ঢাকা শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আফগানিস্তান

অতীত থেকে তালেবান শিক্ষা নিক

অতীত থেকে তালেবান শিক্ষা নিক
×

সুলতান বারাকাত

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২১ | ১২:০০

তালেবান আফগানিস্তানে ফিরে এসেছে। তারা বলছে- এ যুদ্ধে জয়ী হয়েছে। কিন্তু তালেবানের উত্থান অনেককেই ভীত করছে। তাদের প্রত্যাবর্তন কি পুনরায় আফগানিস্তানকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে? যদিও সাম্প্রতিক সময়ে তালেবানরা শান্তির কথা বলছে। সুতরাং এ শান্তি বজায় রাখতে এবং সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি এড়াতে দুটি করণীয় রয়েছে। প্রথমত, তালেবানকে তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ২০২০ সালের চুক্তি রক্ষা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এ নিশ্চয়তা দিতে হবে- কাবুলে তালেবান কোনো ধরনের সংঘাতে জড়াবে না এবং নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষা করবে।
এটা স্পষ্ট, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের সংক্ষিপ্ত শাসনকালে তালেবানের কর্মকাণ্ডের কারণে অনেকের মাঝেই এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। বস্তুত তারা বিনা বাধায় যেভাবে একের পর এক আফগান শহরের দখল নিয়েছে; শেষ পর্যন্ত রাজধানী কাবুল এবং অবশেষে ক্ষমতার পালাবদল ঘটিয়েছে; সেটা সবার জন্য, এমনকি তালেবান নেতাদের কাছেও বিস্ময়ের। কিন্তু মনে রাখতে হবে, অন্ধ হলে চলবে না; বরং সব দল কিংবা গ্রুপকে নিয়েই একটি শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। তালেবান নিশ্চয়ই সেটা বুঝতে পেরেছে। বিশেষ করে তালেবানের অধিকাংশই পশতুন। তারা অনুধাবন করেছে, শুধু জাতীয়তার এই পরিচয় দিয়ে গোটা আফগানিস্তানে নিয়ন্ত্রণ আনা যাবে না। সে জন্য তারা উত্তরে স্থানীয় উজবেক, তাজিক ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গেও এক ধরনের সমঝোতায় আসে। বলা বাহুল্য, আফগানিস্তানে সামরিক বাহিনী কখনোই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেনি এবং এখনও তারা দেশটির শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভূমিকা পালন করতে সক্ষম নয়।
তবে, তালেবান এত দ্রুত যেভাবে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, এটা তাদের জন্য পরীক্ষা বটে। অনেক জায়গায় তালেবান যোদ্ধারা মানুষকে তাদের ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। অনেকের বাড়িঘর লুট হয়েছে। সরকারি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই চলাকালে বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছে। বাড়িছাড়া হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। এসব ঘটনার শান্তিপূর্ণ সমাধান না হলে দ্বন্দ্ব-সংঘাত আমরা দেখতেই থাকব। কারণ বছরের পর বছর ধরে এ সংঘাতের জ্বালানি তৈরিই আছে।
তালেবান যদি সত্যিকার অর্থেই শান্তিপূর্ণ আফগানিস্তান চায়, তবে সব আফগান জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিতে হবে। আমরা দেখেছি, বিভিন্ন শহর দখল করার সময় কিছু তালেবান নেতৃত্ব সেটা অনুধাবন করে তাদের যোদ্ধাদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে মানুষের সম্পদ রক্ষা করা হয়। আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে প্রবেশ করেও তালেবান নেতারা বলেছেন, তারা 'শান্তির বার্তা' নিয়ে এসেছেন। তালেবান নেতারা সবাইকে শান্ত থাকার জন্য বলেছেন। আলজাজিরা তালেবান নেতাদের সূত্রে জানিয়েছে, কাবুলে তালেবানের সংঘাতে জড়ানোর কোনো উদ্দেশ্য নেই। তালেবানের ভাষায়, শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে আফগান সরকারের সহযোগিতার অপেক্ষা করছে তারা। দুই বছর আগে ২০১৯ সালে জুলাই মাসে দোহায় অনুষ্ঠিত ইন্ট্রা-আফগান কনফারেন্সেও আফগান নাগরিকের শান্তির বিষয়টিই আলোচিত হয়। যদিও অনেক প্রতিবেদনে আমরা হতাহতের ঘটনা দেখেছি। শান্তি বিনষ্টের অনেক ঘটনা তালেবান তরুণ যোদ্ধাদের মাধ্যমে ঘটেছে। এমনটি অব্যাহত থাকলে তালেবানের সঙ্গে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি হুমকিতে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের নাগরিকদের দেশে ফেরা শান্তিপূর্ণ উপায়ে হওয়া প্রয়োজন। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করে। আফগানিস্তানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। তাদের যেসব নাগরিক কাবুল ছাড়তে চান, তাদের অনলাইনে নিবন্ধন করতে বলা হয়।

