অন্যদৃষ্টি
শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক
অমিত রায় চৌধুরী
প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৩ | ১৮:০০
সম্প্রতি যশস্বী লেখক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের সঙ্গে বাগেরহাটের এক ঝাঁক শিক্ষার্থীর সপ্রাণ আলাপচারিতায় কিছু দারুণ বিষয় উঠে এসেছে। শিক্ষার্থীদের একজন প্রথমেই জানতে চায়– লেখার প্রেরণা তিনি কীভাবে পেয়েছেন। উত্তরে তিনি বলেছেন, ভোগ-বিলাসের প্রাচুর্য না থাকলেও তাঁদের বাড়িতে অনেক বইয়ের সংগ্রহ ছিল। বই পড়ে, গল্প শুনে, কবিতা মুখস্থ করতে করতে তিনি বড় হয়েছেন। পড়ার মাঝেই তিনি নতুন আস্বাদ পেয়েছেন, আনন্দ খুঁজে নিয়েছেন। হয়তো সেভাবেই তাঁর গল্প বলার অভ্যাসটা তৈরি হয়েছে।
খ্যাতির বিষয়ে তাঁর ধারণা– এটা অনেকটা লটারির মতো। ঠিক যেন নোবেল পুরস্কার। অনেকে একসঙ্গে একই রকম কাজ করেন, গবেষণা করেন। একজন পুরস্কার পান। খ্যাতিটাও ঠিক তাই। এ জন্য এর পেছনে দৌড়ানো ঠিক নয়। হলে ভালো, না হলে নাই। খ্যাতির বিড়ম্বনা অনেক– এ কথাও মনে রাখতে হবে। একজন শিক্ষার্থী তার কিছু ব্যক্তিগত অনুভূতি, পর্যবেক্ষণ ও আক্ষেপের কথা তুলে ধরে। জিপিএ ৫ তাকে আকর্ষণ করে না। সে বিজ্ঞানকে ধারণ করতে চায়; উদ্ভাবন করতে চায়; নতুন সৃষ্টিকে উদযাপন করতে চায়। কিন্তু দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় উদ্ভাবনের অনুকূল পরিবেশ নেই। দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ বললেন, আসল ব্যাপার হলো ইচ্ছার তীব্রতা, ভালো লাগা। সেটি থাকলে বিজ্ঞানমনস্ক হলে দক্ষতা অর্জনের পথে কোনো বাধাই টিকে থাকতে পারে না। নিজের বাড়িতে একটা ছোট ল্যাব তৈরি করে নিতে তিনি শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেন। সামান্য কিছু যন্ত্রপাতি জোগাড় করে পরীক্ষা চালাতে খুব খরচ হয় না। এখন জ্ঞানের ভান্ডার অসীম এবং তা সবার হাতের মুঠোয়।
জিপিএ ৫ প্রসঙ্গে এই শিক্ষক মনে করেন, এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন তেমন কঠিন কিছু না। স্বাভাবিক পড়াশোনা চালিয়ে গেলে আপনা আপনি এই গ্রেড শিক্ষার্থীর নাগালে এসে যাবে। এর জন্য আলাদা প্রস্তুতির দরকার পড়ে না। আগ্রহ আর আনন্দ নিয়ে লেখাপড়া করাটাই জরুরি। পড়াশোনায় মন বসে না– একজন শিক্ষার্থীর এমন অভিব্যক্তির প্রতিক্রিয়ায় অভিজ্ঞ এই শিক্ষক বলেন, পড়াশোনার প্রতি শিশুদের এই দৃষ্টিভঙ্গি একদম স্বাভাবিক এবং চিরচেনা। কোনো শিশুরই তা ভালো লাগে না। কিন্তু পড়তে পড়তেই নতুন কোনো আনন্দের উৎস খুঁজে পাওয়া যায়। আর তখনই সৃষ্টি হয় আকর্ষণ। একবার এই দুর্লভ মুহূর্তের স্বাদ পেলে বই-ই হয়ে ওঠে তার নিত্যসঙ্গী।
পাঠ্যপুস্তুক ও কারিকুলাম পরিমার্জনের বিষয়ে ড. জাফর ইকবাল বলেন, শিক্ষার্থীর মননে যাতে সৃষ্টিশীলতা জেগে ওঠে, কোচিং-গাইডের অশুভ ছায়া থেকে যেন শিশুরা মুক্ত হতে পারে, সে লক্ষ্য নিয়েই এ কাজে তার সম্পৃক্ততা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতারও বদল ঘটে। সে কারণেও কিছু সংস্কার, কিছু পরিমার্জন দরকার; প্রয়োজন নতুন মডেল।
সার্থক শিক্ষক তিনিই, যিনি শিক্ষার্থীর মনোজগতে অবলীলায় বিচরণ করেন। তার মনকে সিক্ত করেন, নির্মাণ করেন, মুক্ত করেন।
অধ্যাপক অমিত রায় চৌধুরী: ট্রেজারার, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- অমিত রায় চৌধুরী