২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মন্ত্রিপরিষদের শপথের মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু। বিদায়ী বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী কিছু প্রকট সমস্যার লিগেসি (দায়) কাঁধে নিয়েই নতুন সরকার অগ্রাধিকার বিবেচনায় বাস্তবায়নের জন্য ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়। সমস্যাগুলোর মধ্যে শীর্ষে ছিল তীব্র যানজট ও লোডশেডিং। অথচ এ দুটি প্রকট সমস্যার কারণে ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে সরকারকে কটাক্ষ ও সমালোচনা শুনতে হয়েছে ব্যাপক। পথ চলতে যানজটে আটকে আছেন; হঠাৎ কারও মুখ থেকে আওয়াজ ভেসে এলো 'ডিজিটাল যানজট'। রেস্টুরেন্টে বসে আছেন হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। অমনি কেউ বলে উঠল 'ডিজিটাল লোডশেডিং'।

যানজট ও লোডশেডিংয়ের জন্য কারা দায়ী, তা সমালোচকদের বিবেচনায় ছিল না। আঁতুড়ঘরে থাকা ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি ছিল তাদের তির্যক বাক্যবাণের লক্ষ্যবস্তু। কিন্তু আজকের বাস্তবতা কী বলে? ২০০৯ সালে যে শিশুটি হাঁটি হাঁটি পা পা করে পথ চলতে শুরু করে; ২০২১ সালে সে কিশোর। ডিজিটাল বাংলাদেশ নামক সেই কিশোরের সাফল্য দেশের সীমানা ছাড়িয়েছে। জন্ম দিয়েছে অবাক বিস্ময়ের। ফিলিপাইন, তুরস্ক, সোমালিয়াসহ বিশ্বের ১৭টি দেশ ডিজিটাল বাংলাদেশের ১১টি বেস্ট প্র্যাকটিস মডেল তাদের নিজ দেশে অনুকরণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এগুলো হচ্ছে- 'ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ফর স্কিলস, এডুকেশন, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ (এনআইএসই), ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম একশপ, মাইগভ, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), গেম বেজড এডুকেশন, ডিজিটাল সার্ভিস ডিজাইন ল্যাব (ডিএসডিএল), ডিজিটাল সেন্টার, কানেক্ট এডুকেশন প্ল্যাটফর্ম, ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম মুক্তপাঠ, ন্যাশনাল কভিড ড্যাশবোর্ড, ভ্যাকসিন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম প্ল্যাটফর্ম 'সুরক্ষা।

এর মধ্যে দুটি মডেল সম্প্রতি (১১-১৪ নভেম্বর ২০২১) ঢাকায় অনুষ্ঠিত আইসিটির বিশ্ব সম্মেলন ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অন ইনফরমেশন টেকনোলজি (ডব্লিউসিআইটি) ২০২১ উপলক্ষে আয়োজিত 'এনস্যুরিং এন ইনক্লুসিভ, ট্রাস্টেড অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডিজিটাল সোসাইটি' শীর্ষক এক সেমিনারে ফিলিপাইন ও সোমালিয়ার কাছে হস্তান্তরের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলাম। ওই অনুষ্ঠানেই 'মাইগভ' বা 'আমার সরকার' শীর্ষক এক ঠিকানা থেকে সব সরকারি সেবা প্রদানের মডেল ফিলিপাইনের রাষ্ট্রদূত এবং বেকার ও চাকরিদাতাদের মধ্যে সংযোগের প্ল্যাটফর্ম 'এনআইএসই' সোমালিয়ার যোগাযোগ ও প্রযুক্তিমন্ত্রী আদ্রিস শেখ আহমেদের কাছে হস্তান্তর করে আইসিটি বিভাগের অ্যাসপায়ার টু ইনোভেট (এটুআই) প্রোগ্রাম। সেমিনারে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে ফিলিপাইনের স্থানীয় সরকারমন্ত্রী নাগিব সিনারিম্ব বলেন, 'আমরা অভিভূত যে, বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরে নাগরিক সেবাকেন্দ্রিক কিছু টেকসই মডেল তৈরি হয়েছে। তৃণমূলে স্থাপিত ডিজিটাল সেন্টারগুলো নাগরিক সেবা প্রদানে অত্যন্ত কার্যকর কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। আমরা ফিলিপাইনে বাংলাদেশের অন্যতম বেস্ট প্র্যাকটিস মডেল মাইগভ অবিকল বাস্তবায়ন করতে চাই।'

সেমিনারে শারীরিকভাবে উপস্থিত কয়েকজন বিদেশির সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল। জানা গেল বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের সাফল্যে তাদের বিস্ময়ের কারণ। প্রথমেই আসে 'বটম আপ অ্যাপ্রোচ' পদ্ধতি অনুসরণে গ্রামের মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি) এবং পরে পৌরসভা, মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন, ওয়ার্ড মিলে আট হাজার ডিজিটাল সেন্টার স্থাপনের কথা। নাগরিকদের বিশেষ করে গ্রামের মানুষকে সেবা প্রদানে ডিজিটাল সেন্টার এবং এক ঠিকানায় সেবা পাওয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের বেস্ট প্র্যাকটিস মডেল হয়ে ওঠার ঘটনা তাদের মুগ্ধ করে। বিদেশিদের কাছে গ্রাম ও শহরের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য হ্রাসে এ এক অনন্য উদ্যোগ। কারণ ২০০৩ সালে জেনেভায় আয়োজিত জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড সামিট অন ইনফরমেশন সোসাইটির ঘোষণার চেতনার সঙ্গে এটি পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ। ঘোষণায় বলা হয়, 'তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রয়োগের মাধ্যমে নারী এবং গরিব ও প্রান্তিক সাধারণ মানুষ যারা গ্রামে বসবাস করে তাদের ক্ষমতায়ন ও জীবনমানের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।'


