অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড
সমাজ ও শৃঙ্খলার গভীরতর অসুখ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যার ঘটনা কেবল হৃদয়বিদারক নহে; একাধিক প্রশ্নেরও জন্ম দিয়াছে। অপ্রতিমের মাতা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের বক্তব্যকে উদ্ধৃত করিয়া সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানাইয়াছিল, শুক্রবার অপরাহ্ণে মাতার আইফোন লইয়া বন্ধুদের সহিত ছবি তুলিবার উদ্দেশ্যে বাসা হইতে বাহির হইবার পর অপ্রতিমের আর সন্ধান মেলে নাই। শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী লালমাই সানন্দা পাহাড় এলাকার জঙ্গল হইতে তাঁহার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একমাত্র সন্তানকে হারাইয়া অপ্রতিমের পিতা-মাতা পাগলপ্রায়। স্বাভাবিকভাবেই তাহাদের শোক ও আর্তনাদ প্রত্যেক মানুষকে স্পর্শ করিয়াছে। ইতোমধ্যে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্ট সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হইয়াছে। তাহাদের জবানবন্দির ভিত্তিতে পুলিশ দাবি করিয়াছে, মূলত আইফোন ছিনতাইয়ের জন্যই অপ্রতিমকে হত্যা করা হইয়াছে। যদি ইহাই সত্য হয়, প্রশ্ন উঠে– সমাজে খুন করা কতটা সহজ হইলে কতিপয় কিশোর বা সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ বালক মিলিয়া আরেক কিশোরের প্রাণ কাড়িয়া লইতে কসুর করে না? আমরা গভীর উদ্বেগের সহিত লক্ষ্য করিতেছি, খুনখারাবি এবং নানারকম ফৌজদারি অপরাধে তরুণ বা যুবক এবং অল্পবয়সী বালকরাও বিপজ্জনক মাত্রায় যুক্ত হইতেছে। সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে ‘কিশোর গ্যাং’ নামক নূতন শব্দবন্ধেরও প্রচলন ঘটিয়াছে।
এই ক্ষেত্রে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীলতা সম্পর্কেও প্রশ্ন উঠে। অপ্রতিমের সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের পুলিশ অল্প সময়ে গ্রেপ্তার করিয়াছে, সত্য। শিশু বা কিশোর অপহরণের অন্য বহু ঘটনায় অতীতে পুলিশ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়াছে। অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় শনিবার সামাজিক মাধ্যমে যখন শোক ও ক্ষোভের ঝড় বহিতেছিল, সেইদিনই সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে রাজধানীর খিলক্ষেত হইতে মো. হাবিবুল্লাহ নাঈম নামে ১২ বৎসরের শিশু নিখোঁজ হইবার খবর আসিয়াছে। অন্যদিকে, শনিবারই আজকের পত্রিকা জানাইয়াছে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় চশমা ক্রয় করিতে বগুড়ার নিশিন্দারা উপশহরের বাসা হইতে বাহির হইয়া সম্মান তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আব্দুল মুহাইমিন রাধিন আর বাসায় ফিরেন নাই। উভয় ঘটনাতেই পুলিশ অদ্যাবধি কূলকিনারা করিতে পারে নাই।
শুধু উহাই নহে, খোদ পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলিতেছে, গত সাত মাসে দেশের বিভিন্ন থানায় শিশু নিখোঁজ সম্পর্কিত প্রায় ১৬ সহস্র সাধারণ ডায়েরি হইয়াছে। তন্মধ্যে দুই সহস্রাধিক শিশুর এখনও সন্ধান মিলে নাই। এই সময়ে কত শিশু যে ধর্ষণ ও বলাৎকারের শিকার হইয়াছে, যাহাদের অনেকে সংশ্লিষ্ট নির্যাতক বা নির্যাতকদের হস্তে প্রাণও হারাইয়াছে, তাহারও সঠিক হিসাব নাই। বস্তুত শিশু-কিশোরদের এহেন নৃশংসতা ও বর্বরতার শিকার হওয়ার ঘটনাবলি সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্তিতির ভঙ্গুর দশারই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আমরা জানি, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা ভাঙিয়া পড়িলেও অদ্যাবধি উহা নিয়ন্ত্রণে আসে নাই। প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্বাধীন ও পেশাদাররূপে গড়িয়া না তোলাই যে এহেন পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে দায়ী, তাহাও অজানা নহে। দুর্ভাগ্যবশত, এহেন নিরাপত্তা সংকট জনমনে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ ছড়াইলেও সরকার উহা স্বীকার করিতে রাজি নহে। আর রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে এহেন অপ্রিয় বাস্তবতা অস্বীকারের সংস্কৃতি দেখিয়া পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর মধ্যে গা-ছাড়া ভাবের উদয় হওয়া অস্বাভাবিক নহে। তাই শুধু অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করিলেই চলিবে না; সরকার ও পুলিশ বাহিনীকে উক্ত অস্বীকারের সংস্কৃতি হইতে বাহির হইয়া যেই কোনো অপরাধমূলক ঘটনায় কার্যকর সাড়া দিতে হইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়