রাজনীতি
অস্বস্তি ও উদ্বেগে ভরা এক দেশ
হাসান মামুন
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০
জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সমীকরণ সরকারের জন্য ‘অস্বস্তিকর’–এ কথা অনেকেই বলছেন। উদ্বেগের জায়গা অবশ্যই রয়েছে। বিরোধী দলেও কি অস্বস্তি ও উদ্বেগ নেই? দাবি আদায়ে সরকারের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টির ব্যর্থতাই তাদের অস্বস্তির কারণ। ক্ষমতাসীনদের মধ্যেও এমন ধারণা বদ্ধমূল যে, নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ সরকারব্যবস্থা আদায়ে বিরোধী দল আগামীতেও কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে না। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তারা বলেও চলেছেন– পারলে তেমন আন্দোলন গড়ে তুলে সরকারকে তাদের দাবি মানতে বাধ্য করুক!
‘জনগণকে সম্পৃক্ত করে’ আন্দোলন গড়ে তোলার কথা অবশ্য বলা হচ্ছে। জনজীবনে সৃষ্টি হওয়া সংকটের চাপে একপর্যায়ে নির্বাচনকেন্দ্রিক আন্দোলনেও মানুষ নাকি সম্পৃক্ত হয়ে পড়বে। মূল্যস্ফীতিসহ জনজীবনে সংকট সৃষ্টির প্রক্রিয়া তো অনেক দিন ধরেই চলমান। সরকার যে সেটা সামলাতে খুব সক্রিয়, তাও মনে হয় না। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় খামখেয়ালিপনাও দৃশ্যমান। ব্যাংকসহ বিভিন্ন খাতে বড় দুর্নীতির খবরও কম বেরুচ্ছে না। রিজার্ভ দিন দিন খারাপ হচ্ছে এবং শঙ্কা রয়েছে আমদানিতে অচলাবস্থা সৃষ্টির। এগুলো সবার কাছে সমান বোধগম্য না হলেও নিত্যপণ্যের বাজারে বাড়তে থাকা আগুন জনসাধারণের গায়ে এসে লাগছে। তবে এটা ঘটলেই তারা রাস্তায় নেমে আসবে, বিষয়টা এত সরল নয়।
খেয়েপরে ভালো নেই– এমন সবাই সরকারবিরোধী নয়। যারা ক্ষমতার সুফলভোগী নয়, তাদের মধ্যেও অনেক সরকার সমর্থক রয়েছে। চোখের আরামের জন্যও অনেকে তার পছন্দের সরকারকে ক্ষমতায় দেখতে চায়। গণতন্ত্রহীনতা মেনে নিতেও তাদের অনেকে প্রস্তুত। এর বাইরে যে বিরাট জনগোষ্ঠী, তার একাংশ এ মুহূর্তেই সরকারের পতন চাইলেও রাস্তায় নামার ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক। বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা আন্দোলন রচনায় কতখানি সক্ষম, সেটা তারা আগে দেখতে চাইবে। অতীতে সহিংস আন্দোলনেও যারা সরকারকে একতরফা নির্বাচন থেকে সরাতে পারেনি, তাদের ওপর আস্থা রাখার সুযোগ তো কম। এটাও ভালো করে জানা, বড় বড় জনসমাবেশ করলেই সরকার নতিস্বীকার করবে না। পাল্টা জনসমাবেশ করে এর জবাব দেবে বরং। বোধগম্য নানা কারণে সে সামর্থ্য তার এখনও অটুট। এ দেশে সরকার ‘আন্দোলন’ বলতে যা বোঝে, সে ভাষায় বিরোধী দল কথা বলতে পারবে বলে এখনও মনে হচ্ছে না। এটা তারও অস্বস্তির জায়গা।
কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারলে সরকার তার মতো করে নির্বাচন সেরে ফেলার দিকে সহজেই এগিয়ে যেতে পারবে। এ নিবন্ধ লেখার দিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলটি ঢাকা ত্যাগের কথা। তারা প্রধানমন্ত্রীসহ নির্বাচনসংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গেই বৈঠক করে এ সম্পর্কে ধারণা নিতে চেয়েছে। এ দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক ও নির্বাচন সম্পর্কিত পরিস্থিতি তাদের এমনিতেও ভালোই জানা আছে। এটা সম্ভবত তাদের রুটিন ওয়ার্ক। কাজটি ইইউর পক্ষ থেকেও ইতোমধ্যে সেরে ফেলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসছে না। পরিস্থিতির গুণগত কোনো পরিবর্তন না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রও সম্ভবত একই পদক্ষেপ নেবে। তারা নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশের ওপর ঘোষিত ভিসা নীতির প্রয়োগও শুরু করে দিয়েছে। এটা নজিরবিহীন বটে। এখন তারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণেও না এলে তাতেও সরকার অবস্থান বদলাবে বলে মনে হয় না। ইসিও বলে দিয়েছে, ২৯ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন হতে হবে। নইলে সৃষ্টি হবে সাংবিধানিক শূন্যতা!

