রাজনীতি
মৌলবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতি
সেলিম জাহান
সেলিম জাহান
প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৩৫ | আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বর্তমান বিশ্বে মৌলবাদ একটি অতিপরিচিত শব্দ। এ পরিচিতির সঙ্গে মঙ্গলজনক বা ইতিবাচক কোনো চেতনা জড়িত নেই, বরং এর সঙ্গে সম্পৃক্ত নৃশংসতা, আদিমতা এবং ভয়াবহতা। জনমানসে তাই মৌলবাদীদের চিত্রটি এতটাই প্রতিষ্ঠিত যে এর কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। আসলে মৌলবাদ বিষয়টি সংজ্ঞার নয়, উপলব্ধির; বোঝাবার নয়, বুঝবার এবং ব্যাখ্যার নয়, চেতনার। সেই সঙ্গে মৌলবাদ বহুমাত্রিকতাসম্পন্ন–এটি শুধু ধর্মীয় নয়, শুধু স্থানীয় বা দেশীয় নয়, শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়। ধর্মের খোলসকে অবলম্বন করে বিস্তৃত হলেও মৌলবাদ ব্যাপ্ত রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সমাজ জীবনে। স্থানীয় বা দেশজ পরিবেশের বাইরে মৌলবাদীদের অবস্থান আন্তর্জাতিক বলয়ে। ব্যষ্টিক স্তর পেরিয়ে মৌলবাদ সোচ্চার সামাজিক স্তরে। মৌলবাদের তাই একটি সুসংজ্ঞায়িত সংহত রাজনৈতিক অর্থনীতি আছে, যার চিহ্নিতকরণ ও উপলব্ধি ছাড়া মৌলবাদের সর্বগ্রাসী রূপটি হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব নয়।
মৌলবাদের আপাত অর্থটি কিছু বড়ই নিরীহ। ব্যুৎপত্তিগত অর্থে মৌলবাদ মানে মূলের দিকে ফিরে যাওয়া। এ অর্থটি শুধু নিরীহ নয়, মহৎও বটে। শিকড় সন্ধান অতিশয় সাধুপ্রচেষ্টা। কিন্তু মেষচর্মে আবরিত বাঘের মতো মৌলবাদের একটি অন্তর্নিহিত অর্থ আছে। সে পরিপ্রেক্ষিতে মৌলবাদের আসল সত্যটি হচ্ছে মূলে ফিরে যাওয়ার নামে এক জাতীয় আদিম স্থবির গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে থাকা; সব রকমের প্রগতি ও সংস্কারের বিরোধিতা করা; সমুখ বা উদারপন্থি হওয়ার পরিবর্তে পশ্চাৎমুখী ও কূপমণ্ডূক হওয়া। ব্যুৎপত্তিগত সকল ব্যাখ্যার ঊর্ধ্ব মৌলবাদ সম্পর্কে এটাই হচ্ছে চরম বাস্তব সত্য। ফলে মৌলবাদ এক ধরনের রাহুচক্রের সৃষ্টি করে; যা মানবতা, প্রগতি ও সুন্দরের পরিপন্থি হয়ে দাঁড়ায় এবং উদার মানবিক চেতনা, প্রগতিশীল মূল্যবোধ এবং সমুখমুখী সংস্কারের ভিত্তি ও গতিময়তাকে শঙ্কাকুল করে তোলে। সুতরাং মৌলবাদের প্রকৃত স্বরূপ তার আপাত সংজ্ঞা থেকে ভিন্নতর ও ভয়াবহ।
প্রায়ই আমরা মৌলবাদকে শুধু এর ধর্মীয় মাত্রিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত করি। এ খণ্ডিত দৃষ্টিভঙ্গি বিভ্রান্তিমূলক। মৌলবাদের যারা ধারক, বাহক, তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বিস্তৃতি কিন্তু অনেক দূর–তাদের একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক লক্ষ্য থাকে, সেই সঙ্গে থাকে সুসংহত পরিকল্পনা ও সব লক্ষ্য অর্জনের জন্য কার্যক্রম। ধর্মকে তারা শুধু ব্যবহার করে আপাত হাতিয়ার হিসেবে, যেহেতু ধর্মের একটি সর্বজনীন আবেদন আছে সাধারণ মানুষের কাছে। অন্যদিকে ধর্মের প্রত্যক্ষ ব্যবহারের ফলে আমাদের দৃষ্টি সততই মৌলবাদের ধর্মীয় আঙ্গিকের ওপর নিবদ্ধ থাকে, এর সুদূরপ্রসারী ও গভীরতর ভয়াবহ লক্ষ্যগুলো আমাদের মনোযোগ এড়িয়ে যায়। এর অন্য মাত্রিকতা হচ্ছে, আমরা মৌলবাদকে একটি