ঢাকা শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজনীতি

সামনে তাকাতে পারতে হবে

সামনে তাকাতে পারতে হবে
×

হাসান মামুন

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৩ | ২১:৪৮ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২৩ | ২১:৪৮

রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা-যাওয়া করা কোন দলের অতীত ভালো? মন্দের ভাগ বেশি হলেই আমরা বলি, ওটা মন্দ। প্রবণতা দেখেও বলা হয়ে থাকে– ভালো না মন্দ। ক্ষমতায় আসা-যাওয়া করা দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাশাপাশি জাতীয় পার্টিও আছে। তারাও শাসক দল ছিল। পরে আরেকটি শাসক দলের সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। টকশোয় তাদেরও ডাকা হয়ে থাকে। তাদের কেউ কেউ অবশ্য বলেন, জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সেনাশাসক এরশাদও ‘বোকা বনে গেছেন’ তাঁর পরবর্তীকালটা দেখে। ক্ষমতায় আসা-যাওয়া করা অপর দুই দল গণতন্ত্র ও সুশাসনে এমনই ভূমিকা রেখেছে!

সেনাশাসকদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিতদের তুলনা করে বক্তব্য দেওয়া অবশ্য ঠিক নয়। দ্বিতীয় ধরনের শাসকদের কাছে মানুষ গণতান্ত্রিক আচরণ ও সুশাসন প্রত্যাশা করে। এটা বলা তাই ঠিক নয়, জেনারেল জিয়া ‘হ্যাঁ-না ভোট’ করেছিলেন বলে আমরাও ২০১৮ ধরনের নির্বাচন করেছি। কিংবা এরশাদ সাহেব বিরোধী দল-বিবর্জিত নির্বাচন করেছিলেন বলে আমরাও ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটা করেছিলাম! তুলনা হতে পারে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত দুই শাসনামলের মধ্যে। তুলনা হতে পারে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন প্রথম শাসনামলের সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলের। এমনকি তুলনা হতে পারে একই গণতান্ত্রিক শাসকের প্রথম শাসনামলের সঙ্গে তার দ্বিতীয়টির। এতেও কিন্তু স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাবে অবনতির ধারা।

তা সত্ত্বেও দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার একটা ধারাবাহিক উন্নতি আমরা লক্ষ্য করব। প্রবৃদ্ধি বেড়েছে; জীবনযাত্রার মান হয়েছে উন্নত। আবার বৈষম্য বেড়েছে। এক ধরনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তো রয়েছে, যাতে বৈষম্য বেড়ে যায়। একে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বলা যায় না। অথচ এ ধরনের প্রবৃদ্ধিই প্রয়োজন। এমন প্রবৃদ্ধি আশা করেই এ দেশের মানুষ একাত্তরে লড়েছিল, শহীদ হয়েছিল। যারা অষ্টপ্রহর ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’র কথা বলতে অভ্যস্ত, তারাও বৈষম্যমূলক প্রবৃদ্ধির পথে হাঁটছেন। তাদের আমলে একটা নজিরবিহীন গোষ্ঠীতান্ত্রিক পুঁজিবাদ কায়েম হয়েছে বরং। দুর্নীতির বিস্তার, লুট ও অর্থ পাচার মানুষকে করে দিয়েছে হতবাক। এর মধ্য দিয়ে যেটুকু উন্নয়ন ঘটেছে, সেটা অবশ্য তার প্রাপ্তি।

নব্বইয়ের পর ক্ষমতায় আসা-যাওয়া করা দুই দলে অর্থনীতি পরিচালনায় মোটা দাগে পার্থক্য সামান্যই। তারা বরং পরস্পরকে অনুসরণ করছে; এক পক্ষ অপর পক্ষকে যাচ্ছে ছাড়িয়ে। সে জন্য অর্থনৈতিক নীতিকৌশল নিয়ে তাদের মধ্যে বিতর্ক হতে খুব একটা দেখা যায় না। বড়জোর দাবি করা হয়ে থাকে, তাদের আমলে কম দুর্নীতি হয়েছিল বা হচ্ছে। অর্থনীতি বড় হতে থাকলে দুর্নীতি আকারে বাড়বে কিংবা দুর্নীতি হলো উন্নয়নের অনুষঙ্গ– এমন বয়ানও তাদের কেউ কেউ হাজির করেন। তবে মানুষ বিস্মিত হয়, যখন দুর্নীতি দমনে অনেক বেশি ব্যর্থ শাসক অতীতের শাসককে কম দুর্নীতির জন্য অভিযুক্ত করেন।

দু’পক্ষে কিছু রাজনৈতিক মতপার্থক্য অবশ্য রয়েছে। সেটা কতটা আদর্শভিত্তিক, তা নিয়েও আছে প্রশ্ন। এক পক্ষ নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি দাবি করলে অপর পক্ষ বলে, যারা পরপর দু’বার নির্বাচনের নামে যা-তা করেছে, তারা আবার কীসের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তি! ক্ষমতায় থাকাকালে বিরোধী দলের নেতৃত্বকে একযোগে ধ্বংস করার ভয়াবহ চেষ্টার জন্য আবার এক পক্ষ অপর পক্ষকে দায়ী করে। তাদের দায়ী করা হয় জঙ্গিবাদে মদদ জোগানোর জন্য। যাদের বিরুদ্ধে এসব গুরুতর অভিযোগ, তারাও বলে চলেছে গুম-খুন ও মামলায় জড়িয়ে বিরোধী দলকে ক্রমশ নির্মূলের চেষ্টার কথা। এখন এ বিরোধী দলটি ক্ষমতায় ফিরে এলে এক রাতে প্রতিপক্ষের লাখ লাখ নেতাকর্মীকে মেরে ফেলবে বলে ভীতিকর বক্তব্যও দেওয়া হচ্ছে। এসব বলাবলির মধ্যে রাজনৈতিক আদর্শবাদের বদলে গোত্রীয় বিবাদই বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। মন্দের প্রতিযোগিতাই প্রবলভাবে উপস্থিত।

