ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ ও প্রতিকার

প্রাতিষ্ঠানিক অভিযোগ ও প্রতিকার
×

হোজ্জাতুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৩২

বৈষম্যহীন ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রধান শর্ত সুশাসন। সুশাসনের মূল চালিকাশক্তি হলো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। নাগরিক যখন রাষ্ট্রীয় সেবা নিতে গিয়ে হয়রানি, দুর্নীতি বা অবহেলার শিকার হন, তখন এর ক্ষোভ ও হতাশা শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর নয়, পুরো শাসনব্যবস্থায় গিয়ে পড়ে। এই হতাশা দূর করে প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক পথ হলো শক্তিশালী ও কার্যকর অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা।

আমাদের দেশে সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির ইতিহাস নতুন নয়। ভূমি অফিস, হাসপাতাল, পাসপোর্ট, থানা কিংবা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান; যে কোনো জায়গায় সাধারণ মানুষ সেবা গ্রহণে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হন। নাগরিকের এই বঞ্চনা বা ক্ষোভ প্রকাশের সুনির্দিষ্ট এবং বিশ্বাসযোগ্য কোনো জায়গা না থাকলে সমাজে এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়। রাষ্ট্র যদি নিজেই উদ্যোগী হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলে, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক তার ন্যায্য অধিকার না পাওয়ার অভিযোগ নির্ভয়ে জানাতে পারবেন এবং সমাধান হবে। তবেই সুশাসনের পথ সুগম হবে।

বাংলাদেশে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অধীনে কেন্দ্রীয় অনলাইন অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। কাঠামো হিসেবে এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও দূরদর্শী। কারণ এটি সরকারের বিভিন্ন স্তরকে একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত করেছে। তবে এর পর্যালোচনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদ্যমান অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার কার্যকারিতা এখনও অনেকাংশে আনুষ্ঠানিকতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজালে বন্দি। মাঠ পর্যায়ের অনেক দপ্তরে দায়িত্বরত অভিযোগ নিষ্পত্তি কর্মকর্তা তাঁর দপ্তরের সহকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে পক্ষপাতহীন ভূমিকা পালন করতে পারেন না। এ ছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে এই অনলাইন পোর্টালটি সম্পর্কে সচেতনতার চরম অভাব রয়েছে। যার ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিযোগগুলো নীতিনির্ধারকদের পর্যায়ে পৌঁছে না। কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার না হলে এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে অবহেলাকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান কার্যকর না করা গেলে এই ব্যবস্থা নামমাত্র প্রশাসনিক ডায়েরিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার এ সীমাবদ্ধতা ও আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার ফলেই সম্প্রতি নাগরিক পর্যায় থেকে অভিনব সব ডিজিটাল প্রতিরোধের উদাহরণ দেখা যাচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো তরুণদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা হালের আলোচিত ঘুষ.সাইট এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সোচ্চার প্ল্যাটফর্ম চান্দাবিডি ডটকম। প্রয়াত শিক্ষিকা মায়ের পেনশনের টাকা তুলতে গিয়ে পদে পদে হয়রানি ও ঘুষের শিকার হয়ে এক কিশোরের হাত ধরে তৈরি হওয়া ‘ঘুষ.সাইট’ আজ দেশের সরকারি দপ্তরগুলোর অনিয়ম ও অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেনের একটি উন্মুক্ত পাবলিক লেজারে পরিণত হয়েছে। চালুর মাত্র কয়েক দিনেই এ সাইটে যে হাজার হাজার বেনামি অভিযোগ ও শত শত কোটি টাকার ঘুষের খতিয়ান জমা পড়েছে, তা রাষ্ট্রের বিদ্যমান অভিযোগ দায়ের কাঠামোর ওপর মানুষের অনাস্থাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। ঠিক একইভাবে ব্যবসায়িক ও সামাজিক খাতে চাঁদাবাজি রুখতে নাগরিক উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘চান্দাবিডি ডটকম’-এর মতো সাইটের ব্যাপক জনপ্রিয়তা প্রমাণ করে, জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে চায়। এ সমান্তরাল নাগরিক প্ল্যাটফর্মগুলো আসলে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ব্যর্থতার দিকেই আঙুল তুলছে। 

অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির পুরো প্রক্রিয়াটি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রভাবমুক্ত করতে হলে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী ন্যায়পাল কাঠামো অপরিহার্য। পাশাপাশি যে কোনো অভিযোগ জমা পড়ার পর তা সর্বোচ্চ একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমাধান করার আইনি বাধ্যবাধকতা রাখতে হবে।

হোজ্জাতুল ইসলাম: ডেপুটি কো-অর্ডিনেটর, সিভিক এনগেজমেন্ট, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ

আরও পড়ুন

×