ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪

‘কিংস পার্টি’ রাজনীতির ভূত ও ভবিষ্যৎ

তৃতীয় মেরু

‘কিংস পার্টি’ রাজনীতির ভূত ও ভবিষ্যৎ

শেখ রোকন

শেখ রোকন

প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৩ | ২৩:১১

সাধারণ নির্বাচনের আগে আগে সংবাদ সম্মেলন বা বিসংবাদ সমাবেশের মাধ্যমে নতুন দলের আবির্ভাব বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় প্রতিষ্ঠিত রেওয়াজ। ‘ওয়ান ইলেভেন’ সরকার ২০০৮ সালে ‘রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা’ প্রণয়নের পর থেকে অবশ্য নির্বাচনে অংশ নিতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে নিবন্ধনও নিতে হচ্ছে। যেমন চলতি বছরেও পাঁচটি নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধন পেয়েছে। ইসির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নিবন্ধনের তারিখ অনুযায়ী দলগুলো হচ্ছে: তৃণমূল বিএনপি (১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৩), ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ (৮ মে ২০২৩), বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-বাংলাদেশ জাসদ (৮ মে ২০২৩), বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম (১০ আগস্ট ২০২৩), বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি-বিএসপি (১০ আগস্ট ২০২৩)। 

এই পাঁচ রাজনৈতিক দলের মধ্যে তৃণমূল বিএনপি, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ জাসদকে উচ্চ আদালতের নির্দেশে নিবন্ধন দিতে ‘বাধ্য’ হয় নির্বাচন কমিশন। আর বিএনএম ও বিএসপি নিবন্ধন পায় ‘নিয়ম অনুযায়ী’। যদিও চলতি বছর এপ্রিলে ওই দুই দলের সঙ্গে ‘প্রাথমিক বাছাইয়ে’ টিকে যাওয়া আরও ১০টি রাজনৈতিক দল শেষ পর্যন্ত নিবন্ধন পায়নি। নিবন্ধনবঞ্চিতদের মধ্যে এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, নাগরিক ঐক্য, রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলনের মতো রাজনীতির মাঠে সুপরিচিত ও দৃশ্যত বেশি জনসম্পৃক্ত রাজনৈতিক দলও রয়েছে। আর দুই দশক ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় গণসংহতি আন্দোলন উচ্চ আদালতের নির্দেশনা নিয়ে এসেও ইসির আপিলের কারণে আটকে আছে। নির্বাচন কমিশন যত ব্যাখ্যাই দিক; প্রথমোক্ত দলগুলোর নিবন্ধনপ্রাপ্তি এবং শেষোক্ত দলগুলোর নিবন্ধন-বঞ্চনা প্রমাণ করে– ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’।

যাহোক, এ বছর নিবন্ধন পাওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএমএম তিন মাসের মাথায় জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে মাঠে নেমেছে। দলটি দাবি করছে, তাদের পেছনে কারও পৃষ্ঠপোষকতা বা সহযোগিতা নেই। কিন্তু যখন একটি নবগঠিত রাজনৈতিক দল তিন মাসের মাথায় মহাখালীর ‘খুপরি’ থেকে গুলশানের আলিশান কার্যালয়ে এসে ওঠে, তখন এর ‘রাজনৈতিক-অর্থনীতি’ নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য।

সর্বশেষ, নিবন্ধনের সময়কার সদস্য সচিবকে সরিয়ে ১৬ নভেম্বর মহাসচিবের দায়িত্বপ্রাপ্ত মোহাম্মদ শাহজাহান তাঁর দলকে ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে অভিহিত না করারও অনুরোধ জানিয়েছেন (সমকাল, ২৫ নভেম্বর ২০২৩)। কেবল বিএমএ বা তৃণমূল বিএনপি নয়; বাংলাদেশ জাসদ ছাড়া চলতি বছর নিবন্ধন পাওয়া বাকি দুটি দলের ব্যাপারেও ‘কিংস পার্টি’ তকমা সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে।

অনেকে মনে করেন, ‘কিংস পার্টি’ ধারণার উৎপত্তি বোধহয় সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার যুক্তরাজ্যে। বাস্তবে ইতিহাসের প্রথম কিংস পার্টি গঠিত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই স্টেটে। দ্বীপপুঞ্জটি স্বাধীন ‘হাওয়াই কিংডম’ থাকাকালে নিয়ম ছিল যে, রাজার বংশগত উত্তরাধিকার না থাকলে এবং তিনি কাউকে মনোনীত না করে গেলে বিধানসভা পরবর্তী রাজা নির্বাচন করবে। ১৮৭৪ সালে কিং লুলালিলোর মৃত্যুর পর এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। রাজকীয় সেনাপ্রধান ডেভিড কালাকাউয়া এবং পূর্ববর্তী রাজা চতুর্থ কামেহামেহার স্ত্রী কুইন এমা নির্বাচনে দাঁড়ান। বিধানসভার সদস্যরা তখন ‘কিংস পার্টি’ ও ‘কুইনস পার্টি’ নামে বিভক্ত হন এবং ৩৫-৬ ভোটে কালাকাউয়া নির্বাচিত হন। জনসাধারণের মধ্যে রানীর প্রভাব বেশি থাকায় নির্বাচনের পর দাঙ্গা বেধে যায় এবং আমেরিকান ও ব্রিটিশ নৌ সেনাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। তবে পরবর্তী দেড় দশকের মধ্যে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ এবং হাওয়াই যুক্তরাষ্ট্রের ‘টেরিটোরি’ হিসেবে ‘যোগ’ দিয়েছিল। 