এর ভেতর দিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পরস্পর কাছাকাছি এসেছে ক্রমে। বিপদে না পড়লে তারা গণতান্ত্রিক আদর্শ ও রীতিনীতি বর্জন করে চলতেই পছন্দ করে। দল পরিচালনা আর নেতৃত্ব নির্বাচনেও সেটা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত। উভয় পক্ষই বিরোধী দল ও মতকে তার জায়গা দিতে অসম্মত। নানা ধরনের সংখ্যালঘুর অধিকার ও অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে তারা কমবেশি উদাসীন। বিরোধী দল হিসেবেও এমনকি স্বাভাবিক সময়ে তারা পাল্লা দিয়ে দায়িত্বহীন। প্রথা-প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বদলে তার ধ্বংস সাধন; গণতান্ত্রিক অধিকার খর্বকারী আইন আঁকড়ে ধরায় তারা যেন একে অপরের অনুসারী। কোন কোন ক্ষেত্রে প্রকৃতই পার্থক্য রয়েছে, সেটা নির্ণয় করা কঠিন।

টকশোয় তাই এদের কে কখন কী অপকাণ্ড করেছিলেন আর করে চলেছেন, তা নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে বলতে বলতে অনুষ্ঠান শেষ করে দেন। কখনও কখনও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়; হয় হাতাহাতির উপক্রম। তাতে লাভ হয় টিভি স্টেশনের। সে অনুষ্ঠানের ভিডিওটি ‘ভাইরাল’ হয়। যেটা হয় না, তা হলো সামনে তাকানো। দুই শাসক দলের অতীত ও বর্তমান নিয়ে পাল্টাপাল্টির বদলে তাদের কিন্তু উচিত সামনে তাকানো। ক্ষমতাসীনদের পক্ষে সেটি অবশ্য কঠিন। তাহলে তো নিজেদের বর্তমান দোষত্রুটিও স্বীকার করতে হয়। তারা বরং নিজ ‘সাফল্য’ প্রচার করতে চান। ভালোভাবে নির্বাচন করে দেশ চালাতে পারেননি বলে ‘উন্নয়ন’-এর বাদ্য বেশি করে বাজাতে চান। এ অবস্থায় বিরোধী দলকেই পরিষ্কার করে বলতে হবে– চলমান উন্নয়নে সমস্যা কোথায় এবং ভবিষ্যতে তারা কেমন উন্নয়ন দেবেন। রাজনৈতিক উন্নয়ন ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন অসম্পূর্ণ আর তা টেকসই নয় বলে রাজনৈতিক উন্নয়ন ঠিক কোথায় কোথায় আনতে হবে, সেটাও বলতে হবে বিরোধী দলকে।

তারা অবশ্য ইতোমধ্যে ২৭ দফা রূপরেখা ঘোষণা করেছে, যাতে বিএনপির মিত্রদের চিন্তার প্রভাব স্পষ্ট। সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে তারা। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় যেসব সংস্কারে জোর দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোও এতে রয়েছে দেখে অবাক হওয়া যাবে না। গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণে ও সুশাসনের সম্ভাবনা বাড়াতে এসব সংস্কার তো প্রয়োজন। তার জবাবে এমনটা বলার কোনো মানে নেই যে, ‘বিএনপির মুখে এসব মানায় না’! তার বদলে বরং বলা যেতে পারত– এর চেয়ে ভালো কী করা যায়। যারা ক্ষমতায় আছেন, তাদের পক্ষে তো ভালো কিছু করে দেখানো এখনই সম্ভব। যেমন– নির্বাচন ঘিরে অবিশ্বাস তীব্র বলে ক্ষমতাসীনরা দ্রুতই বলতে পারেন, অবিশ্বাস কাটাতে সংবিধানের আওতায়ই কী সংস্কার আনা সম্ভব। কিন্তু এটা বলে যাওয়ার তো কোনো মানে নেই যে, নির্বাচন আগের মতো করেই হবে। রাগের মাথায় তারা মাঝেমধ্যে এমনও বলে ফেলছেন– ‘আমাদের অধীনে সব নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে’!

এগুলো কোনো কাজের কথা নয়। অতীতে কখন কার কী গৌরব অর্জিত হয়েছিল, সেগুলো বারবার বলেও বর্তমান সংকট নিরসন করা যাবে না। কথাবার্তায় প্রাসঙ্গিকও হতে হবে। বর্তমান চাহিদা বুঝতে দেরি করে ফেললে হবে না। এখনকার সংকটের ধরন ভিন্ন বলে এটা মোকাবিলাও করতে হবে ভিন্নভাবে। এর আওতায় অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সমন্বিত করতে হবে গণতন্ত্র ও সুশাসনের সঙ্গে। এর বিপরীত ভাবনাচিন্তা রয়েছে বলেও শোনা যায়। সেটা জয়ী হলে কিন্তু খুলে যেতে পারে সর্বনাশের দুয়ার।

হাসান মামুন: সাংবাদিক, বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×