তৃতীয় মেরু
মিয়ানমার জান্তা ‘রোহিঙ্গা কার্ড’ খেলে রেহাই পাবে?
শেখ রোকন
শেখ রোকন
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৪ | ০১:১৫ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৪ | ০১:১৬
বেকায়দায় পড়ে মিয়ানমার জান্তা ফের নতুন ফাঁদ পেতেছে। এবার যখন এনএলডিসহ গণতন্ত্রকামী দলগুলোর বিকল্প সরকার কোনো আলোচনার প্রস্তাবই মানছে না; যখন তিন সশস্ত্র গোষ্ঠীর ‘ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’ বা ভ্রাতৃজোটকে চীনা দাওয়াই দিয়েও মানানো যাচ্ছে না; যখন সীমান্তবর্তী সংখ্যালঘু অধ্যুষিত রাজ্যগুলোর পাশাপাশি সংখ্যাগুরু বামার অধ্যুষিত মধ্যাঞ্চলীয় বিভাগগুলোও জান্তার হাতছাড়া হচ্ছে; তখন বার্মিজ জান্তা ‘রোহিঙ্গা কার্ড’ খেলতে চাইছে। নাফ নদের ওপারে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইনে গত কয়েক সপ্তাহের চিত্র প্রমাণ করছে আরেকটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে দিতে মিয়ানমার জান্তা মরিয়া।
গত মার্চ থেকে দেখা যাচ্ছে, রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত টাউনশিপ মংডু, বুথিডং, রাথিডং কিংবা রাজধানী সিত্তয়ের অস্থায়ী রোহিঙ্গা শিবিরের কাছে আরাকান আর্মিবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ দেখা যাচ্ছে। এ-সংক্রান্ত যেসব ছবি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, প্রায় প্রত্যেকের মাথায় নতুন চকচকে টুপি। কারুকাজমণ্ডিত দামি গোল টুপি। জান্তা নিয়ন্ত্রিত জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো তা আবার ফলাও করে প্রচার করছে। সরকারি দপ্তরের ফেসবুক পেজেও শেয়ার হচ্ছে সেগুলো।
এটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই যে, মাত্র কয়েক মাস আগ পর্যন্ত সামরিক জান্তার নির্বিচার নির্যাতনের শিকার এই জনগোষ্ঠী বাধ্য হয়েই বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পুরোনো ছবিগুলো দেখলেই বোঝা যায়, সবাই সবসময় টুপি পরে থাকে না। এত দামি টুপি তো নয়ই। বাধ্য হয়েছে বলেই সম্ভবত তাদের বেশির ভাগ আবার মুখে মাস্ক পরা। এমনও হতে পারে যে, তাদের সবাই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীরও নয়। যে কারণে মুখে মাস্ক লাগাতে হয়েছে।
শুধু তাই নয়, গত কয়েক মাসে কিছু ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, রেহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সামরিক জান্তা। অথচ মাস কয়েক আগেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম খবর দিয়েছিল যে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থায়ী রোহিঙ্গা শিবিরগুলো থেকে পুরুষদের ‘অপহরণ’ করে নিয়ে যাচ্ছে সামরিক জান্তা। তাদের নিয়ে কী করা হয়েছে, সাম্প্রতিক ভিডিওগুলো তার প্রমাণ।
বাংলা প্রবাদে দুর্জনের যেমন ছলের অভাব হয় না; তেমনই বার্মিজ জান্তারও ফাঁদের শেষ নেই। বস্তুত ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর ৭৬ বছরের মিয়ানমারকে ৫২ বছরই সামরিক শাসনাধীনে রাখা সম্ভব হয়েছে নানা ফাঁদ পেতে রেখেই। অন্যরা তো বটেই; অং সান সু চির মতো ‘সচেতন ও শক্তিশালী’ নেত্রীও যে গত তিন দশকে জান্তার ফাঁদে কতবার পা দিয়েছেন, তার হিসাব রাখা মুশকিল। যখন সহিংস পথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি, সু চিকে ‘মুক্তি’ দিয়ে অহিংস কৌশল কাজে লাগাতে চেয়েছে। সর্বশেষ ঘরে-বাইরে প্রচণ্ড চাপের মুখে ২০১০ সালের নভেম্বরে মুক্তি পান সু চি। তাঁর দল ২০১৫ ও ২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকারও গঠন করে।
২০২১ সালে আবার সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সু চি বুঝতে পারেন তিনি কোন বোকার স্বর্গে বাস করছিলেন। তিনি বুঝতে পারেন যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রশ্নে গড়ে ওঠা ঐকমত্য সাম্প্রদায়িক কার্ড খেলে চুরমার করে দিতেও বছর ছয়েক সু চিকে সহ্য করেছে সামরিক জান্তা। রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন রাজ্যে সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর মধ্যে রক্তাক্ত দাঙ্গা ও গণহত্যার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সাম্প্রদায়িক খঞ্জরে ক্ষত-বিক্ষত করে দিতেই তাকে সামনে রাখা হয়েছিল। হাতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর রক্ত লাগিয়ে সু চির আন্তর্জাতিক সমর্থন ও ভাবমূর্তিও ততদিনে তলানিতে নেমেছে। ফলে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সু চি যখন অজ্ঞাত সামরিক ঘাঁটির নির্জন কক্ষে বন্দি ছিলেন, তখন আন্তর্জাতিক মহল দায়সারা বিবৃতি ছাড়া কিছু করেনি। যে বাংলাদেশে সু চি এত জনপ্রিয় ছিলেন, সেখানেও প্রকাশ্যই ‘যেমন কর্ম, তেমন ফল’ মন্তব্য শোনা গেছে।
তবে সর্বশেষ ছল ধরা পড়ায় সামরিক জান্তার জন্যও নতুন ছল খোঁজা কঠিন হয়ে পড়েছিল। কারণ, কেউ আর তাদের বিশ্বাস করছিল না। এমনকি সু চিকে বারবার ‘মুক্তি’ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কৌশলও বহুল ব্যবহারে মিয়ানমারের ভেতরে ও বাইরে ধরা পড়ে যায়। যে কারণে গত বছর জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে অং সান সু চির কারাগার থেকে একটি আবাসিক ভবনে স্থানান্তর এবং থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেও কাজ হয়নি। থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মাধ্যমে সু চি যদিও ‘সংলাপে উৎসাহ’ দিয়েছিলেন, তাঁর সহযোদ্ধা, সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাই তা পত্রপাঠ নাকচ করে দিয়েছিলেন।
মিয়ানমারের বিরোধী ও বিদ্রোহী সামরিক-বেসামরিক দল ও গোষ্ঠীগুলোর বিকল্প সরকার ‘ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট’ বা জাতীয় ঐক্য সরকারও প্রাঞ্জল ভাষায় বলছে– মিয়ানমার জান্তার পক্ষে যেই ওকালতি করুন, তাকে বিশ্বাস নেই। এমনকি সেই ব্যক্তি যদি স্বয়ং অং সান সু চিও হন। বরং এই দফায় এসে এ ধরনের কৌশল ‘সু চি কার্ড’ নামে নতুন নাম পায়।

শুধু জান্তার কৌশল সবার কাছে ধরা পড়া নয়; জাতীয় ঐক্য সরকারের বাইরে গত বছর অক্টোবর থেকে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে থাকে ‘অপারেশন ১০২৭’। কোকাঙ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি ‘মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি’ বা এমএনডিএএ, ‘টাঙ ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি’ বা টিএনএলএ এবং বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইন স্টেটের ‘আরাকান আর্মি’ মিলে গঠিত ‘ভ্রাতৃজোট’ গত বছর ২৭ অক্টোবর থেকে এ অভিযান শুরু করে। একের পর এক পতন ঘটতে থাকে জান্তা নিয়ন্ত্রিত এলাকার। তাদের বাইরেও চিন স্টেটে চিন ডিফেন্স ফোর্স বা কাচিন প্রদেশে কাচিন ইন্ডিপেনডেন্ট আর্মিও নিজেদের মতো করে জান্তাবিরোধী লড়াই শুরু করে এবং সফল হতে থাকে।
মিয়ানমার সামরিক জান্তার পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, রাখাইনের পরিসংখ্যানই তা বোঝার জন্য যথেষ্ট। রাজ্যটির ১৭টি টাউনশিপ বা মহকুমার মধ্যে ১০টি এখন আরাকান আর্মির দখলে। বাকি সাতটির অবস্থাও তথৈবচ। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা থেকেই ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চার মাসে মিয়ানমারের সাত শতাধিক সেনা সদস্য বা সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিপি সদস্য প্রাণ বাঁচাতে বান্দরবান বা কক্সবাজারে এসে ঢুকেছে। এখন যখন আরাকান আর্মি রাজধানী সিত্তয়ের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন জান্তা মরিয়া হয়ে রোহিঙ্গাদের মাঠে নামিয়েছে।
স্বস্তির বিষয়, আরাকান আর্মি সম্ভবত জান্তার ‘রোহিঙ্গা কার্ড’ সম্পর্কে সচেতন। যে কারণে, উস্কানি সত্ত্বেও তারা সাম্প্রদায়িক সংঘাতের পথে যাচ্ছে না। বরং সংঘাতমুখর বুথিডং টাউনশিপ থেকে কমবেশি ৭ হাজার রোহিঙ্গাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছে। শুধু তাই নয়, সেই আশ্রয় দেওয়ার ছবি ও ভিডিও ফুটেজ আরাকান আর্মির বেসামরিক সংগঠন ‘ইউনাইটেড লিগ অব আরাকান’ সামাজিক মাধ্যমে প্রচার ও সংবাদমাধ্যমে সরবরাহ করছে। এর মধ্য দিয়ে বার্তা পরিষ্কার, কোনো পক্ষই আগের মতো ফাঁদে পা দিতে রাজি নয়। জান্তা যতই চেষ্টা করুক, এবার আর সাম্প্রদায়িক কার্ড খেলে পার পাচ্ছে না।
শেখ রোকন: লেখক ও গবেষক; সম্পাদকীয় বিভাগপ্রধান, সমকাল
skrokon@gmail.com
- বিষয় :
- মিয়ানমার