কূটনীতি
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পর-রাষ্ট্রপ্রীতি
×
মোশতাক আহমেদ
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২২ | ১২:০০
শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে যা যা দরকার, তা করতে ভারত সরকারকে অনুরোধ করেছেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। কোনো রাখঢাক নেই, প্রকাশ্যেই বলেছেন। কোনো ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়ও নয়, রীতিমতো জনসমাবেশে। বলেছেন বেশ গর্বের সঙ্গেই। ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামের জে এম সেন হলে জন্মাষ্টমী উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হলভর্তি মানুষের সামনে তিনি এ কথা বলেছেন। তাই একে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো অবকাশই নেই। রীতিমতো 'ব্ল্যাংক চেক'- যা যা করা দরকার তার সবই যেন করা হয়! যদিও কী কী করা দরকার, তার বিশদ তিনি জানাননি। এটি মনে হয় দ্বিতীয় পক্ষ, অর্থাৎ ভারত কর্তৃপক্ষের ওপরই ছেড়ে দিয়েছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে 'স্লিপ অব টাং' মনে করার কোনো কারণ নেই। এ কারণেই নেই যে, যা তিনি বলেছেন তা তাঁর আচরণের ধারাবাহিকতা বা কনসিস্টেনসি বজায় রেখেই বলেছেন। ঠিক তিন বছর আগে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে ভারতে গিয়ে তিনি দুই দেশের সম্পর্ককে 'স্বামী-স্ত্রীর মতো' বলে উল্লেখ করেছিলেন। অবশ্য কে যে স্বামী আর কে যে স্ত্রী, তা স্পষ্ট না করলেও বুদ্ধিমানের অনুমান ঠিকই বুঝে নিয়েছিল সেদিন। কিন্তু এই যে ব্ল্যাংক চেক দেওয়ার কথা তিনি প্রকাশ্যে বলে দিয়েছেন, এ কি কেবলই 'কথার কথা'? তিনি যেমনটি কয়েক দিন আগেই উল্লেখ করেছিলেন 'বাংলাদেশের মানুষ বেহেশতে আছে' মন্তব্যের পর? রাজনীতির বিশ্নেষণে এটাকে 'কথার কথা' বা স্লিপ অব টাং বলে মেনে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। নেই এ কারণেই যে, এর সঙ্গে একটা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন জড়িত। কোনো দেশকে এভাবে ব্ল্যাংক চেক দেওয়ার অধিকার কারও নেই; হতে পারেন তিনি মন্ত্রী বা অন্য কিছু।
এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রতিবেশী ভারতের সরকার ও জনগণ অকৃপণভাবে আমাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। সে কারণে আমরা অবশ্যই ভারতের কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমাদের দেশে কে ক্ষমতায় আসবে বা না আসবে, কোন দল কীভাবে ক্ষমতা ধরে রাখবে বা টিকে থাকবে, তাও তারা ঠিক করে দেবে।
অবশ্য দুর্জনরা সব সময়ই বলে আসছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রতিবেশী ভারতের একটা 'বিশেষ' সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ সম্পর্কের ইঙ্গিত ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির লেখাতেও কিছুটা ফুটে উঠেছে। সমকালীন ভারতীয় রাজনীতির 'চানক্য' বলে প্রসিদ্ধি পাওয়া প্রণব মুখার্জি তাঁর 'দ্য কোয়ালিশন ইয়ারস' বইয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর পরোক্ষ খবরদারির কথা অকপটে ব্যক্ত করে গেছেন। বিশেষ করে বলেছেন 'ওয়ান ইলেভেন'-পরবর্তী মইন ইউ আহমেদের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে কীভাবে তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। না, এতে দোষের কিছু দেখছি না। কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ ধরনের ঘটনার অনেক নজির রয়েছে। তবে এসবই হয় পর্দার আড়ালে, যেমনটি প্রণব মুখার্জি করেছিলেন। নিশ্চয়ই তিনি কোনো ঘোষণা দিয়ে করেননি? কিন্তু মোমেন সাহেব যেটি করেছেন তা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে। শুধু তাই নয়, একেবারে ব্ল্যাংক চেক, যা বিশ্ব কূটনীতির ইতিহাসে বিরল।
মোমেন সাহেব তো বলেই খালাস। হয়তো শিগগিরই তিনি তাঁর মতো করে এর একটা জবাবও দেবেন। কিন্তু তাতেই কি সব চুকে যাবে? এই যে দুর্জনরা হরহামেশা বলে থাকে, আওয়ামী লীগ হলো ভারতের হাতের পুতুল- একেই কি তিনি প্রতিষ্ঠিত করে দিলেন না? অবশ্য মানুষ তো আরও কত কথাই বলে! ২০১৮-এর মধ্যরাতের নির্বাচনও নাকি দিল্লির সাউথ ব্লকের প্রেসক্রিপশন মতোই সংঘটিত হয়েছিল- এমন কথাও লোকজন বলে। মোমেন সাহেবের বক্তব্য কি কিছুটা হলেও এসব অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করবে না?
