ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পরিবেশ

পানি নীতিমালা হালনাগাদ এবং কার্যকারিতার প্রশ্ন

পানি নীতিমালা হালনাগাদ এবং কার্যকারিতার প্রশ্ন
×

মো. খালেকুজ্জামান

মো. খালেকুজ্জামান

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

অন্তর্বর্তী সরকার ১৯৯৯ সালে প্রণীত পানি নীতিমালা হালনাগাদ করার উদ্যোগ নিয়েছে, যা প্রশংসার দাবি রাখে। সময়ের বিবেচনায় ১৯৯৯ সালে প্রণীত পানি নীতিমালা খুবই যুগোপযোগী উদ্যোগ ছিল। এই নীতিমালার মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পানিসম্পদের উন্নয়ন, পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনাকে অববাহিকাভিত্তিক টেকসই উন্নয়নের আলোকে দক্ষ, ন্যায়সংগত ও পরিবেশগতভাবে ভারসাম্যমূলক করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই নীতিমালা সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিল। কারণ তখনও জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা কিংবা স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন অভীষ্ট প্রণয়ন করা হয়নি। 
পানি নীতিমালার (১৯৯৯) আরেকটি লক্ষ্য ছিল ভূপৃষ্ঠ ও ভূগর্ভস্থ সকল পানির উন্নয়ন, ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দারিদ্র্য মোচন, খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনসাধারণের অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আনার উদ্দেশ্যও ব্যক্ত করা হয়েছিল। এ ছাড়াও পানিদূষণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আন্তঃদেশীয় নদীসম্পদে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায় ব্যক্ত করা হয়েছিল। 

বাস্তবতা সম্পূর্ণ অন্য কথা বলে। বিগত ২৭ বছরে বাংলাদেশে পানিসম্পদ-বিষয়ক কোনো পরিকল্পনা কিংবা প্রকল্পে উপরোক্ত উদ্দেশ্য প্রতিফলিত হয়নি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ভারত-বাংলাদেশের মধ্যকার গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির বাইরে আর কোনো আন্তঃদেশীয় নদীর পানি-পলি বণ্টন চুক্তি কিংবা সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়নি। গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ১৯৯৬-২০১৬ সময়ে ৫৬% সময়ই বাংলাদেশ তার ন্যায্য হিস্যা পায়নি। দেশের অভ্যন্তরে গৃহীত পানিসম্পদ-বিষয়ক প্রকল্প, যেমন ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০, তিস্তা নদী সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প বা তিস্তা মহাপরিকল্পনা, হাওরে মহাসড়ক, হাওর মাস্টারপ্ল্যান কিংবা উপকূলীয় পোল্ডার নির্মাণ প্রকল্পের কোনোটিই অববাহিকাভিত্তিক টেকসই উন্নয়নের ধারণাপ্রসূত, ন্যায়সংগত এবং পরিবেশগতভাবে ভারসাম্যমূলক নয়। পানিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সংস্কারও আনা হয়নি। দেশের প্রায় কোনো নদীই দখল ও দূষণের বাইরে নেই। 

বাংলাদেশের জাতীয় পানিনীতির (১৯৯৯) ২০২৫ সালের হালনাগাদের প্রস্তাবনায় পানি সংকট মোকাবিলা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় নতুন উপাদান যুক্ত হয়েছে। এতে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, জলবায়ু পুনর্বাসন এবং ভূগর্ভস্থ পানির সংকটাপন্ন এলাকা চিহ্নিতকরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সময়ে পরিবর্তিত জলবায়ু পরিবর্তনের আলোকে এই সংযোজন এবং পরিবর্ধন একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তা ছাড়াও পানিসম্পদের, বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার রোধকল্পে ওই এলাকাকে সংকটাপন্ন ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত প্রশংসার দাবিদার। তা ছাড়াও পানিসম্পদের প্রতিবেশগত সেবার জন্য বাড়তি দাম পরিশোধ করা এবং অঙ্গীকারমূলক পানি ব্যবস্থাপনার কথাও বলা হয়েছে। এসব সিদ্ধান্ত আগেকার সময়ের মতোই যদি শুধু কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থাকে তাহলে তেমন কোনো লাভ হবে না। 

নীতিমালার ভিত্তিতে প্রণীত আইনের যদি সঠিক বাস্তবায়ন না হয় তাহলে দেশের জনগণ এবং পরিবেশ-প্রতিবেশের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না। তা ছাড়া প্রতিবেশগত সেবার জন্য দাম নির্ধারণের নাম করে যদি দেশের মানুষের ওপর বাড়তি কর আরোপ করা হয় তাহলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য এই নীতিমালা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে না এবং পানি খাত বেসরকারীকরণের পূর্ব ধাপ হিসেবেও বিবেচিত হবে। 
প্রস্তাবিত হালনাগাদকৃত পানি নীতিমালার আরও কিছু দুর্বলতা রয়েছে। যেমন প্রস্তাবিত নীতিমালায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, আর্সেনিকদূষণ এবং শিল্প-কৃষিদূষণের ওপর পর্যাপ্ত জোর দেওয়া হয়নি। অংশীজনদের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা (যেমন সমন্বয়হীনতা, অপর্যাপ্ত তথ্য) এখনও প্রকটভাবে বিদ্যমান, যা কিনা নতুন নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের পথে অন্তরায়। বাংলাদেশে পানিসম্পদ-বিষয়ক বিদ্যমান আইনি কাঠামোতে, যেমন ২০১৩ সালের পানি আইন, পানি অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় নাই এবং নিষ্কলুষ পানি আইন কিংবা নিরাপদ সুপেয় পানি আইন করার কোনো অঙ্গীকার কিংবা দিকনির্দেশনাও প্রস্তাবিত পানি নীতিমালায় সংযুক্ত করা হয়নি। 

উপরন্তু প্রস্তাবিত পানি নীতিমালাকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে তাতে জলবায়ু ঝুঁকি, আন্তঃসীমান্ত সকল নদীর পানি-পলিবিষয়ক দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে পানি-কূটনীতিকে পানি নীতিমালার অংশ করার প্রত্যয় ব্যক্ত এবং ভূপৃষ্ঠের পানিপ্রবাহের পরিমাণ, তার গুণাবলি ডিজিটাল মাধ্যমে সার্বক্ষণিক জনসমক্ষে প্রকাশের নীতিমালা গ্রহণ করা যেত। স্থানীয় সরকারকে ক্ষমতায়িত করে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং ‘দূষণকারীকে দূষণের মূল্যদান’ নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থাকা দরকার ছিল। 

প্রস্তাবিত পানি নীতিমালা হালনাগাদকরণের উদ্যোগ প্রশংসনীয় এবং ১৯৯৯ সালের পানি নীতিমালার তুলনায় এটি অনেক বেশি সময়োপযোগী। তবে বাস্তবতার নিরিখে এই নীতিমালা আরও সংশোধন ও সংযোজনের মাধ্যমে জাতীয় আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করা গেলে জনগণ এবং পরিবেশ-প্রতিবেশ উপকৃত হবে।

ড. মো. খালেকুজ্জামান: অধ্যাপক, ভূতত্ত্ব ও পরিবেশ বিজ্ঞান, কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া, যুক্তরাষ্ট্র; বৈশ্বিক সমন্বয়ক, বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট নেটওয়ার্ক (বেন)
 

আরও পড়ুন

×