ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিতর্ক

বিদেশিরা রাজনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে না

বিদেশিরা রাজনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে না
×

ড. আবদুল মান্নান

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২৩ | ০৪:৫১

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের বাগ্‌যুদ্ধের বর্তমান বিষয় বিএনপির আন্তর্জাতিক তৎপরতা এবং পুলিশের তালিকা প্রণয়ন। বিষয়টিকে দুই ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন দু’জন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মাহবুবউল্লাহ এবং ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মান্নান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহফুজুর রহমান মানিক ও মিজান শাজাহান

সমকাল : বিএনপির বিদেশমুখী তৎপরতা কীভাবে দেখছেন?

আবদুল মান্নান: বিএনপির বিদেশমুখী তৎপরতা কোনো রাখঢাকের বিষয় নয়। দলটি যে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগ করেছে, তা সংবাদমাধ্যমেও রিপোর্ট হয়েছে। যদিও লবিস্ট নিয়োগ করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ বিষয়। এটি যখন রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়, সেটি শঙ্কার কারণ। বিএনপি এখন সেটি করছে, কারণ তারা শাসন-ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করছে। দীর্ঘদিন দলটি ক্ষমতার বাইরে বলে এখন বিদেশের কাছে ধরনা ধরছে।

সমকাল: আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর ক্ষমতায় এসেছিল। সেদিক থেকে বিএনপিও কি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে?

আবদুল মান্নান: আওয়ামী লীগ জনগণের সংগঠন। তাদের শিকড় অনেক গভীরে গ্রোথিত। দলটির শীর্ষসহ বড় বড় নেতাকে হত্যার পরও আওয়ামী লীগ ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। এমনকি তারা ইতোমধ্যে তিনবার একটানা রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। কিন্তু বিএনপির অবস্থা ভিন্ন।

সমকাল: কোন অর্থে ভিন্ন বলছেন?

আবদুল মান্নান: এক তো বললাম সাংগঠনিক দিক। আরেকটি যেমন, বিদেশমুখী তৎপরতার কথাই চিন্তা করুন। এর আগে আমরা দেখেছি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। র‍্যাবের মতো একটি বাহিনী, যারা দেশে জঙ্গিবাদ দমনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে, তাদের কেন নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হলো। এখানে কি বিএনপির ভূমিকা নেই? আবার দেখুন, একসময় যে আমেরিকা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর ছিল; এখন তাদের অগ্রাধিকার পরিবর্তন হয়েছে। এখন তাদের নজর– চীন ঠেকাও।

সমকাল: আওয়ামী লীগও তো বিদেশিদের কাছে বিএনপির বিরুদ্ধে নালিশ দিয়েছিল। অতীতে জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় বিএনপির বিরুদ্ধে বিদেশিদের কাছে বিভিন্ন ধরনের সাক্ষী-সাবুদ হাজির করেছিল দলটি।

আবদুল মান্নান: এগুলো সংবেদনশীল বিষয়। যারা জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনার সঙ্গে জড়িত– তাদের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ তার দায়িত্ব পালন করেছে।

সমকাল: হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাম্প্রতিক চিঠি আপনি দেখেছেন। সেখানে বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গ এসেছে।

আবদুল মান্নান: জি, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জাতিসংঘের প্রতি একটি আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলেছে, জাতিসংঘের শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নিয়োগের ক্ষেত্রে যেন তাদের মানবাধিকার রেকর্ড যাচাই-বাছাই করা হয়। এটি বিস্ময়কর দুটি কারণে। প্রথমত, এসব সংগঠন বাংলাদেশের মানবাধিকার নিয়ে চিন্তিত হলেও নিজেদের দেশের বিষয়ে নিশ্চুপ। আমেরিকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তারা কেন কথা বলে না? দ্বিতীয় বিষয়, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ অবদানকারী দেশ। আশির দশক থেকেই, এমনকি আমাদের সেনাবাহিনী জীবন দিয়ে বিশ্বশান্তি সুরক্ষায় ভূমিকা পালন করে আসছে। সুতরাং তাদের বিষয়টি এভাবে আনা দুঃখজনক।