ব্যষ্টিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি–কখনও স্থানীয়, কখনও-বা দেশজ প্রেক্ষাপটে। অথচ মৌলবাদের আন্তর্জাতিক বলয়টিও গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। সুতরাং মৌলবাদের বিশ্লেষণ একটি সামগ্রিক প্রেক্ষাপট থেকে হওয়া প্রয়োজন। চূড়ান্ত বিচারে মৌলবাদ তাই সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্যসম্পন্ন ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়া একটি আন্তর্জাতিক চক্রান্ত; যা মানবতা, গণমুখিতা, সংস্কার, প্রগতি ও সৌন্দর্যবিরোধী এবং যার ফল বিপজ্জনক, ভয়াবহ ও সর্বগ্রাসী।
মৌলবাদ একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। নিরীহ ধর্মীয় আবেদনের আড়ালে এ রাজনীতির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। প্রথমত, দরিদ্র দেশ ও সমাজে মৌলবাদ একটি ভয়ংকর রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মৌলবাদ প্রায়ই দারিদ্র্য ও বঞ্চনার জন্য প্রগতি ও সংস্কারকে দায়ী করে। ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে একত্র করে পুরো সমাজ ব্যবস্থায় একটি অস্থিতিশীলতার জন্ম দেওয়াই মৌলবাদের অন্যতম রাজনৈতিক লক্ষ্য, যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৌলবাদীরা তাদের অবস্থানকে সুসংহত করে নেয়।
দ্বিতীয়ত, সংস্কার ও প্রগতি মূল-বিরোধী, এ যুক্তিতে মৌলবাদ সমাজের সব ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের বিরোধিতা করে। ফলে সমাজে প্রগতি ও সংস্কারের পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। প্রায়ই এ জাতীয় সংস্কার দারিদ্র্য ও বঞ্চনা দূর করার জন্য আবশ্যকীয় শর্ত। কিন্তু দারিদ্র্য ও বঞ্চনার অবসান নয়, বরং তার ক্রমাগত উপস্থিতি মৌলবাদের বর্ধন ও পরিপুষ্টির জন্য অত্যাবশ্যক। ফলে মূল-বিরোধী ধারা তুলে মৌলবাদ কাঠামোগত এবং আসল প্রগতিশীল সংস্কারের বিরুদ্ধে কাজ করে। তৃতীয়ত, মৌলবাদ দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে নিয়তি-বিশ্বাসী করে তুলতে চায় কিংবা এ জাতীয় বিশ্বাসকে পুঁজি করে। নিয়তি-বিশ্বাসের প্রথম প্রতিক্রিয়া মানুষের উদ্যোগ, প্রচেষ্টা ও সৃজনশীলতার অবসান। প্রক্রিয়াটি যখন ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়ে তখন মৌলবাদ তার বলয়ে একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আটকে দিয়ে তাদের শোষণ করে নানাভাবে। একটি জাতিকে নিয়তি-বিশ্বাসী করে তোলার যে রাজনীতি, তার অন্য নাম মানব উদ্যম ও সৃজনশীলতার অপমৃত্যু এবং ব্যাপারটি মৌলবাদের সংহতি ও প্রতিষ্ঠার জন্য একটি আবশ্যকীয় শর্ত।
চতুর্থত, মৌলবাদের রাজনীতি যে কাঠামোর মধ্যে কাজ করে, সেখানে গণতন্ত্র বা গণমুখিতার কোনো সুযোগ নেই। এ কাঠামোতে নেতা ও অনুসারীর সম্পর্ক আদেশ প্রদান ও আদেশ পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ, এখানে প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ নেই, গোপনীয়তা এ কাঠামোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ফলে এ রাজনীতি গণমুখিতাকে অনুমোদন করে না।

