কূটনীতি
অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব
আবেদ চৌধুরী
প্রকাশ: ২৩ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২৩ | ০৮:৫৭
আগামী ২৬ জানুয়ারি উদযাপন হবে অস্ট্রেলিয়া দিবস। দিনটি স্মরণ করা হয় অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের ইউরোপীয় অভিবাসনের সূচনা দিবস হিসেবে। অস্ট্রেলিয়া এক অতি প্রাচীন বিশাল মহাদেশ। এখানে ৬০ হাজার বছর আগে প্রাচীন মানুষ এসে আদিমতম অভিবাসন শুরু করেছিল। সে নিরিখে ১৭৭০ সাল নেহাত সেদিন-যখন আধুনিক পশ্চিমাদের অস্ট্রেলিয়ায় গোড়াপত্তন হয়েছিল। আর সেই ইউরোপকেন্দ্রিক অস্ট্রেলিয়ার সূচনা দিবসই হলো ২৬ জানুয়ারি, অস্ট্রেলিয়া ডে বা অস্ট্রেলিয়া দিবস।
১৭৭০ সালে এ দখলদারি অভিবাসনের শুরু। প্রথমে এখানে পাঠানো হয়েছিল দাগি আসামিদের; ইংল্যান্ডে নানা অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার শুরু।সেই হিসেবে দেশটি অপরাধীদের অভয়ারণ্য হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হয়েছে তার উল্টো; পরশপাথরের ছোয়ায় আপাতমূল্যহীন লোহাও যেভাবে সোনা হয়ে যায় তেমনি অস্ট্রেলিয়ার পরিবেশ ওই অপরাধীদের পাল্টে দেয়; নিঃশেষ হয়ে যাওয়া ছাইয়ের ভেতরেও যেভাবে লুকিয়ে থাকে স্ম্ফুলিঙ্গ, সেভাবে মানুষ তাদের অপরাধের সাজা ও বেদনাকে ছাপিয়ে ক্রমেই বিশাল হয়ে উঠেছিল এবং তিন শতাব্দী ধরে এখানে নির্মাণ করেছে সম্পদশালী সুশৃঙ্খল গণতন্ত্রমনা এক সমাজ। তবে এ কথা ঠিক, আমরা অস্ট্রেলীয়রা (অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্বে আমি নাম লিখিয়েছি নব্বই দশকের শুরুতে) আজ অবধি একটা আদর্শিক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠন করতে পারিনি। আমাদের অনেকের এখনও রয়ে গেছে এ দেশের আদিবাসীদের প্রতি অবহেলা, এমনকি ঘৃণা করার ইচ্ছা। অনেকে বাহ্যিক বর্ণবাদ ত্যাগ করলেও হৃদয়ের বর্ণবাদকে ত্যাগ করতে পারেনি। তবু পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে যখন তাকাই, তখন আধুনিক বিশ্বে এমন একটা দেশ চোখে পড়ে না যাকে অন্তত সভ্যতা-সংস্কৃতির উন্নত অবস্থার নিরীখে অস্ট্রেলিয়ার সাথে তুলনা করা যায়। এ দেশই প্রথম অ্যাবঅরিজিনস তথা স্থানীয় আদিবাসীদের কাছে তাদের প্রতি ইুরোপীয়দের কৃত অন্যায় ও অপরাধের জন্য ক্ষমা ভিক্ষা করেছে। সেই 'আদিপাপ' স্খালনের প্রয়াস হিসেবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আদিবাসীদের ন্যায়সঙ্গত হিস্যা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে এ কথা বলতে কোনো দ্বিধা নেই যে, আমার হৃদয়ে অবশ্যই বাংলাদেশ প্রথম ও প্রধান এবং উজ্জ্বলভাবে দ্বিতীয় স্থানে আমার জন্য অস্ট্রেলিয়া। কীভাবে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়া আরও কাছাকাছি আসতে পারে সেটাই আমার প্রধান ভাবনা এখন; আমি দু দেশের মধ্যকার এ সেতুবন্ধের অগ্রদূত হতে চাই। অষ্টম শতাব্দী থেকে শুরু করে এ দেশে যত জাহাজ মানুষ কিংবা পণ্য নিয়ে এসেছে, সে জাহাজগুলোর প্রধান চালিকা শক্তি ছিলেন আমাদের নাবিকেরা। যাঁদের বাড়ি ছিল সিলেট, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম। বর্ণবাদী ইউরোপীয়রা আমাদের এই ঐতিহাসিকভাবে মহান নাবিকদের অস্ট্রেলিয়া জয়ের কাহিনিকে