অন্যদৃষ্টি
ছায়া ও মায়া
শেখ রোকন
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০
বঙ্গীয় প্রতিবেশ ব্যবস্থায় আষাঢ়-শ্রাবণ যদিও উপযুক্ততম মৌসুম; ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ থেকে সমকালে আসা গাছ উপহার দেওয়ার খবরটিকে কেবল ঋতুচক্র দিয়ে বিবেচনার সুযোগ নেই। কোনো বাড়িতে নবজাতকের খবর পেলে ‘জনতার ঈশ্বরগঞ্জ’ সংগঠন যেভাবে দুটি চারাগাছ নিয়ে হাজির হচ্ছে, সেটা নিছক সাংগঠনিক তৎপরতা নয়। আর্থসামাজিক ও পরিবেশগত দিক থেকে এর তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী।
প্রথমত, গাছ লাগাতেই হবে। আমাদের জাতীয় সংগীতে যদিও এ দেশের প্রতি আবেগ প্রসঙ্গে বৃক্ষছায়ার কথা বলা হয়েছে, বাস্তবে আমরা ক্রমেই সবুজহীন হয়ে পড়ছি। অথচ যে কোনো দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখতে মোট স্থলভাগের অন্তত ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল থাকতে হয়। জাতিসংঘ কৃষি ও খাদ্য সংস্থার সর্বশেষ হিসাবে এ দেশে বনাঞ্চল ১৩ শতাংশ মাত্র। সরকারিভাবে আরেকটু বেশি দেখালেও সেই হিসাবের ফাঁকফোকরও বহুল আলোচিত। এই পর্যায়ে নাগরিকরা যদি গাছ লাগাতে এগিয়ে আসেন, তার চেয়ে উৎকৃষ্ট উদ্যোগ আর কী হতে পারে!
দ্বিতীয়ত, এ দেশে বৃক্ষরোপণ আন্দোলনের একটি সীমাবদ্ধতা হচ্ছে ফলদ গাছ কম থাকে। ফলের উৎপাদন বাড়ছে বটে, সেখানেও ‘বৃক্ষ’ কম; কলম কিংবা ‘ফসলি’ গাছ বেশি। ফলে প্রকৃতিতে বৃক্ষের বহুমাত্রিক অবদান অধরাই থেকে যায়। এর পরিবর্তে দেশীয় ফলদ গাছ লাগানো হলে প্রতিবেশ ব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্যও সমৃদ্ধ ও সম্প্রসারিত হয়। ফলফলাদির নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে জনসাধারণ অর্থনৈতিকভাবেও নির্ভরযোগ্য হতে পারে। ঈশ্বরগঞ্জের এ উদ্যোগে বনজ ও ফলদ গাছের চারা উপহারের মাধ্যমে সেই ভারসাম্য রক্ষা করতে চাওয়ার বিষয়টি লক্ষণীয়।
তবে বনজ বৃক্ষও যেন ‘আগ্রাসী’ প্রজাতির না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বৃক্ষরোপণের নামে দেশের প্রায় সর্বত্র ইউক্যালিপটাস, একাশিয়া প্রভৃতি বিদেশি প্রজাতির বৃক্ষ লাগিয়ে ইতোমধ্যে আমাদের প্রতিবেশ ব্যবস্থার যথেষ্ট ক্ষতি করা হয়েছে। এসব নিয়ে আলোচনার সময় অন্য যে বিষয়টি আমরা ভুলে যাই সেটা হচ্ছে– এক অঞ্চলের দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষও অন্য অঞ্চলে গিয়ে ‘আগ্রাসী’ বিবেচিত হতে পারে। বৃক্ষরোপণবিষয়ক আন্দোলন বা সংগঠনগুলো এসব দিকে খেয়াল রাখলে আরও ভালো হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, রোপণকৃত গাছের পরিচর্যা ও বেড়ে ওঠা পর্যন্ত নজর রাখা। গত কয়েক দশকে দেশে যতসংখ্যক গাছ লাগানো হয়েছে, সেগুলো যদি যথাযথভাবে বেড়ে উঠতে পারত তাহলে সম্ভবত আমাদের ২৫ শতাংশের কোটা ইতোমধ্যে পূরণ হয়ে যেত। কিন্তু বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, গাছ উপহার দিয়ে বা লাগিয়েই সরকারি-বেসরকারি বা সামাজিক সংগঠনগুলো দায় শেষ করে। ফলে দেশে নার্সারির সংখ্যা ও সেখানকার উৎপাদন যে হারে বাড়ে; ভূমিতে গাছের হার সে হারে বাড়ে না।
মনে পড়ছে কয়েক বছর আগে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ৩০ লাখ বৃক্ষ রোপণের ঘোষণা দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মরণে। হয়তো লাগিয়েছিলও, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ হয়েছে কিনা সন্দেহ। বজ্রপাত নিয়ন্ত্রণে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে এক কোটি তালগাছ লাগানোর কর্মসূচি নিয়েছিল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। তারা অবশ্য সেই কর্মসূচি থেকে ঘোষণা দিয়েই সরে এসেছে। কারণ ৩৮ লাখ চারা লাগানো হলেও সেগুলো টেকানো যায়নি।
ময়মনসিংহে ‘একটি শিশু দুটি বৃক্ষ’ উদ্যোগ যদি গাছ উপহার দিয়ে তা বেড়ে ওঠাও নিশ্চিত করতে পারে, তাহলেই প্রকৃত উদাহরণ তৈরি হতে পারে। কারণ নবজাতকের জন্য গাছের চারা উপহার অন্যান্য দেশেও রয়েছে। যে উগান্ডা নিয়ে আমরা প্রায়ই ‘ট্রোল’ করি, সেখানে সরকারিভাবেই এমন উপহার দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে যেসব পরিবারে গাছগুলো উপহার দেওয়া হচ্ছে, তারাও উদ্যোগী হতে পারে। শিশুটি বড় হলে তাকে দিয়েও পরিচর্যা করানো যেতে পারে। এতে গাছের সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক যেমন তৈরি হবে, তেমনি আরও গাছ রোপণে উৎসাহিত হবে।
আমাদের জাতীয় সংগীতেই শোভা ও ছায়ার সঙ্গে স্নেহ ও মায়ার কথা বলা হয়েছে। গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে সেই মায়া সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক; সহযোগী সম্পাদক, সমকাল
skrokon@gmail.com- বিষয় :
- অন্যদৃষ্টি
- শেখ রোকন