বাংলাদেশে ‘কিংস পার্টি’ ধারণা মুখরোচক হয়ে ওঠে অবশ্য ‘ওয়ান ইলেভেন’ সরকারের সময়। সেই সময় জরুরি অবস্থার মধ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকলেও রাজনীতিক ও সাংবাদিক ফেরদৌস আহমদ কোরেশীর নেতৃত্বে রীতিমতো ঢাকঢোল পিটিয়ে গঠিত হয়েছিল ‘প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টি-পিডিপি’। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র ৪৫ দিন আগে দলটি নিবন্ধন পায়। অবশ্য ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর নিবন্ধন হারায় পিডিপি। একই সময়ে ২০০৮ সালের ১৭ নভেম্বর নিবন্ধন পেয়েছিল অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি। দলটি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য আন্দোলনে ‘ক্লান্ত’ হয়ে সম্প্রতি দলীয় সরকারের অধীনেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ওয়ান ইলেভেনকালেই নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত রাজনৈতিক দল ‘নাগরিক শক্তি’ আত্মপ্রকাশের মাস তিনেক পরেই বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন প্রধান বিরোধীদলীয় জোট ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন ও প্রতিরোধের ঘোষণা দেওয়ার পর নির্বাচনের মাত্র দেড় মাস আগে ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর নিবন্ধন পেয়েছিল বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ)। বিস্ময়করভাবে কল্যাণ পার্টি বা পিডিপি না পারলেও দলটির চেয়ারম্যান ‘সাংবাদিক ও রাজনীতিক’ আবুল কালাম আজাদ একটি আসনে (ঢাকা-১৭) বিজয়ীও হয়েছিলেন! দলটি এবারও মাঠে রয়েছে। যদিও নবাগত বিএনএমের দাপটে খানিকটা আড়ালেই চলে গেছে বিএনএফ।

বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, প্রায় প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই কোনো না কোনো ‘কিংস পার্টি’ গঠিত হয়েছে। যেমন ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের উদ্যোগে ১৯৮৭ সালের ৩ আগস্ট গঠিত হয়েছিল ‘ফ্রিডম পার্টি’। দলটি ওই নির্বাচনে প্রায় সব আসনে প্রার্থী দিয়ে দুটিতে জয়ী হয়। এই নিবন্ধকারেরও মনে আছে, নব্বই দশকে ফ্রিডম পার্টির স্থানীয় নেতাদেরও মূল ‘রাজনীতি’ ছিল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার ও সন্ত্রাস। এমনকি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বহুল সমালোচিত ও স্বল্পায়ু ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর খুনি খন্দকার আব্দুর রশীদ কুমিল্লার একটি আসন থেকে ‘নির্বাচিত’ হয়ে বিরোধীদলীয় নেতাও বনে যান। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন হতে থাকলে দলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিংস পার্টির পরিণতি কখনও সুখকর হয়নি। কারণ যাদের ইশারা বা ইন্ধনে দলগুলো গঠিত হয়, প্রয়োজন ফুরালে তারা কলার খোসার মতো ছুড়ে ফেলতে দ্বিধা করে না। তাহলে, এখনকার কিংস পার্টিগুলোর পরিণতি কী? দেখা যাচ্ছে, এত চেষ্টা করেও তারা মূলধারার রাজনীতিক কাউকে দলে ভেড়াতে পারছে না। এমনকি সব আসনে নামমাত্র প্রার্থী দিতে পারবে কিনা, সেটাও সন্দেহ। আর সবচেয়ে ‘ভালো ফল’ করলেও যে সেটা ফ্রিডম পার্টি বা বিএনএফের মতো একটি বা দুটি আসনে এক মেয়াদের জন্য শিকে ছিঁড়লেও ছিঁড়তে পারে।
আর নির্বাচনে বিরোধী দলের শূন্যস্থান কিংস পার্টি দিয়ে পূরণের উদ্যোগ যে ছাগল দিয়ে হালচাষের ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র– যুগে যুগে কিংস পার্টির পৃষ্ঠপোষকরা তা বুঝতে চায় না কেন?

শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক; সহযোগী সম্পাদক, সমকাল
skrokon@gmail.com
 

আরও পড়ুন

×