ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অর্থনীতি

বাংলাদেশ থেকে পুঁজি পাচারের ইতিবৃত্ত

বাংলাদেশ থেকে পুঁজি পাচারের ইতিবৃত্ত
×

মইনুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২২ | ১৩:৪৯

গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বড়সড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদেশে পুঁজি পাচার। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার প্রতি বছর যা হওয়ার কথা, এর চেয়ে ১ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ কম হচ্ছে পুঁজি পাচার ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায়। এই ক্রমবর্ধমান পুঁজি পাচারের কারণে প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ-জিডিপির অনুপাত ২৪ শতাংশের আশপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে, যদিও সরকারি বিনিয়োগ-জিডিপির অনুপাত বেড়ে ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার তেমন কমছে না। সাম্প্রতিক সময়ে আমদানির লাগামহীন প্রবৃদ্ধি, বাণিজ্য ঘাটতির বিপজ্জনক স্ম্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ধস এবং ডলারের কার্ব মার্কেটে দামের উল্লম্ম্ফনের পেছনেও প্রধান কারণ বিদেশে পুঁজি পাচার বেড়ে যাওয়া। এই পুঁজি পাচারকারীরা জাতির 'এক নম্বর দুশমন'। তারা যদি ব্যাপক হারে বিদেশে পুঁজি পাচার না করত তাহলে অর্থনীতি বর্তমান সংকটে পড়ত না। সে জন্য শুধু সরকার নয়, দেশ-বিদেশে অবস্থানকারী সব বাংলাদেশির কর্তব্য এদের ঘৃণা, বয়কট এবং প্রতিহত করা।

অনেকেরই হয়তো জানা নেই, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ সালে বাংলাকে উপনিবেশ করার আগে কয়েকশ বছর ধরে ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রাচুর্যময় অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত ছিল তদানীন্তন বাংলা। এই স্বীকৃতি প্রথম দিয়েছিলেন বিশ্বখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে বতুতা, যিনি বাংলার সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের আমলে এ দেশে এসেছিলেন। দ্বিতীয় স্বীকৃতিটি এসেছিল মোগল সম্রাট আকবরের 'নবরত্ন' সভার খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ আবুল ফজলের লিখিত ইতিহাসে। তাঁর রচিত আকবরনামায় তিনি স্বীকার করেছেন, সম্রাট আকবরের শাসনাধীন ভারতবর্ষে সবচেয়ে প্রাচুর্যময় প্রদেশ ছিল 'সুবা বাংলা'। তৃতীয় স্বীকৃতি দিয়েছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেবের ফরাসি 'কোর্ট ডাক্তার' ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ার। বার্নিয়ারের মতে, সপ্তদশ শতাব্দীতে বিশ্বে সবচেয়ে প্রাচুর্যময় অঞ্চল হিসেবে মিসরের যে সুনাম ছিল, সে সুনামের প্রকৃত দাবিদার ছিল বাংলা। কিছুদিনের মধ্যেই আরেক ফরাসি ব্যবসায়ী ট্যাভারনিয়ার বার্নিয়ারকে এ বিষয়ে সমর্থন জানিয়েছিলেন। ট্যাভারনিয়ার চামড়ার ব্যবসার জন্য বেশ কয়েকবার বাংলায় আসার কারণে এই অঞ্চল সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। কার্ল মার্কস বার্নিয়ারের এই স্বীকৃতির উদ্ধৃতি দেওয়ায় বিশ্বে তা বহুলপরিচিতি অর্জন করেছে। ১৭৫৭ সালে বাংলা দখল করার পর ১০০ বছর ধরে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারী, সিপাহসালার ও সিপাহিরা জাহাজের পর জাহাজ বোঝাই করে বাংলা থেকে ধনসম্পদ ও সোনা-রুপা লুণ্ঠন করে ইংল্যান্ডে নিয়ে গেছে। তাদের এই পুঁজি পাচারের পরিমাণ এতই বেশি ছিল যে, লুণ্ঠিত সামগ্রীবাহী জাহাজগুলো লন্ডন বন্দরে খালাস করার সময় তিন মাসের একটি জাহাজ-জট সৃষ্টি হয়েছিল বলে প্রমাণ করেছেন ব্রুক অ্যাডামস নামে এক মার্কিন ইতিহাসবিদ। আরও অনেক ঐতিহাসিকের গবেষণার মাধ্যমে এই বাংলা লুণ্ঠনের কাহিনি প্রমাণিত হওয়ার ফলে এখন ইতিহাসে এই লুণ্ঠন পর্বকে 'দ্য বেঙ্গল লুট' নামে অভিহিত করা হচ্ছে। ১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতার নামে আবার ২৪ বছরের জন্য পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ উপনিবেশে পরিণত হওয়ায় আরেক দফা লুণ্ঠন, বঞ্চনা ও পুঁজি পাচারের শিকার হয়েছিল তদানীন্তন পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তান। বর্তমান সময়ের পুঁজি পাচারকারীদের আমি 'জাতির এক নম্বর দুশমন' বলছি। তাদের আমি লুটেরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও পাঞ্জাবি-পাকিস্তানিদের 'ভাবাদর্শিক দোসর' মনে করি। স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে আগাগোড়াই প্রধান বাধা দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭৩ সাল থেকে দুর্নীতি ক্রমেই বিস্তার লাভ করলেও বঙ্গবন্ধুর শাসনকালে দুর্নীতি ছিল ব্যতিক্রমী আচরণ; রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রে তখনও ওটা নিয়মে পরিণত হয়নি। কিন্তু সমরপ্রভু জিয়া নিজেকে সততার পরাকাষ্ঠা হিসেবে জাহির করলেও তাঁর শাসনামল থেকে দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠন বাড়তে শুরু করে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি স্বৈরাচার এরশাদ আমলে ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। ১৯৯১ সালে ভোটের রাজনীতি চালু হওয়ার পর গত ৩১ বছর একই প্রক্রিয়া আরও জোরদার হয়েছে।


গত শতকের সত্তর ও আশির দশকেও বিদেশে পুঁজি পাচার বড় সমস্যা হয়ে ওঠেনি। প্রবাসীদের রেমিট্যান্সও বঙ্গবন্ধুর আমলের অর্থনীতির জন্য বড় ফ্যাক্টর হয়ে ওঠেনি। '৭৩-এ প্রথম বিশ্বে তেল সংকটের পর মধ্যপ্রাচ্যে নগর উন্নয়নযজ্ঞ শুরু হলে সেখানে শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ তৈরি হয়। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স দ্রুত বাড়তে শুরু করে। কিন্তু তখন এরশাদ সরকারের আমদানি উদারীকরণ নীতিমালা ভারতের তুলনায় প্রায় ছয় বছর আগে বাস্তবায়িত হওয়ায় দেশের অর্থনীতিতে চোরাচালান গুরুতর সমস্যায় পরিণত হয়। ফলে 'হুন্ডি সিস্টেম' জনপ্রিয় হতে শুরু করে। এর পর থেকে বিদেশে বাংলাদেশিদের অভিবাসনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুঁজি পাচারও ক্রমে বেড়ে এখন অর্থনীতির প্রধান সমস্যায় পরিণত হয়েছে। ২০২১ সালে ১ কোটি ৩০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি বৈধ পথে ২১ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন, কিন্তু তা ছিল আগের বছরের ২৪ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৫ শতাংশ কম। হুন্ডি ব্যবসা চাঙ্গা হওয়াটাই ফরমাল চ্যানেলে রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার প্রধান কারণ। গত ১১ সেপ্টেম্বর সরকারের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের (সিআইডি) বরাত দিয়ে দেশের পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, শুধু হুন্ডি প্রক্রিয়ায় দেশ থেকে বর্তমানে বছরে ৭৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। (মানে সিআইডির দাবি- ৭৫ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণের বৈদেশিক মুদ্রা দেশেই আসছে না। অথচ এই পরিমাণ টাকা হুন্ডি প্রক্রিয়ায় দেশ থেকে বিদেশে পুঁজি পাচারকারীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে জমা হয়ে যাচ্ছে)। এ পর্যায়ে বলা প্রয়োজন, বৈধ পথে হোক কিংবা হুন্ডি সিস্টেমে, যেভাবেই দেশে রেমিট্যান্সের টাকা আসুক- এই টাকার সিংহভাগ প্রধানত নিরাপত্তার জন্য ব্যাংকগুলোতে আমানত হিসেবে জমা পড়বেই। সে জন্যই আমরা দেখছি বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা বেড়ে এখন ৬৪ হলেও সেগুলোতে আমানতের ঢল অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী ব্যাংকগুলোতে প্রায় ১৪ লাখ কোটি টাকার আমানত রয়েছে, অথচ খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণও হয়তো এখন ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে। এতে 'উদ্বৃত্ত আমানত' মাঝে মাঝে এ দেশের ব্যাংকিং খাতের সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেটা বিদেশে পাচার করার যে সনাতন সংস্কৃতি আমদানি বাণিজ্যের 'ওভার ইনভয়েসিং' এবং রপ্তানি বাণিজ্যের 'আন্ডার ইনভয়েসিং' পদ্ধতির প্রায় একচেটিয়া দখলে ছিল, তার সঙ্গে জোরেশোরে যুক্ত হলো দুর্নীতিবাজ সামরিক-সিভিল আমলা, রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী এবং নব্য ব্যাংক মালিকদের হুন্ডি প্রক্রিয়ায় পুঁজি পাচারের মহাযজ্ঞ। সাম্প্রতিককালে ব্যাংকের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর জটিল পদ্ধতি অনেকখানি সহজ হয়ে গেছে। কিন্তু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিপ্লবের কারণে রেমিট্যান্স পাঠানোর হুন্ডি সিস্টেমও একেবারেই সহজ ও উন্নত হয়ে গেছে। উপরন্তু, এই চার দশকে পুঁজি পাচারের প্রয়োজনে হুন্ডি ডলারের একটা বিশাল চাহিদা কাঠামো সম্প্রসারিত হয়ে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে জালের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। অতিসম্প্রতি বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন, এতে নাকি বিদেশে পুঁজি পাচার কমবে। আসলে পুঁজি পাচারকে আড়াল করবে এই সিদ্ধান্ত। দেশীয় পুঁজি লুটেরাদের বিদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করলে পুঁজি পাচার বাড়বে বৈ কমবে না।

ড. মইনুল ইসলাম: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ এবং অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×