অন্যদৃষ্টি
আট চোখে শঙ্কা
মিজান শাজাহান
প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৮ জানুয়ারি ২০২৩ | ২২:১০
বাবার জন্মভূমি বাংলাদেশে ফিরে এসেছে চার শিশু। প্রথমবারের মতো পিতৃভূমিতে পা রাখলেও তাদের চোখে আনন্দের ছাপ দেখা যায়নি। কারণ, গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি তাদের বাবা জাহাঙ্গীর আলম মারা গেছেন।
কক্সবাজারের সন্তান জাহাঙ্গীর আলম ২১ বছর আগে পাড়ি দিয়েছিলেন সৌদি আরবে। সেখানে কর্মসূত্রে পরিচয় হওয়া এক ইন্দোনেশীয় নারীকে বিয়ে করেন। তাঁদের সংসারে জন্ম হয় দুই মেয়ে এবং দুই ছেলের। সন্তানদের রেখে ইন্দোনেশীয় নারী নিজ দেশে চলে যান ছয় বছর আগে। আর যোগাযোগ রাখেননি। তারপর থেকে চার ভাই-বোন ছিল বাবার কাছে। বাবার মৃত্যুর পর এতিম চার শিশু আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। ঠাঁই হয় জেদ্দায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সেফ হোমে। সেখানে আট মাস কাটিয়ে গত শনিবার জমিলা, মুজাহিদ, সামিয়া ও ইয়াসিন ঢাকায় ফিরেছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু পরিবারে আশ্রয় পেলেও তাদের আট চোখে হানা দিচ্ছে নানা শঙ্কা।
এ চার শিশুর বাবার দিক থেকে নিকটাত্মীয়ের সন্ধান মেলেনি। ইন্দোনেশিয়ায় যোগাযোগ করেও মায়ের সন্ধান পায়নি দূতাবাস। ৭ থেকে ১৩ বছর বয়সী এ চার শিশু ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত থাকতে পারবে আশ্রয়কেন্দ্রে। সরকারিভাবে ফিরিয়ে আনা এসব শিশু এ দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবে বলে আশা রাখি। বাবা-মাকে হারিয়ে স্নেহহীনভাবেই তাদের আগামী দিনগুলো অতিবাহিত করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেলে পড়ালেখা করে রোজগারের পথও বেছে নিতে পারবে তারা। জাহাঙ্গীর আলমের ইচ্ছা ছিল সন্তানদের নিয়ে দেশে ফিরে আসার। অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে তাঁর সে ইচ্ছা অপূর্ণই রয়ে গেল। কিন্তু চার সন্তান রেখে মা কেন নিজ দেশে চলে গেলেন, তার উত্তরটা জানা জরুরি। অনুমান করা যায়, সাংসারিক দূরত্ব থেকেই নিজ দেশে ফিরে গেছেন তিনি। তবে স্বামীকে ত্যাগ করার পাশাপাশি সন্তানদেরও খোঁজ না নেওয়ার বিষয়টি রহস্যজনক। নিজ দেশে ফিরে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার শিকার হয়ে থাকলে তা ভিন্ন কথা। ছয় বছর ধরে নিখোঁজ থাকার কারণ জাহাঙ্গীর আলম বেঁচে থাকলে হয়তো জানা যেত।
ভিন্ন জাতি, ধর্ম বা সংস্কৃতির নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ে খারাপ কিছু নয়। বরং মানব জাতির মিলনের প্রশ্নে তাকে স্বাগত জানানোই স্বাভাবিক। তবে নিছক আবেগের বশে সংঘটিত এ ধরনের বিয়ের পরিণতি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সুখকর হয় না। জাপানি নারী এরিকো নাকানো ও বাংলাদেশের নাগরিক ইমরান শরিফের মধ্যে চলমান বিবাদ এর একটি উদাহরণ। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো বাবা-মা উভয়ে দুই নাবালিকা সন্তানের দাবিদার। স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হলেও সন্তানদের ছাড়তে নারাজ জাপানি মা। এ জন্য উচ্চ আদালতে আইনি যুদ্ধেও নেমেছেন তিনি। মাতৃস্নেহের এ নজির আমরা জেদ্দাফেরত চার শিশুর মায়ের বেলায় দেখতে পাইনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে ভিন্ন জাত-ধর্ম-সংস্কৃতির মানুষদের মধ্যে যোগাযোগ বেড়েছে। ফেসবুকে পরিচয় থেকে ভিনদেশির সঙ্গে প্রেম থেকে বিয়ের খবর মাঝেমধ্যে সংবাদমাধ্যমে দেখতে পাই। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, কাতার, ফিলিপাইন, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তরুণীরা প্রেমের টানে বাংলাদেশে চলে আসছেন। ধর্ম পরিবর্তন করে স্বামীর ধর্ম ও দেশের সংস্কৃতি অনুযায়ী বিয়েও করছেন। বাঙালি স্বামীর সঙ্গে বিদেশি নববধূর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি মাঝেমধ্যে মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশি নারীকেও বিদেশি পাত্রের সঙ্গে সংসার পাততে দেখা গেছে। সাদা চামড়া, লাল চুলের বিদেশি পাত্রের লুঙ্গি পরে মাছ ধরার দৃশ্য ভাইরাল হয়েছে।
যেসব ক্ষেত্রে ধর্মান্তর শেষে বিয়ে হওয়ার পরও সংস্কৃতির সংঘাত থেকে যায়, সেসব সংসার ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মুসলিম দেশের নারীর ক্ষেত্রেও এ শঙ্কা রয়েছে। আলোচ্য চার শিশুর মায়ের জীবন দেখে সহজেই এ কথা বলা যায়। তরুণ-তরুণীর প্রেম এবং পরে স্বামী-স্ত্রীর দূরত্বে যেন আর কোনো জমিলা, মুজাহিদ, সামিয়া ও ইয়াসিনকে দু'চোখে অন্ধকার দেখতে না হয়- এ কামনাই আমরা করি।
মিজান শাজাহান: সহ-সম্পাদক, সমকাল
mizanshajahan@gmail.com
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- মিজান শাজাহান