এটা যে ইতোপূর্বে কখনও সৃষ্টি হয়নি, তা তো নয়। সেখান থেকে জাতি মুক্তও হয়েছে। আর লাভবান হয়েছে কোনো না কোনো পক্ষ। তারা ক্ষমতায় এসে গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত করায় ভূমিকা রাখেনি, তাও নয়। আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টিতে ব্যর্থ বিএনপি এখন তেমন কিছুর আশায় আছে বলে মাঝে মাঝে প্রচার চালানো হচ্ছে। একথা ঠিক, আগামী নির্বাচন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা মহলের ইতোমধ্যে গৃহীত অবস্থান সরকারবিরোধীদের আশার জায়গা। অস্বস্তির বিপরীতে এটা ভালোই কাজ করে, যখন পশ্চিমা তরফ থেকে নতুন কোনো পদক্ষেপ আসতে দেখা যায়। ভিসা নীতির প্রয়োগ শুরুর পর বিরোধী দল আশায় আছে ক্ষমতাসীন ও তাদের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্তদের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আসার। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় তাদের বিষয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী খবর প্রচার হবে বলেও জল্পনা চলছে। তেমন কিছু ঘটলে সেগুলোকে অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেওয়া হবে নিশ্চয়ই। তবে ক্ষমতাঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের ওপর ‘টার্গেটেড স্যাংশন’ এলে সেটিকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
আমাদের অর্থনীতির বড় অংশই ঢাকা, চট্টগ্রামের মতো কয়েকটি গ্রোথ সেন্টারে কেন্দ্রীভূত। অল্প কয়েকটি বিজনেস গ্রুপ আবার নিয়ন্ত্রণ করে এর বড় অংশ। প্রশ্ন হলো, এর কর্ণধারদের একাংশ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ‘স্যাংশন চেইনে’ পড়ে গেলে সেটি সরকারের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করবে সহসা? বেশি তো নয়। একাধিক শর্ত পূরণে ব্যর্থতার কারণে আইএমএফের ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি না মিললেও এ মুহূর্তে তা সংকটজনক হবে না। এর প্রভাব পরিলক্ষিত হবে ভবিষ্যতে। এর মধ্যে সরকার নির্বাচন সেরে ফেলে ক্ষমতায় বসে যেতে পারলে পরিস্থিতি বিরোধী দলের জন্য খুবই প্রতিকূল হয়ে পড়তে পারে। এটি হলো তার উদ্বেগের জায়গা।
একতরফাভাবে নির্বাচন করে ফেললেও সেটা মোটামুটি শান্তিপূর্ণ রাখা গেলে এবং ভোটের হার খুব খারাপ না হলে সরকার বলতে পারবে– ‘জনগণ আমাদের পুনর্নির্বাচিত করেছে’। বিএনপি ও তার মিত্ররা অংশ নিলে নির্বাচনটা আরও ভালোভাবে হতে পারত বলে তাদের অভিযুক্তও করা যাবে। প্রশ্ন হলো, সে অবস্থায় সরকারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টির উৎসাহ পশ্চিমাদের দিক থেকে আর থাকবে কিনা? কোনো কারণে যদি সেটি না থাকে, তাহলে কী হবে? এমন ধারার গভীর অস্বস্তিপূর্ণ প্রশ্ন বিএনপি ও তার মিত্রদের মধ্যে থাকার কথা। ঠিক এ কারণে তাদের মধ্যে একটা ‘সম্মানজনক সমঝোতা’র জায়গা বের করার প্রয়াসে যোগ দেওয়ার প্রবণতা থাকাও বিচিত্র নয়। ‘তলে তলে’ সে প্রক্রিয়া চলমান বলেও শোনা যায়। সামনের দিনে পরিস্থিতি নিশ্চয়ই স্পষ্ট হবে। হাসান মামুন: সাংবাদিক, বিশ্লেষক