সমকালীন প্রসঙ্গ
বঙ্গবাজারে ঘুম ভাঙলে নিউমার্কেট পুড়ত না
আবু নাঈম মো. শাহিদুল্লাহ
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৩ | ২৩:০৭
বঙ্গবাজার ও নিউ সুপারমার্কেট উভয় স্থানেই আগুন লাগার সময়টা কাছাকাছি। অর্থাৎ ভোর সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে। রমজান মাস, ঈদের বেচাকেনা চলছে। এ সময় ব্যবসায়ীরা গভীর রাতে দোকান বন্ধ করে বাসায় যান, সেহরি খেয়ে নামাজ পড়ে যে সময়টায় ঘুমাতে যান, তখনই খবর পান তাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন লেগেছে। এ ধরনের দুঃসংবাদ ব্যবসায়ীদের জন্য যেমন বেদনার, আমাদের জন্যও আতঙ্কের।
পরপর কয়েকটি অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের পর নাশকতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। নাশকতা করে কার লাভ? নিউমার্কেটের কথাই যদি বলি, তাহলে ওখানে ফুটপাতের দোকানিদের উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছিল। তাঁদের মার্কেটের দোকান মালিকরা তাড়া দিচ্ছিলেন। এখন ভেতরের ব্যবসায়ীরা ভাবতে পারেন বাইরের দোকানদাররা প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে এমনটি ঘটিয়ে থাকতে পারেন। এ ধরনের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এটি খুবই দূরবর্তী কারণ।
প্রশ্ন হচ্ছে, রাজনৈতিক নাশকতার উদ্দেশ্যে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়ে কোন পক্ষ ফায়দা লুটবে? সরকারি কিংবা বিরোধী দল কোনো পক্ষই এ ধরনের ঘটনা সৃষ্টি করে জনমত তৈরি করতে পারে না। ফলে চিলে কান নেওয়ার পেছনে না ছুটে সঠিক কারণ উদ্ঘাটন করতে হবে। নাশকতার জন্য আগুন লাগানো হলে এক স্থান থেকে আগুনের সূত্রপাত হতো না। তিন-চার স্থান থেকে আগুনের সূত্রপাত হতো।
স্বীকার করতে হবে, আগুন নেভানোর ক্ষেত্রে আমাদের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা রয়েছে। সরু সড়ক হলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি দুর্ঘটনাস্থলে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হয়। বঙ্গবাজার ফায়ার সার্ভিস সদরদপ্তরের একেবারে কাছে, নিউমার্কেটও বেশি দূরে নয়। এরপরও আগুন নিয়ন্ত্রণ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার ছিল। কারণ কাপড় বা রাসায়নিকের গুদামে আগুন লাগলে নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হয়।
মনে রাখতে হবে, আগুন নিয়ন্ত্রণ ও নিবারণ আলাদা বিষয়। নিয়ন্ত্রণ মানে হচ্ছে– আর ছড়াবে না। অনেক সময় দেখা যায়, আগুন নিয়ন্ত্রণের পরও জ্বলতে থাকে। নিবারণে দু’এক দিন সময় লাগে। বঙ্গবাজারের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পরও দু’দিন ধোঁয়া বের হচ্ছিল। নিউমার্কেটের ক্ষেত্রেও তা হতে পারে। কাপড় দাহ্য বস্তু। তাই এ আগুন নিবারণে সময় লাগে। কাপড়চোপড়ের আগুনে যতই পানি দেওয়া হোক না কেন, তা গভীরে যেতে সময় লাগে। এটিকে ফায়ার সার্ভিসের ব্যর্থতা বলার সুযোগ নেই।
বঙ্গবাজারে অগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার সার্ভিসের প্রতিনিধি দল নিউমার্কেট ও গুলিস্তান পাতাল মার্কেট পরিদর্শন করে বলেছিল, সেসব মার্কেট অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছে। তখনই যদি প্রতিরোধ ও সচেতনতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেত, তাহলে হয়তো নিউ সুপারমার্কেটের আগুন এড়ানো যেত। বঙ্গবাজারে ঘুম ভাঙেনি বলেই নিউমার্কেটে আগুন।
সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এখানে ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন, রাজউক, বিদ্যুৎ, গ্যাস, কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর, এফবিসিসিআইসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি রয়েছে। এ কমিটি ঢাকা মহানগরে এক হাজারের বেশি মার্কেট শনাক্ত করেছে, যাদের কোনো না কোনো ত্রুটি রয়েছে। বাজেটও পাওয়া গেছে। আশা করা যাচ্ছে, এ কমিটি কাজ করতে পারলে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা থেকে অনেক প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করা যাবে। আরও পাঁচ হাজার মার্কেট নিয়ে তারা কাজ করবে টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেলে।
দুর্ঘটনা এড়াতে আমাদের পর্যাপ্ত আইন আছে। কিন্তু প্রয়োগে দুর্বলতার কারণে সুফল মিলছে না। বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে– এ কারণে সমাধান হচ্ছে না। সর্বোপরি সমন্বয়হীনতার অভাবে বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা জরুরি। যদি কর্তৃপক্ষ দ্রুত আইনের বাস্তবায়ন করে তাহলে সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। অনেক প্রাণহানি ও সম্পদহানি রোধ হবে।
এছাড়া আইনি জটিলতা ও মামলায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক সময় ভুক্তভোগীরা সুফল পান না। ফায়ার সার্ভিসের একজন পরিদর্শক কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলে দেখা যায়, তিনি পরিদর্শক থেকে পদোন্নতি পেয়ে সহকারী পরিচালক, উপপরিচালক হচ্ছেন; কিন্তু মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এ কারণে অনেক পরিদর্শক মামলার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত হয়ে যান।
যেমন বঙ্গবাজারের মার্কেটটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হলেও আদালতে মামলা থাকায় তাদের অপসারণ করা যায়নি। আইন সংশোধন করে এসব বিষয় দ্রুত নিষ্পত্তির বিধান প্রণয়ন করতে হবে। একজনকে বাঁচাতে গিয়ে হাজারো মানুষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। ব্যবসায়ীদেরও উদ্যোগ নিতে হবে। দোকানিদের বুঝিয়ে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদি তা করা যায় তাহলে তাড়াতাড়ি অন্য চিত্র দেখা যেতে পারে। আমাদের সমস্যা হলো, সরকার চাপিয়ে না দিলে নিজে থেকে কিছু করতে চাই না। আবার সরকার চাপিয়ে দিলেও তা এড়াতে নানা কৌশল আঁটি।
পাশাপাশি নগরীর সব ওয়ার্ডে স্থানীয়দের নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করে আগুন নেভানোর মহড়া চালাতে হবে। তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। স্থানীয়রা যেভাবে তাঁদের প্রতিবেশীকে সচেতন করতে পারবেন, তা পোশাকধারীরা গিয়ে পারবেন না। স্বেচ্ছাসেবক গঠনের উদাহরণ উন্নত দেশেও আছে। আমাদের দেশেও গঠন করা হয়েছে। কিন্তু তাঁরা অবহেলিত। কেউ তাঁদের অভিভাবক হতে চাইছেন না। এখন তাঁদের বসিয়ে না রেখে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগাতে হবে।
অগ্নিকাণ্ড হলেই তদন্ত কমিটি হয়। তারা প্রতিবেদনও দেয়। কিন্তু সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন হয় না। তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না, তা খতিয়ে দেখতে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি হতে পারে। তদন্ত কমিটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব না দিলে কিংবা কাউকে সরাসরি দায়মুক্তি না দিলে কিংবা দায়ী না করলে, সেই প্রতিবেদন গ্রহণ করা উচিত নয়। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে এসব তদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে লাভ হবে না।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম মো. শাহিদুল্লাহ: অবসরপ্রাপ্ত মহাপরিচালক, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর