ্ট্রের মালিক নয় এবং কোনো নাগরিক তাঁর রাজনৈতিক মতের কারণে রাষ্ট্রের শত্রু হয়ে উঠবেন না।

ড. মো. আবু নাসের: ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির বেকার্সফিল্ডের কমিউনিকেশন্স বিভাগের চেয়ারপারসন 

আরও পড়ুন

×