নগরায়ণ
সবুজ ছাদবাগান, বাধা ও আইনি প্রতিকার
জেসমিন জেবা
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
নবনী (ছদ্মনাম) সারাজীবন ভাড়া বাসায় কাটিয়েছেন। জীবনের শেষলগ্নে এসে বহু বছরের সঞ্চয় দিয়ে ছোট্ট বাসস্থান খুঁজছিলেন। বন্ধুরা তাঁকে আধুনিক ফ্ল্যাট দেখালেও নবনী খুঁজছিলেন এমন একটি জায়গা, যেখানে জানালার বাইরে কিংবা মাথার ওপরের খালি ছাদে থাকবে সবুজ স্পর্শ পাওয়ার সুযোগ। অবশেষে ফ্ল্যাট কেনা হলো এবং শুরু হলো নবনীর সবুজ অভিযান। কখনও নার্সারি থেকে, কখনও কোনো বন্ধুর বাগান থেকে, আবার কখনও পরিচিত কারও মাধ্যমে ছোট ছোট গাছ আসতে লাগল তাঁর কাছে। কিন্তু তাঁর এই সবুজ সাম্রাজ্য যত বড় হতে লাগল, প্রতিবেশীদের আপত্তির তালিকা তত দীর্ঘ হলো।
একদিন বলা হলো, তাঁর গাছের ছায়া পাশের ফ্ল্যাটে পড়ছে। আরেক দিন বলা হলো, গাছ মোটেও পছন্দ নয়। কেউ বললেন, এটি স্রেফ বাড়াবাড়ি। নবনী প্রথমে হাসিমুখেই সব সহ্য করে বিষয়গুলো বোঝানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু এক সকালে ছাদে উঠে দেখলেন, তাঁর যত্ন করে গড়ে তোলা সবচেয়ে সুন্দর মাধবীলতাটি গোড়া থেকে কেটে ফেলা হয়েছে। তিনি বুঝলেন, সমস্যাটা শুধু আর গাছে আটকে নেই।
নবনী তাঁর আইনজীবী বন্ধুকে ফোন করে সমস্যার আইনি ব্যাখ্যা চাইলেন। আইনজীবী বন্ধু বললেন, বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪২৫ ধারায় অনিষ্টসাধন এর স্পষ্ট সংজ্ঞা রয়েছে। কেউ যদি বেআইনিভাবে কারও সম্পত্তি ধ্বংস করে, উপযোগিতা কমিয়ে দেয় কিংবা ক্ষতিসাধন করে, ৪২৭ ধারা অনুযায়ী তা শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ, যার সাজা দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড। এ ছাড়া কেউ হুমকি দিলে দণ্ডবিধির ৫০৩ ও ৫০৬ ধারার অধীনে অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ আনা সম্ভব। আর যদি পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তি একত্রিত হয়ে কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে জোরপূর্বক গাছ কেটে ফেলে বা বাগানে বাধা দেয়, তবে দণ্ডবিধির ১৪১ ও ১৪৩ ধারার অধীনে বেআইনি সমাবেশের আইনগত অপরাধ গঠিত হয়।
এমনকি ডিজিটাল মাধ্যমে বা কোনো অনলাইন গ্রুপে হেনস্তা করা হলে সাইবার সুরক্ষা আইনের সুযোগও খতিয়ে দেখা যেতে পারে। সীমিত পরিসরে হলেও বাংলাদেশে টর্ট আইনের আওতায় অন্যের শান্তিপূর্ণ ভোগদখলে বেআইনি বাধার বিরুদ্ধে দেওয়ানি প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তা ছাড়া রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ২(২) ধারায় কমন স্পেস বা যৌথ ব্যবহারের জায়গার স্পষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আইনটির ১১(৪) ধারা অনুযায়ী, অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয়ে কমন স্পেস এর সুযোগ-সুবিধা কমানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এ ছাড়া জমি হস্তান্তরের পর ডেভেলপার কিংবা পূর্বতন জমির মালিকদের বাড়তি কোনো একক কর্তৃত্ব বা বাড়তি মর্যাদা দেখানোর আইনি ভিত্তি থাকে না। সম্পূর্ণ হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ ও রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের ভিত্তিতে নতুন ও পুরাতন সকল ফ্ল্যাট মালিকের মর্যাদা সমান।
অন্যদিকে, কয়েকজন ফ্ল্যাট মালিক একত্র হলেই সেটি কোনো সর্বক্ষমতাময় কর্তৃপক্ষ হয়ে যায় না। সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন আইন বা সমবায় সমিতি আইন, ২০০১ ও সমবায় সমিতি বিধিমালা, ২০০৪-এর অধীন আইনগতভাবে নিবন্ধিত না হয়ে এবং নির্দিষ্ট নিয়ম না মেনে মনগড়া ‘কমিটি’ গঠন করে অন্য কোনো মালিকের ওপর তাদের ইচ্ছা বা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের কথা স্পষ্ট বলা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট বিভাগীয় রায় সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের আওতায় ‘জীবন ধারণের মৌলিক অধিকার’-এর অংশ হিসেবে পরিচ্ছন্ন ও সুস্থ পরিবেশ পাওয়ার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। সরকারি উদ্যোগও এখানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর বিধিমালা অনুযায়ী ছাদে সবুজায়নকে উৎসাহিত করতে ঢাকা সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষ ১০ শতাংশ হোল্ডিং ট্যাক্স বা পৌরকর মওকুফের ঘোষণা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সিঙ্গাপুর, জার্মানির মতো দেশের উন্নত শহরগুলোতে রুফ নীতি বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আওতায় নিরাপদ ও সবুজ উন্মুক্ত স্থানের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জেসমিন জেবা: আইনজীবী, ঢাকা জজকোর্ট
jebalawru@gmail.com
- বিষয় :
- নগরায়ণ