সমকাল: পুলিশের তালিকা করে বিদেশেও নালিশ করছে বিএনপি...।

আবদুল মান্নান: বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী গুম-খুন-নির্যাতনের অভিযোগে পুলিশের যে তালিকা বিএনপি করছে, সেটিও দুঃখজনক। এর আগে আমরা দেখলাম, র‍্যাবের বিষয় এসেছে; এসেছে সেনাবাহিনীর বিষয়ও। এর সঙ্গে পুলিশের বিষয়টি যুক্ত হলো। বস্তুত এর মাধ্যমে বিএনপি রাষ্ট্রের বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে তার প্রতিপক্ষ বানিয়ে দিচ্ছে। আমি জানি না, এসব বাহিনীকে বিএনপি প্রতিপক্ষ বানাচ্ছে কিনা?

সমকাল: আপনি কেন এমনটা মনে করছেন?

আবদুল মান্নান: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আমরা দেখি, রিপাবলিকান কিংবা ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য রয়েছে। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তারা এক এবং তাদের রাষ্ট্রীয় নীতি বিদেশিদের প্রশ্নে কিংবা রাষ্ট্রীয় সংবেদনশীল বিষয়ে এক এবং অভিন্ন। আমাদের দেশে তেমনটা দেখা যায় না।

সমকাল: আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার এই বিরোধিতার ফল আগামীতে কী হতে পারে?

আবদুল মান্নান: আমি ১৯৫৪ সাল থেকেই নির্বাচন দেখে আসছি। দীর্ঘ এই অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই বিরোধ সত্ত্বেও সংকটের সমাধান অসম্ভব নয়। সংবিধানে আমাদের নির্বাচন কমিশনের যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার আলোকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর সেটা মেনে নেওয়া উচিত। মনে রাখতে হবে– ভারত, পাকিস্তান কিংবা একেক দেশে তাদের কাঠামো অনুসারে নির্বাচন হয়। আমাদের সংবিধানেও সেভাবে বলা আছে।

সমকাল: নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ভীতিহীন ও গণতান্ত্রিক করার জন্য আপনার কী সুপারিশ?

আবদুল মান্নান: আমি মনে করি, বর্তমান সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেও একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হওয়ার কথা। এ সরকারে প্রতিটি দলের প্রতিনিধি থাকবেন। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য দল। বিএনপি সংসদ থেকে যেভাবে পদত্যাগ করেছে, তাতে ছিল বোকামি। অন্যথায় বিএনপিও নির্বাচনকালীন সরকারে থাকতে পারত। সংবিধানে যেহেতু নির্বাচন কমিশনকে যথেষ্ট ক্ষমতা প্রদান করেছে, যেহেতু এ সময় নির্বাচন কমিশন তাদের ইচ্ছানুযায়ী পদক্ষেপ নিতে পারবে।

সমকাল: এর মাধ্যমে কি প্রত্যাশিত নির্বাচন হবে? আগের দুটি নির্বাচন নিয়ে কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে।

আবদুল মান্নান: ২০১৪ ও ২০১৮ সালের দুটি নির্বাচনকে ইচ্ছা করে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি ভয়াবহ সহিংসতা শুরু করে। ২০১৮ সালের নির্বাচনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিএনপির কৃতিত্ব একে ‘রাতের ভোট’ বলে প্রচার করা। অথচ এর কোনো প্রমাণ কেউই পায়নি। আগামী নির্বাচন সাংবিধানিক অনুসারে হওয়াই প্রত্যাশিত হবে। বিএনপির উচিত, একে অংশগ্রহণমূলক করার জন্য এই নির্বাচনে অংশ নেওয়া।

আরও পড়ুন

×