পঞ্চমত, মৌলবাদী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অন্যতম শিকার হচ্ছে কিশোর ও যুবসমাজ। সন্দেহ নেই, এ দুটো দলকেই তাতিয়ে দেওয়া এবং এদের মগজ ধোলাই সহজতর এদের বয়স ও অনভিজ্ঞতার কারণে। এ ক্ষেত্রে যে সূক্ষ্ম ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যটি কাজ করে তা হলো, একটি দেশের কিশোর ও যুবসমাজই দেশের ভবিষ্যৎ। তাই এদের মৌলবাদী করে তোলার মানেই দেশটির ভবিষ্যৎ নষ্ট প্রতিপন্ন ও সংকটের দিকে ঠেলে দেওয়া। এ ক্ষেত্রে পুরো দেশটিই নিয়তি-বিশ্বাসী হয়ে উঠবে, হারাবে উদ্যম ও কর্মপ্রচেষ্টা, সৃজনশীলতার ঘটবে অপমৃত্যু এবং সমাজ হবে একটি মৌলবাদী সমাজ। কিশোর ও যুবসমাজকে তাদের কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য করে মৌলবাদ সুপরিকল্পিত উপায়ে পুরো একটি সমাজকে ভবিষ্যতে পূর্ণ মৌলবাদী করার আকাঙ্ক্ষা রাখে।
ষষ্ঠত, মুখে যাই বলা হোক না কেন, রাজনৈতিক দিক থেকে মৌলবাদ সাম্প্রদায়িক। সাম্প্রদায়িক মৌলবাদের রূপের আড়ালে বিভিন্ন বিভাজিত বৈষম্যকে এড়িয়ে যাওয়া হয়। তাই নারী-পুরুষ বৈষম্য, সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর বৈষম্য, জাতিগত বৈষম্য, ধর্মীয় বিভাজনসহ নানা ধরনের বৈষম্য মৌলবাদ এড়িয়ে যায়। কারণ এসব বৈষম্যের সংস্কার ও অবসান মৌলবাদের রাজনীতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। অতএব, নারীর প্রজনন অধিকার, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা–এসব বিষয়ে মৌলবাদ সমর্থন করে না।
মৌলবাদের রাজনীতির মূল কথা হচ্ছে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে অন্ধবিশ্বাসের আফিম খাইয়ে প্রগতি ও সংস্কারবিরোধী একটি স্থির বলয়ে আবদ্ধ করে তাদের শোষণ করা। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মৌলবাদ তার রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করে এবং নিজে পরিপুষ্ট হয়। মৌলবাদের রাজনীতি মাকড়সার জালের মতো–চোখে দেখা যায় না; কিন্তু ভয়ংকরভাবে বিস্তৃত এবং ক্রমবর্ধমান।
মৌলবাদের অর্থনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এক ধরনের আত্মতোষণমূলক কাঠামো সৃষ্টি করা। এ জাতীয় আত্মতোষণ অর্থনীতিতে একটি নিম্ন পর্যায়ের স্থিতিশীলতা ফাঁদের জন্ম দেয়, যা থেকে প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়ন সম্ভব নয়। কিন্তু মৌলবাদী অর্থনীতি এ জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত বা নেতিবাচক বলে মনে করে এবং একটি আত্মতোষণ পর্যায়ে সন্তুষ্ট থাকে। অথচ সঠিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি ছাড়া দারিদ্র্য, বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়, এ সত্য মৌলবাদী অর্থনীতি এড়িয়ে যায়।
আত্মতোষণমূলক পর্যায়ে অর্থনীতিকে রেখে দিলে তার একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে যে বিশ্ব যেখানে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনীতি ক্রমশ পিছিয়ে পড়বে। সেই সঙ্গে এ জাতীয় অর্থনীতি বিশ্ব অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, যা আজকের পরস্পরনির্ভর বিশ্বে অচিন্তনীয়। এর আরেকটি মাত্রা হচ্ছে, মূলে ফিরে যাওয়ার নামে মৌলবাদ নতুন প্রযুক্তি, নতুন চিন্তাধারা–সবকিছুরই বিরোধিতা করে। ফলে শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি সম্ভব হয় না এবং সেই সঙ্গে সম্ভব হয় না দারিদ্র্য বিমোচন বা বাকি বিশ্বের সঙ্গে তাল রেখে চলা।