ডিজিটাল সেন্টার স্থাপনসহ গ্রামে তথ্যপ্রযুক্তির সম্প্রসারণ করে বাংলাদেশ তা সফলভাবেই সম্পন্ন করেছে। যদিও আইসিটিতে প্রবেশগম্যতা, অভিযোজন এবং সক্ষমতা নিশ্চিতের মাধ্যমে ডিজিটাল বৈষম্য হ্রাসের উদ্যোগগুলোর সুফল পেতে আরও খানিকটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের অভিযাত্রায় বাংলাদেশের বেস্ট প্র্যাকটিস মডেল বিশেষ করে বিদেশে ছড়িয়ে যাওয়ার মূলে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণ ও সুচিন্তিত উদ্যোগ। ২০১৬ সালে জাতিসংঘের ৭১তম অধিবেশনের ফাঁকে তিনি সংস্থাটির সদর দপ্তরে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন ও সরকারি সেবার চ্যালেঞ্জগুলোর অভিনব সমাধান চিহ্নিত ও তা স্কেলআপ করে দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে বিনিময়ে পাবলিক সার্ভিস ইনোভেশনের ওপর একটি কোলাবোরেটিভ সাউথ-সাউথ নেটওয়ার্ক গঠনের প্রস্তাব করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে তুরস্কে গ্লোবাল সাউথ-সাউথ ডেভেলপমেন্ট (জিএসএসডি) এক্সপোতে বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘের অফিস ফর সাউথ-সাউথ কো-অপারেশন (ইউএনওএসএসসি) যৌথভাবে সাউথ-সাউথ নেটওয়ার্ক ফর পাবলিক সার্ভিস ইনোভেশন (এসএসএন ফর পিএসআই) চালু করা হয়। এর আওতায় বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি ১১টি বেস্ট প্র্যাকটিস মডেল দক্ষিণের ১৭টি দেশে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। আর বাংলাদেশে বাস্তবায়িত হচ্ছে টোগোর মডেল 'সোশ্যাল সেফটি নেট'।

বাংলাদেশ মাত্র ১৩ বছরে অন্য দেশের অনুকরণ করার মতো ভালো মডেল কীভাবে তৈরি করতে সক্ষম হলো- এ প্রশ্ন অনেকেরই। এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। যে কোনো কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে প্রয়োজন বিজ্ঞান, প্রযুক্তিমনস্ক ও দূরদর্শী নেতৃত্ব, রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষতা, সুপরিকল্পিত কার্যক্রম এবং জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আন্তরিকতা। এর সবই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাঝে বিদ্যমান থাকায় ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে সরকার এতটা সফল হতে সক্ষম হয়েছে। তবে এ কথা অনস্বীকার্য, ডিজিটাল বাংলাদেশ 'রূপকল্প ২০২১'-এর মূল উপজীব্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা এবং এর বাস্তবায়ন নকশা প্রণয়নে খ্যাতিমান তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সজীব ওয়াজেদ জয়ের যুক্ততা এবং বাস্তবায়নে সক্রিয়তায় তৃণমূল পর্যায়ে আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা দ্রুততায় পৌঁছে যায়। প্রসঙ্গত, গ্রামগুলোকে ইন্টারনেট এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নেটওয়ার্কের আওতায় এনে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পরিকল্পনা গ্রহণের দিক থেকে বাংলাদেশ ভারতের চেয়েও এগিয়ে। ডিজিটাল বিপ্লবে ভারতের ৫১ বছরের পথ চলায় প্রায় আড়াই লাখ গ্রামকে ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রযুক্তি নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকার 'ডিজিটাল ইন্ডিয়া প্ল্যান' ঘোষণা করে। আর বাংলাদেশ তা করে ২০০৯ সালে। ২০২১ সালে এসে বাংলাদেশ লাস্ট মাইল সলিউশন হিসেবে ফাইবার অপটিক কেবল লাইন টেনে গ্রামগুলোতে উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধাসংবলিত ডিজিটাল সেন্টার প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে; যা বাস্তবায়িত হলে গ্রামের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হবে।

গতকাল ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবস। ডিজিটাল বাংলাদেশের প্রায় ১৩ বছরের পথ চলার মধ্যেই ক্ষিপ্রগতিতে আবির্ভূত হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব। তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। প্রথমত, গতির দিক থেকে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে প্রায় সবকিছুই দ্রুতগতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রচলিত নানা ধরনের কাজের বিলুপ্তি ঘটতে শুরু করেছে। দ্বিতীয়ত, সুযোগ। অগ্রগামী প্রযুক্তির ব্যাপক প্রভাবের কারণে নতুন নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজন এসব প্রযুক্তির ব্যবহার ও দক্ষতা উন্নয়ন। তৃতীয়ত, পদ্ধতিগত প্রভাব। অগ্রগামী প্রযুক্তির প্রভাবে প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটছে। ফলে স্টার্টআপ উদ্ভাবনের মতো অনেক ধরনের ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। এ থেকে প্রতীয়মান, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে দেশ পিছিয়ে পড়বে। বাংলাদেশের ইতিবাচক দিক হচ্ছে সরকারের নীতিনির্ধারকরা আগেভাগেই এ নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন। ডব্লিউসিআইটি-২০২১ সম্মেলনে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরার সময় সজীব ওয়াজেদ জয়কে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসী মনে হয়েছে। তিনি বলেন, 'বাংলাদেশ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে নেতৃত্ব দেবে।' তার এই আত্মবিশ্বাসী মনোভাবের মূলে রয়েছে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে সাফল্য।

অজিত কুমার সরকার: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক