ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শুধু কথায় বাজারে স্বস্তি আসবে না

দ্রব্যমূল্য

শুধু কথায় বাজারে স্বস্তি আসবে না
×

সুলতান মাহমুদ রানা

সুলতান মাহমুদ রানা

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ২৩:৪৭

দেশে সাধারণ মানুষের অন্যতম শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার কারণে দৈনন্দিন স্বাভাবিক জীবনযাপনে মানুষ হোঁচট খাচ্ছে। সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করে সহনীয় পর্যায়ে রাখা। নির্বাচনী ইশতেহারেও এ বিষয়টির প্রাধান্য ছিল। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সহনীয় পর্যায়ে পৌঁছানো দূরে থাক, এখন পর্যন্ত ঊর্ধ্বগতি চলমান।
অল্প কয়েক দিন পরই পবিত্র রমজান শুরু হতে যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের অসংখ্যবার দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে আহ্বান জানানো হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী এক মাস ধরে বিভিন্ন সভায় বলে যাচ্ছেন, পুলিশ দিয়ে অভিযান চালিয়ে বাজার ব্যবস্থা ভালো করা সম্ভব নয়। তিনি বরং ব্যবসায়ীদের সততা এবং নায্যতার সঙ্গে চলতে আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু আমার মনে হয়, পরিস্থিতি এতটাই নাজুক এবং কালোবাজারি সিন্ডিকেট কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত, শুধু মুখের কথায় চিড়া ভেজার সুযোগ নেই।

যেভাবে দ্রব্যমূল্য নাগালের বাইরে, তাতে সাধারণ জনগণের জীবনযাপনে নাভিশ্বাস উঠছে। সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে প্রায়ই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে বিরোধীদের দোষারোপ করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা যদি সেটিই হয়, তাহলে সরকারের নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা আরও পরিষ্কার ও সুস্পষ্ট হওয়া উচিত। বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী সম্প্রতি উল্লেখ করেছেন, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্রব্যমূল্যকে কেন্দ্র করে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি এক ধরনের অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র করেছিল।’ গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীরা জড়িত থাকতে পারে।’ বিরোধীদের কারসাজি নিয়ে তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন। এ ক্ষেত্রে আমার প্রশ্ন হলো, কেন তাদের সেই ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে দ্রব্যমূল্য জনগণের সহনীয় মাত্রায় এখনও আনা সম্ভব হচ্ছে না? বিরোধীদের ষড়যন্ত্র সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া এই মুহূর্তে সরকারের কাছে খুব কঠিন কাজ হওয়ার কথা নয়। কারণ, বিরোধীদের কোমর এমনিতেই ভেঙে গেছে।

রমজানের আগে বাজারে প্রায় প্রতিবছর নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। সংবাদ সূত্রে জানতে পারলাম, এ বছর নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে রাখতে বহুমুখী পরিকল্পনা নিয়ে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে সরকারের তিনটি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তর। রোজার আগে দামের রাশ টানতে চাল, চিনি, ভোজ্যতেল ও খেজুরের আমদানি শুল্ক কমিয়েছে সরকার। কিন্তু সরকারের ঘোষণার এক সপ্তাহ পার হলেও বাজারে তার কোনো প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। অতীতের মতো এবারও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে দাম বেড়ে যাচ্ছে সব ভোগ্যপণ্যের। এতে সরকারের নানামুখী সুবিধার ফায়দা নিচ্ছে তারা। ফলে সরকারের বহুমুখী সুবিধার সুফল পাচ্ছে না সাধারাণ মানুষ। সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। সাধারণ জনগণ দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকারের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বাজারে গেলেই শোনা যায় সরকারের প্রতি তির্যকপূর্ণ মতামত। সরকার মূল্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের নিকট জিম্মি– এমনটি অুনমান করা হয়।

দেশের মানুষকে ভালো রাখতে হলে, নিরাপদ করতে চাইলে বাজার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি খুব জরুরি। এখনই সময়, যথাযথ একটি প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য স্বাভাবিক রাখা। আমি রাজনীতি বিজ্ঞানের ছাত্র বিধায় অর্থনৈতিক বিষয় খুব বেশি বুঝি না। জিডিপি, বৈদেশিক মুদ্রা আয়, ফরেন রিজার্ভ বৃদ্ধি বা কমে যাওয়া, প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং আধুনিক হিসেবে মাথাপিছু আয় গণনা করার বিষয়গুলো সম্পর্কে শুনি; সব বুঝতে অসুবিধা হয়। কিন্তু দেশের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং মানবেতর জীবনযাপন ও টিসিবির পণ্যে সিন্ডিকেটের থাবা– এ-সংক্রান্ত প্রভাব সম্পর্কে কিছুটা অনুধাবন করতে পারি।
আমাদের মাথাপিছু আয় বাড়লেও, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে এর যথাযথ আনন্দময় অনুভূতি আমার মতো অনেকেরই হয় না। বর্তমান পরিস্থিতি অবলোকন করে আমার মনে আরেকটি প্রশ্ন জাগে, আমাদের দেশে যেসব পরিবার মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র, তাদের জীবনযাপন নিয়ে কি সরকারের মাথাব্যথা আছে? যদি থাকে, তাহলে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হতো না। এ কথা আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, যারা উচ্চ পর্যায়ে চাকরি করেন কিংবা যাদের দেখে সচ্ছল মনে হয়, তাদেরও এই মুহূর্তে ভাবতে হচ্ছে সংসারের আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে।

এখন টিসিবির পণ্য বিক্রয়েও সিন্ডিকেটের কালো থাবা আমাদের ব্যথিত করছে। সেখানেও দুর্নীতি হচ্ছে; কিন্তু নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতি। এখন সময় এসেছে, সরকারি সেবা খাতগুলোকে শতভাগ জবাবদিহির আওতায় আনা। দেশের সেবা খাত যত দুর্নীতিগ্রস্ত হচ্ছে, সাধারণ মানুষকে ততদিক থেকে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। দেশে ধনী লোকের সংখ্যা বাড়লেও দারিদ্র্যের হার এখনও উল্লেখযোগ্য। মাত্রাগত দিক থেকে এর ভয়াবহতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। কাজেই সরকারের প্রতি অনুরোধ জানাব, বর্তমান সময়ে ক্রমাগত দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি প্রতিরোধ করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কীভাবে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা যায় সেদিকে নজর রাখুন। বাংলাদেশে নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে, নিশ্চিতভাবেই ভয়াবহ সংকটে পড়বে মানুষ। সার্বিক বিশ্লষণে এক কথায় বলা যায়, বর্তমান ত্রাহি পরিস্থিতি অনুকূলে না এলে এর প্রভাব অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক– উভয় দিক থেকেই সমানভাবে সামনে আসার শঙ্কা রয়েছে।

ড. সুলতান মাহমুদ রানা: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় 
sultanmahmud.rana@gmail.com

আরও পড়ুন

×