গোপন রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় আমি খুঁজে পেয়েছি সে অজানা অধ্যায়। অস্ট্রেলিয়া তাই শুধু ইউরোপীয় অভিবাসনের স্থান নয়, এ মহাদেশে আমাদেরও পূর্বপুরুষদের পদস্পর্শ ঘটেছে; এ মহাদেশের উন্নয়নে বহু আগেই আমাদের পূর্বপুরুষেরা াবদান রেখেছেন। সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের ওপর শুধু ইউরোপীয়দের নয় আমাদেরও দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক দাবি রয়েছে।
বাংলাদেশে অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার গুলশানে অস্ট্রেলিয়া দূতাবাসে পার্টি দেবেন, বাংলাদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সেখানে আমন্ত্রিত হবেন; খানাপিনা করবেন; আনন্দ-উল্লাসে মাতবেন। তবে সবাই যেন মনে রাখেন- এ দেশের স্থাপনায়, সূচনায়, অগ্রগতিতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে আমাদের জাহাজি নৌ সেনাদের। দুর্গম সমুদ্র পাড়ি দিয়ে, কালাপানি পার হওয়ার শাস্ত্রীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করে তারা এ মহাদেশের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন।
১৯৭২ সালে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে প্রথম অস্ট্রেলিয়াই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার ওডারলেন্ড মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধ করে বীরপ্রতীক উপাধি পেয়েছেন। গত ৩০ বছর ধরে আমি অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার বাসিন্দা, আমাদের দুই দেশের ক্রমেই গভীর হয়ে ওঠা সম্পর্কের আমি অন্যতম সাক্ষী। আধুনিক অভিবাসন- যা শুরু হয়েছিল ১৯৭০ দশকে, বাড়তে বাড়তে এখন হয়েছে এক লাখ। এক লাখ মানুষ যদি মাত্র এক হাজার ডলার বাংলাদেশে পাঠায়, তা হবে ১০০ কোটি ডলার বা সাত হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল প্রবাসী আয়রূপী বৈদেশিক মুদ্রার সম্ভাবনার দেশ এখন অস্ট্রেলিয়া। মনে রাখতে হবে, সেখানে বাংলাদেশিদের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান; দেশটার ২০২১ সালের জনশুমারি বলছে- তখন সেখানে বাংলাদেশিদের সংখ্যা ছিল ৫১ হাজারের কিছু বেশি; এর দশ বছর আগে যা ছিল মাত্র ২৭ হাজারের কিছু বেশি। দ্বিপাক্ষিক বানিজ্যও প্রতি বছর অন্তত ১১ শতাংশ হারে বাড়ছে। বাণিজ্যের আইটেমও বাড়ছে- শুধু তৈরি পোশাক নয় কৃষি, খাদ্যপণ্য, বেভারেজসহ অনেক বিষয়ই যুক্ত হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার জয় হোক। অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূত আমার পরম বন্ধু জেরেমি ব্রুয়ারকে অভিনন্দন। অভিনন্দন আমাদের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী আলবানিজিকে।
বহুদিন আগে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন-
'আজি দখিন দুয়ার খোলা
এসো হে এসো হে আমার
বসন্ত এসো।'
বঙ্গোপসাগরের মোহনায় দাঁড়িয়ে দক্ষিণে তাকালে অতিদূর সমুদ্রের পর প্রবাল দ্বীপে ঘেরা বিশাল মহাদেশ অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের দক্ষিণ সাগরের প্রতিবেশী। এই দুই মহান রাষ্ট্রের বন্ধুত্ব চিরজীবী হোক।
ড. আবেদ চৌধুরী: জিন বিজ্ঞানী
- বিষয় :
- কূটনীতি
- আবেদ চৌধুরী