আমরা দেখেছি, আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি দেশ ছাড়ার পরই তালেবান প্রেসিডেন্ট ভবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকেই দেশ ছাড়তে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, কাবুল দখলের পর দেশ ত্যাগ করতে শহরটির হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দিকে ছুটছেন হাজার হাজার মানুষ। রোববার তালেবান কাবুল দখলের পর থেকেই জনস্রোত দেখা গেছে কাবুল বিমানবন্দরে। আতঙ্কে দেশ ছাড়তে যে কোনো উপায়ে একটি উড়োজাহাজে উঠতে মরিয়া হয়ে পড়েছেন শহরের বাসিন্দারা। লোকজনের চাপ সামলাতে যদিও সেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন নেতা দেশ ত্যাগ করেছেন। আব্দুল রশিদ দোস্তুম উজবেকিস্তানে গেছেন। আতা মোহাম্মদ নূরের দেশত্যাগের খবরও এসেছে। ইসমাঈল খান হেরাতে গৃহবন্দি।
তালেবানের উচিত শান্তি বজায়ের সব পন্থা অবলম্বন করা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যেন সব পক্ষকে সম্মানের সঙ্গে মেনে নেয়। তালেবানকে রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠান সুরক্ষায় ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান যেন তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারে এবং সেখানে যাতে কোনো বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়, সে ব্যবস্থা নিতে হবে। ইরাক ও সিরিয়া থেকে এটাই প্রধান শিক্ষা নেওয়ার বিষয়- অন্তর্বর্তীকালীন কোনো সরকারের সময়েই সশস্ত্র বাহিনী ও সরকারি সেবা বন্ধ করা উচিত নয়।
আমরা মনে করি, তালেবানের তাদের শান্তির প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা উচিত। আফগানিস্তানে শান্তি বজায় রাখতে এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় তালেবান দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করুক। বলা বাহুল্য, এ ক্ষেত্রে একঘরে হয়ে থাকার উপায় নেই। সরকারি সেবা অব্যাহত রাখতে এবং মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও শিক্ষা নিশ্চিত করতে তালেবানের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বিশেষ করে ডোনারদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতেই হবে। তালেবানের বিরুদ্ধে নারীর অধিকার খর্বের অভিযোগ বিস্তর। এ অবস্থায় নারীর অধিকার সুরক্ষাসহ সব রকম মানবাধিকার রক্ষায় তালেবানের শূন্য সহিষুষ্ণতার নীতি গ্রহণ করতেই হবে। বলা বাহুল্য, এটা করতে হবে তালেবান পশ্চিমাদের সঙ্গে শান্তি চুক্তি করেছে- শুধু সে জন্য নয়, বরং তারা যে ইসলামের কথা বলছে, সেই ইসলামের শান্তি ও অধিকারের নীতির অংশ হিসেবে।
পরিচালক, সেন্টার ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড হিউম্যানিটারিয়ান স্টাডিজ, দোহা ইনস্টিটিউট; আলজাজিরা থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর  মাহফুজুর রহমান মানিক

আরও পড়ুন

×