প্রসঙ্গক্রমে আরও একটা বিষয় স্মর্তব্য- আর মাত্র এক বছর পরই দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে বিভিন্ন দল তাদের নিজ নিজ সংগঠনকে গুছিয়ে নিতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও শোডাউনও শুরু হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ তথা ভোটাররাও হিসাব কষতে শুরু করে দিয়েছেন আগামী নির্বাচন নিয়ে। এই পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছে বর্তমান সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য 'যা যা দরকার' তা করার আহ্বান কী বার্তা দিচ্ছে? তাঁর এই আবেদন বা কান্না দেশের সার্বভৌমত্বের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় কি? এই কথার পর মানুষ যদি ভাবতে শুরু করে যে সরকার তার টিকে থাকার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে, তা কি খুব একটা অমূলক হবে? মনে হয় না। মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর তারা তো ভাবতেই পারে সরকারের চলার শক্তি শেষ হয়ে গেছে, সেজন্যই ভিন্ন রাষ্ট্রের সহায়তা চাইছে।
প্রশ্ন তো একটা থাকেই- এই যে এতকাল ধরে উন্নয়নের ঢাক বাজানো হচ্ছে ডিজিটাল, অ্যানালগ সব মাধ্যমে, এসব কি কোনো কাজেই লাগছে না? তা ছাড়া মানুষ এ-ও ভাবতে পারে, বিদেশি রাষ্ট্রই যদি সরকার টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তাহলে তো ভোট, নির্বাচন- এসবের কোনো দরকার নেই। শুধু শুধু হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে নির্বাচন অনুষ্ঠানেরই বা দরকার কী? প্রশ্ন হলো, এভাবেই কি ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত এ দেশের মানুষ ভিন্ন দেশের দিকে তাকিয়ে থাকবে তার সরকার গঠন বা টিকিয়ে রাখার জন্য? সম্মানের কথাটা না হয় বাদই দিলাম। কেউ যদি প্রশ্ন করেই বসে- ড. মোমেন কি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাকি পর কোনো রাষ্ট্রের মন্ত্রী, কী জবাব দেবেন? এটাই এখন দেখার বিষয়।
মোশতাক আহমেদ :কলাম লেখক; জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে 'স্লিপ অব টাং' মনে করার কোনো কারণ নেই। এ কারণেই নেই যে, যা তিনি বলেছেন তা তাঁর আচরণের ধারাবাহিকতা বা কনসিস্টেনসি বজায় রেখেই বলেছেন। ঠিক তিন বছর আগে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে ভারতে গিয়ে তিনি দুই দেশের সম্পর্ককে 'স্বামী-স্ত্রীর মতো' বলে উল্লেখ করেছিলেন। অবশ্য কে যে স্বামী আর কে যে স্ত্রী, তা স্পষ্ট না করলেও বুদ্ধিমানের অনুমান ঠিকই বুঝে নিয়েছিল সেদিন। কিন্তু এই যে ব্ল্যাংক চেক দেওয়ার কথা তিনি প্রকাশ্যে বলে দিয়েছেন, এ কি কেবলই 'কথার কথা'? তিনি যেমনটি কয়েক দিন আগেই উল্লেখ করেছিলেন 'বাংলাদেশের মানুষ বেহেশতে আছে' মন্তব্যের পর? রাজনীতির বিশ্নেষণে এটাকে 'কথার কথা' বা স্লিপ অব টাং বলে মেনে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। নেই এ কারণেই যে, এর সঙ্গে একটা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন জড়িত। কোনো দেশকে এভাবে ব্ল্যাংক চেক দেওয়ার অধিকার কারও নেই; হতে পারেন তিনি মন্ত্রী বা অন্য কিছু।
এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রতিবেশী ভারতের সরকার ও জনগণ অকৃপণভাবে আমাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। সে কারণে আমরা অবশ্যই ভারতের কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমাদের দেশে কে ক্ষমতায় আসবে বা না আসবে, কোন দল কীভাবে ক্ষমতা ধরে রাখবে বা টিকে থাকবে, তাও তারা ঠিক করে দেবে।
