ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন এবং গ্র্যাজুয়েটের অধিকার

বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন এবং গ্র্যাজুয়েটের অধিকার
×

প্রতীকী ছবি

নাসরীন সুলতানা

প্রকাশ: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৪:৩৯ | আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৪:৩৯

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে ২৫ ফেব্রুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ষষ্ঠ সমাবর্তন। অর্থাৎ বাংলাদেশের দুটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একই মাসে কাছাকাছি সময়ে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বয়সের বিচারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় যৌবন পেরিয়ে পূর্ণবয়স্ক; যার বয়স বাংলাদেশের সমান। অন্যদিকে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বয়সের দিক থেকে একেবারে নবীন।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় দুটির তথ্য থেকে দেখা যায়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৬ বছরে চারবার সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের সমান বয়সী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫২ বছরে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে ছয়বার। অন্যদিকে শতবর্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ২০২২ সালে ৫৩তম সমাবর্তনের আয়োজন করে। অর্থাৎ বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিতভাবে একটা লম্বা বিরতিতে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। অথচ প্রতি বছরই ছাত্র ভর্তি করার সময় তাঁদের শিক্ষাজীবন শেষে সনদ প্রদানের আনুষ্ঠানিকতার বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত ছিল।

অনেকে যুক্তি দিয়ে থাকেন, সমাবর্তন আয়োজন একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। চার-পাঁচ বছরের দীর্ঘ বিরতিতে সমাবর্তন আয়োজন ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া বৈকি। এই ব্যয়ের একটি বড় অংশ বরাদ্দ করা হয় ১০-১৫ হাজার গ্র্যাজুয়েটের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন প্যান্ডেল তৈরি করতে। পত্রপত্রিকা মাধ্যমে জানতে পারলাম- এ বছর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ষষ্ঠ সমাবর্তনের প্যান্ডেল বাবদ খরচ হয়েছে ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। করোনা-পরবর্তী এই প্রচ্ছন্ন দুর্ভিক্ষের সময়ে এটি এক অবশ্যম্ভাবী বিলাসিতা বৈকি। বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্র্যাজুয়েট উভয়ের জন্যই এটি গলার কাঁটা। প্যান্ডেল ছাড়া সমাবর্তন আয়োজন সম্ভব নয়, আবার এত টাকার জোগান দেওয়াও কষ্টসাধ্য ব্যাপার। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই অর্থ জোগানের চাপ গিয়ে পড়েছে রেজিস্ট্রেশন ফির ওপর। গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে বিরাজ করছে অসন্তোষ। ফেসবুকের টাইমলাইন ছেয়ে যাচ্ছে ক্ষেদভরা পোস্টে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুব সহজেই এ সমস্যার সমাধান করতে পারে। প্রতি বছর প্রথম বর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির সময় বিভাগের ছাত্র কল্যাণ তহবিল, বিভাগের জন্য বরাদ্দকৃত ফান্ডের মতো সমাবর্তন তথা শিক্ষাজীবন শেষে তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ প্রদানের বিষয়টি মাথায় রেখে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া উচিত। এটি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটে। অথবা শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন ফির মাধ্যমে এই আয়োজন করা যেতে পারে, যেমনটি এখন হচ্ছে। একইভাবে অনুষ্ঠান আয়োজন হতে পারে অডিটোরিয়াম বা কোনো কনভেনশন সেন্টারে। এতে প্রতি বছর অল্পসংখ্যক গ্র্যাজুয়েটের জন্য আয়োজন করতে হবে বলে এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বেগ পেতে হবে না। অন্যদিকে একটা বড় অঙ্কের অর্থের অপচয় রোধ সম্ভব হবে।

সমাবর্তন গ্র্যাজুয়েটদের জন্য শিক্ষাজীবন শেষে কর্মজীবনে প্রবেশের এক মাইলফলক। তাই সমাবর্তন বক্তা হিসেবে গ্র্যাজুয়েটদের সামনে এমন একজন ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যাঁর জীবন থেকে গ্র্যাজুয়েটরা একটি সুন্দর ও বাস্তবধর্মী দিকনির্দেশনা পাবেন। সমাবর্তন বক্তা হতে পারেন শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা কিংবা প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সফল এবং বিশেষ অবদান রেখেছেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে একবার সমাবর্তন বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন টেকনোলজি জগতের অন্যতম পুরোধা অ্যাপলের প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস। যিনি বক্তব্যে তাঁর জীবনের তিনটি ঘটনা বর্ণনা করে গ্র্যাজুয়েটদের ভবিষ্যতে কী করণীয়, সে বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। যা বিশ্বের কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগ। তাই একজন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতিসম্পন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ করা যেতে পারে, বিশেষ সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দেওয়া যেতে পারে। এতে সদ্য শিক্ষাজীবন সমাপ্তকারী গ্র্যাজুয়েটরা এ ধরনের সম্মানসূচক ডিগ্রি অর্জনের জন্য অনুপ্রাণিত হবেন। কর্মজীবনে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করবেন। সমাজ ও মানবতার কল্যাণে ভূমিকা রাখবেন। মোট কথা, প্রতিটি সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দায়িত্ব হলো, গ্র্যাজুয়েটদের সামনে কর্মক্ষেত্রে সফলতা অর্জনকারী একজন আইডলকে তুলে ধরা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও জাতীয়তার গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারেনি কিংবা সমাবর্তন বক্তা নির্বাচন করার ক্ষেত্রে নিজেদের প্রচলিত কনভেনশনের বাইরে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ফলে অনেক সময় সমাবর্তন বক্তব্য গ্র্যাজুয়েটদের জন্য মূল আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে না।

সমাবর্তনের অন্যতম আকর্ষণ স্বর্ণপদক প্রদান। স্বর্ণপদক একদিকে যেমন একজন গ্র্যাজুয়েটের জন্য তাঁর কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতি, অন্যদিকে এটি বর্তমান শিক্ষার্থীদের জন্য এক ধরনের প্রেরণা। যে কোনো পুরস্কার ও স্বীকৃতি মানুষকে ভালো কাজে উৎসাহ দেয়। তাই স্বর্ণপদক দেওয়ার ক্ষেত্র ও পরিধি বাড়ানো বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিসির অংশ হওয়া উচিত। কিন্তু দিন দিন টাকার অবমূল্যায়ন এবং স্বর্ণের দাম বাড়ার কারণে দেখা যাচ্ছে স্বর্ণপদক দেওয়া সম্ভব হয় না কিংবা কয়েক বছরের শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে হয়তো একজন বা দু'জন গ্র্যাজুয়েটকে ফলাফলের ভিত্তিতে নির্বাচন করা হয়।

যেমন এ বছর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মোফাসসিল উদ্দিন আহমেদ স্বর্ণপদক ১১ জন গ্র্যাজুয়েটের মধ্য থেকে একজনকে দেওয়া হয়েছে। কারণ, স্বর্ণপদকের জন্য যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ আছে, তাতে একজনকেই কেবল এটি দেওয়া যাবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে এ সংবাদ পড়ার পর খুবই মর্মাহত হয়েছি। এই ১১ জনের সবাই জানতেন, তাঁরা স্বর্ণপদক পাবেন কিন্তু মোফাসসিল উদ্দিন আহমেদ স্বর্ণপদক প্রাপ্তির যে শর্ত, এই ১১ জনের ফলাফলই সেই শর্ত পূরণ করে। অর্থ সংকুলান করতে না পারার কারণে অনেকেই তাঁদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এটি বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্র্যাজুয়েট উভয়ের জন্যই বেদনাদায়ক।

এখন কথা হচ্ছে, ক্রমবর্ধমান দামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে স্বর্ণপদকের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান আসবে কোথা থেকে? আমরা যদি উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকাই, তাহলে সহজেই এ সমস্যার সমাধান খুঁজে পাব।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় একজন গ্র্যাজুয়েটের জন্য দ্বিতীয় আঁতুরঘর। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গ্র্যাজুয়েটের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত প্রত্যেক গ্র্যাজুয়েটের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য লিপিবদ্ধ রাখা। বর্তমানে এটি কঠিন কোনো কাজ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইদের কাছে স্বর্ণপদকের ফান্ড গঠনের জন্য অনুরোধ করা যেতে পারে।

সমাবর্তন গ্র্যাজুয়েটদের অনুষ্ঠান। সমাবর্তনের সঙ্গে বর্তমান শিক্ষার্থীদের কোনো সম্পর্ক নেই। ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা কিংবা ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিওতে সমাবর্তন অনুষ্ঠান কোন দিক দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, আমি সেটা টের পাইনি কিংবা একজন সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে আমার ওপরে সমাবর্তন অনুষ্ঠান কোনো প্রভাব ফেলেনি। কিন্তু আমাদের দেশে সমাবর্তনকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে বিশাল এক কর্মযজ্ঞ। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ব্যস্ত থাকে এই আয়োজনকে ঘিরে। এই প্র্যাকটিস থেকেও আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। এটির আয়োজন যেন বর্তমান শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় কোনো প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত।

পরিশেষে বলতে চাই, স্বাধীনতার ৫২ বছরে দেশ অনেক দূর এগিয়েছে। অর্থনীতি আর নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ পৃথিবীর কাছে এক বিস্ময়। দেশে এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৩। বিশ্ববিদ্যালয় একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান একেকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হোক। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা শিক্ষাজীবন শেষে অনতিবিলম্বে একটি সুন্দর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সনদপ্রাপ্ত হয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ পাক।

নাসরীন সুলতানা: সহযোগী অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×