ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নির্বাচন

এটা ২০১৮ নয়– ২০২৩

এটা ২০১৮ নয়– ২০২৩
×

হাসান মামুন

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ০১:৪৪

২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে সরকারকে মাঝেমধ্যে বিব্রত হতে দেখা যায়। এমন নির্বাচন আর হবে না বলেও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। এ প্রতিশ্রুতি যে আগামী নির্বাচনের ব্যাপারে বিশেষভাবে আগ্রহী পশ্চিমাদের দেওয়া হচ্ছে, সেটাও বলা হয়ে থাকে। এরই মধ্যে আবার দাবি করা হয়, জনগণ বারবার তাদের ‘নির্বাচিত’ করেছে এবং এতে সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় ‘এত উন্নয়ন’ হতে পেরেছে দেশে।

২০১৮-এর নির্বাচন নিয়ে বিএনপির বক্তব্যও স্পষ্ট নয়। ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে তারা সে নির্বাচনে গিয়েছিল রীতিমতো সংলাপ করে। খোদ প্রধানমন্ত্রী নাকি তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলে। বাস্তবে সিংহভাগ আসনে ‘ভোট’ আগের রাতেই হয়ে গিয়েছিল। এটা এখন প্রতিষ্ঠিত অভিযোগ। একটি বন্ধু দেশের রাষ্ট্রদূতও এর উল্লেখপূর্বক বিস্ময় প্রকাশ করে গেছেন। তবে ঘটনাদৃষ্টে মনে হয় না, বিএনপি সরল বিশ্বাসে নির্বাচনে গিয়েছিল। ওটা ‘আসন সমঝোতার নির্বাচন’ ছিল বলে কথা চালু আছে। বিরোধী দলকে কত আসন দেওয়া হবে, এমন ‘খবর’ও তখন এসেছিল মিডিয়ায়। এটা ছাড়া তাদের নাকি কিছু করারও ছিল না। আন্দোলন করে সরকারকে ফেলে দেওয়ার ক্ষমতা বিএনপি ও তার মিত্রদের ছিল না। আগের নির্বাচন বর্জন এবং তা প্রতিহত করার চেষ্টা থেকেও তারা কিছু পায়নি। উল্টো অগণিত মামলায় ফাঁসে বহু নেতাকর্মী।

বিএনপি ২০১৮-এর নির্বাচনটিও বর্জন করতে পারত। দলের একাংশ এর পক্ষে ছিল বলে জানা যায়। তবে যেভাবেই হোক, নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তই জয়ী হয়েছিল। হয়তো আশা করা হয়েছিল, এর ভেতর দিয়ে আরেক মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার পাশাপাশি বিএনপি ও তার মিত্ররা ৮০-৯০ আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দলের জায়গায় গিয়ে বসতে পারবে। এর পর যথাসম্ভব দ্রুত আরেকটা নির্বাচনের ভেতর দিয়ে সরকার গঠনে সক্ষম হবে বিএনপি।

সে ‘সমঝোতা’ কেন বাস্তবায়িত হলো না, তার ভালো ব্যাখ্যা কিন্তু নেই। কাদের তৎপরতায় এটা সম্ভব হলো না, তা আজও অজানা। আসন সমঝোতার নির্বাচন নিশ্চয়ই ভালো রাজনীতির অংশ নয়। তবে দেশে এ ধরনের নির্বাচন অতীতে হয়েছে। এর ভেতর দিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে বেরুনোর সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষেরই একাংশ হয়তো তখন ভেবেছিল, এর মধ্য দিয়ে জনগণের ইচ্ছার একটা প্রতিফলন অন্তত ঘটবে। বাড়বে সরকারের জবাবদিহি ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির সুযোগ। কিন্তু সেটা হয়নি। দেখা গেল, বিএনপি মাত্র সাতটি আসনে জয়ী হলো এবং প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল জাতীয় পার্টি; যারা একই সঙ্গে সরকারের সহযোগী।

২০১৮-এর নির্বাচনের কথাটা আনলাম এটা বলতে, দেশে ও বাইরের অনেকের কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ এখনও ওই রকম অবস্থায় রয়ে গেছে! দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হতে হবে বলে যারা মনে করেন, তারা বিএনপিকে কত আসন দিলে দলটি ‘সন্তুষ্ট হয়ে’ নির্বাচনে আসবে– এ আলাপ এখনও বাজারে চালু রাখছেন। আওয়ামী লীগের জন্য তারা আরেকটা মেয়াদ চান। বিএনপি নির্বাচনে না এলে না আসবে– এমনটাও তারা আর মনে করছেন না। দলটিকে বাইরে রেখে আর নির্বাচন করা ঠিক হবে না বলেই বরং তারা মনে করছেন।

ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় বিএনপিকে ভাঙার একটা প্রবণতা ছিল। পরেও চেষ্টা কম হয়নি। কিন্তু দলটিকে ভাঙা যায়নি; যদিও এর নেতৃত্বে বোধগম্য কারণেই সংকট রয়েছে। ইতোমধ্যে বিএনপির জনসমর্থন যে বেড়েছে, তারও প্রমাণ মিলছে নানাভাবে। তৃণমূল পর্যন্ত কর্মীরা উজ্জীবিত। তাদের উজ্জীবিত হওয়ার বড় কারণ আবার বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমাদের আগ্রহ। বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে দেখাচ্ছে নজিরবিহীন উৎসাহ। সে লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাও নিয়েছে তারা।

অবস্থা এখন এমন যে, সরকার চাইলেই ২০১৪ বা ২০১৮-এর মতো নির্বাচন করে ফেলে শক্তভাবে ক্ষমতায় বসে যেতে পারবে না। এক যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নজরদারির কারণেই এবার কিছুটা হলেও সুষ্ঠু নির্বাচন করে দেখাতে হবে তাকে। এ অবস্থায় এমন তত্ত্বও দেওয়া হচ্ছে, বিএনপির উচিত নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে সরকারকে ‘চ্যালেঞ্জে’ ফেলে দেওয়া। নইলে সংবিধানের দোহাই দিয়ে সরকার তার মিত্রদের নিয়ে নির্বাচনটা সেরে ফেলতে পারলে তাকে আর প্রশ্নবিদ্ধ করা যাবে না। বর্তমান আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে সেটা সহজ নয় অবশ্য। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমারা অব্যাহতভাবে বলছে ‘অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন’ আয়োজনের কথা। এর মানে কী, সেটা কাউকে বুঝিয়ে বলতে হবে না। যে দল নির্বাচনে এলে হয় সরকার গঠন, নয়তো প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে– তাকে বাইরে রেখে কোনো নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে না।


এ অবস্থায় ভারতীয় পত্রপত্রিকায়ও বাংলাদেশের নির্বাচনকে ‘সুষ্ঠু’ করার কথা বলা হচ্ছে। ভারত সরকার বিশেষ কোনো দলের পক্ষে আছে কিংবা অমুককে ক্ষমতায় দেখতে চায়, এ বয়ানও দুর্বল হচ্ছে ক্রমে। তারা ভালো করেই জানে, নির্বাচন সুষ্ঠু হলে কী ঘটবে। তবে সে নির্বাচনে যে শক্তি ক্ষমতায় আসবে, তারা বিশেষত ভারতের নিরাপত্তার জন্য সমস্যা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এ জন্য তাদের একান্ত চাওয়া, বর্তমান সরকারই ফিরে আসুক। আবার সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিও তারা অগ্রাহ্য করতে পারছে না। সেটা বিশেষ করে তার কৌশলগত মিত্র যুক্তরাষ্ট্র চাইছে বলে।

যুক্তরাষ্ট্র নাকি নিজ চোখে বাংলাদেশকে দেখছে এখন। এখানকার পরিস্থিতির মূল্যায়ন করছে তারা এবং নিজ কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সেটাকে মেলাতে চাইছে। এটাই সরকারের জন্য হয়ে উঠেছে বিশেষ অসুবিধাজনক। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে দেশটির অব্যাহত তাগাদাকে তারা ‘চাপ’ বলে বর্ণনা করছে। এ অবস্থায় ভালো হতো ২০১৮-এর মতো একটা সমঝোতায় পৌঁছানো গেলে। চাই তো বিএনপিকে শতাধিক আসন দিয়ে আরেকটা মেয়াদ থাকার ব্যবস্থা করা গেলে ভালো হতো সরকারের জন্য। ভবিষ্যতে ‘শান্তিপূর্ণ প্রস্থানের পথ’ও এতে প্রশস্ত হতো।

মুশকিল হয়েছে ওখানে যে, এটা ২০২৩ সাল। পরপর দুইবার সুষ্ঠু নির্বাচন না পাওয়া বিপুলসংখ্যক নাগরিক এবার ভোট দিতে চায়। সুনির্বাচিত সরকার না থাকায় জবাবদিহির অভাবে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে বলেও তারা মনে করছে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সরকারের ব্যর্থতা স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত। এ ক্ষেত্রে চীনের দিকে অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়াটা চোখে পড়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের। এর মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধে ভারত, বাংলাদেশ উভয়ের ভূমিকাতেই বিরক্ত হয়েছে দেশটি। বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনকে সে ইস্যু করে ফেলেছে এ অবস্থায়। আর এটা চলে গেছে বিএনপির দাবির পক্ষে।

বিএনপি ‘কার্যকর আন্দোলন’ গড়ে তুলতে অক্ষম বলে তাকে তুচ্ছ করা হতো। সেটার বোধহয় আর দরকারও নেই। এখন ভারতকে যদি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কাছাকাছি এসে দাঁড়াতে হয়, তাহলেই এখানে পরিস্থিতি ঘুরতে শুরু করবে। তবে হাসিনা সরকার কোনোভাবেই মানবে না কেয়ারটেকারের দাবি। আসন সমঝোতায় যাওয়ার বাস্তবতাও নেই। সুযোগটি ২০১৮ সালেই হারিয়েছে সরকার। এ অবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচনের চাহিদা পূরণ কীভাবে হবে, তার জন্যই অপেক্ষা। হাতে বেশি সময়ও নেই।

হাসান মামুন: সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×