অবশ্য দুর্জনরা সব সময়ই বলে আসছে, বাংলাদেশে বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে প্রতিবেশী ভারতের একটা 'বিশেষ' সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ সম্পর্কের ইঙ্গিত ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির লেখাতেও কিছুটা ফুটে উঠেছে। সমকালীন ভারতীয় রাজনীতির 'চানক্য' বলে প্রসিদ্ধি পাওয়া প্রণব মুখার্জি তাঁর 'দ্য কোয়ালিশন ইয়ারস' বইয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর পরোক্ষ খবরদারির কথা অকপটে ব্যক্ত করে গেছেন। বিশেষ করে বলেছেন 'ওয়ান ইলেভেন'-পরবর্তী মইন ইউ আহমেদের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে কীভাবে তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। না, এতে দোষের কিছু দেখছি না। কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ ধরনের ঘটনার অনেক নজির রয়েছে। তবে এসবই হয় পর্দার আড়ালে, যেমনটি প্রণব মুখার্জি করেছিলেন। নিশ্চয়ই তিনি কোনো ঘোষণা দিয়ে করেননি? কিন্তু মোমেন সাহেব যেটি করেছেন তা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে। শুধু তাই নয়, একেবারে ব্ল্যাংক চেক, যা বিশ্ব কূটনীতির ইতিহাসে বিরল।
মোমেন সাহেব তো বলেই খালাস। হয়তো শিগগিরই তিনি তাঁর মতো করে এর একটা জবাবও দেবেন। কিন্তু তাতেই কি সব চুকে যাবে? এই যে দুর্জনরা হরহামেশা বলে থাকে, আওয়ামী লীগ হলো ভারতের হাতের পুতুল- একেই কি তিনি প্রতিষ্ঠিত করে দিলেন না? অবশ্য মানুষ তো আরও কত কথাই বলে! ২০১৮-এর মধ্যরাতের নির্বাচনও নাকি দিল্লির সাউথ ব্লকের প্রেসক্রিপশন মতোই সংঘটিত হয়েছিল- এমন কথাও লোকজন বলে। মোমেন সাহেবের বক্তব্য কি কিছুটা হলেও এসব অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করবে না?
প্রসঙ্গক্রমে আরও একটা বিষয় স্মর্তব্য- আর মাত্র এক বছর পরই দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে বিভিন্ন দল তাদের নিজ নিজ সংগঠনকে গুছিয়ে নিতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও শোডাউনও শুরু হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ তথা ভোটাররাও হিসাব কষতে শুরু করে দিয়েছেন আগামী নির্বাচন নিয়ে। এই পরিপ্রেক্ষিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছে বর্তমান সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য 'যা যা দরকার' তা করার আহ্বান কী বার্তা দিচ্ছে? তাঁর এই আবেদন বা কান্না দেশের সার্বভৌমত্বের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় কি? এই কথার পর মানুষ যদি ভাবতে শুরু করে যে সরকার তার টিকে থাকার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে, তা কি খুব একটা অমূলক হবে? মনে হয় না। মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর তারা তো ভাবতেই পারে সরকারের চলার শক্তি শেষ হয়ে গেছে, সেজন্যই ভিন্ন রাষ্ট্রের সহায়তা চাইছে।
প্রশ্ন তো একটা থাকেই- এই যে এতকাল ধরে উন্নয়নের ঢাক বাজানো হচ্ছে ডিজিটাল, অ্যানালগ সব মাধ্যমে, এসব কি কোনো কাজেই লাগছে না? তা ছাড়া মানুষ এ-ও ভাবতে পারে, বিদেশি রাষ্ট্রই যদি সরকার টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব গ্রহণ করে, তাহলে তো ভোট, নির্বাচন- এসবের কোনো দরকার নেই। শুধু শুধু হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে নির্বাচন অনুষ্ঠানেরই বা দরকার কী? প্রশ্ন হলো, এভাবেই কি ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত এ দেশের মানুষ ভিন্ন দেশের দিকে তাকিয়ে থাকবে তার সরকার গঠন বা টিকিয়ে রাখার জন্য? সম্মানের কথাটা না হয় বাদই দিলাম। কেউ যদি প্রশ্ন করেই বসে- ড. মোমেন কি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাকি পর কোনো রাষ্ট্রের মন্ত্রী, কী জবাব দেবেন? এটাই এখন দেখার বিষয়।
মোশতাক আহমেদ :কলাম লেখক; জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা
- বিষয় :
- কূটনীতি
- পররাষ্ট্রমন্ত্রী
- মোশতাক আহমেদ