আজকের বিশ্বে সামগ্রিক মানব উন্নয়নকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার মূল কেন্দ্রবিন্দু বলে চিহ্নিত করা হয়। এ মানব উন্নয়নের একদিকে যেমন আছে মানবসম্পদ উন্নয়ন, অন্যদিকে রয়েছে মানুষের চয়ন স্বাধীনতার পরিসীমার বিস্তৃতি। কোন জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মৌলবাদ সমর্থন করে? আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এক আন্তর্জাতিক মানুষ নয়; বরং ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন একজন ব্যক্তি। এ জাতীয় মানুষকে কোনো অর্থেই মানবসম্পদ বলা চলে না। এ জাতীয় মানুষ নিয়তি-বিশ্বাসী, উদ্যমহীন ও অসৃজনশীল। অর্থনৈতিক উন্নয়নে এর অবদান শূন্য বা ঋণাত্মক। এর চেয়েও বড় কথা, এ জাতীয় মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রায়ই অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। পরজীবিতা তাই মৌলবাদের অর্থনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে মৌলবাদ অর্থনৈতিক অঙ্গনে মানুষের বাহ্যিক-স্বাধীনতার পরিসীমা বৃদ্ধি সমর্থন করে না স্বাভাবিকভাবেই।
মৌলবাদের অর্থনীতি নারী প্রগতি ও নারী উন্নয়নের বিরোধী। অর্থনৈতিক অঙ্গনে শ্রমশক্তিতে ক্রমবর্ধমান হারে নারীর অংশগ্রহণ, নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, উচ্চতর পদে নারীর অবস্থান–এর কোনোটাই মৌলবাদীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। নারীকে দমিয়ে রাখা ও পুরুষের প্রভুত্বের বিস্তারে মৌলবাদের অর্থনীতি বিশেষ ভূমিকা রাখে। বিশ্বের অর্ধেক মানুষকে দাবিয়ে রেখে কোনো জাতীয় অর্থনৈতিক কাঠামোর পূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়।
মৌলবাদের অর্থনীতি অতি নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত সন্ত্রাসের সঙ্গে। মৌলবাদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে লোকগ্রাহ্য হয় না। একে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে স্বার্থের প্রভাব-উপস্থিতি প্রয়োজন। কিছু স্বার্থের সঙ্গে অস্ত্র ও অস্ত্র ব্যবসার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে। সুতরাং ক্রমবর্ধমান অস্ত্রের ক্রয়-বিক্রয়, বেআইনি অস্ত্রের ব্যবসা ইত্যাদি মৌলবাদী অর্থনীতির অন্যতম দিক। এসব অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রচুর অর্থ ও সম্পদ। তার চেয়েও ভয়াবহ কথা হচ্ছে, প্রায়ই এসব অস্ত্র তুলে দেওয়া হচ্ছে শিশু-কিশোরদের হাতে ধর্মকে রক্ষা করার নামে।
মৌলবাদের অর্থনীতির অন্য একটি মাত্রিকতা হচ্ছে, বেসরকারি যেসব সংস্থা গ্রামাঞ্চলে সচেতনতা সৃষ্টি থেকে শুরু করে নারী উন্নয়ন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করে যাচ্ছে, তাদের বিরোধিতা করা। এ বিরোধিতার অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত স্পষ্ট। গ্রামের মানুষ যদি সচেতন হয়ে ওঠে, নারীরা যদি অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা অর্জন করে, তাহলে মৌলবাদীদের ভরাডুবি। অতএব, স্বাভাবিক কারণেই মৌলবাদ প্রগতিশীল বেসরকারি সংস্থাগুলোর বিরোধিতা করে।
মৌলবাদের রাজনৈতিক কাঠামো যেহেতু প্রচণ্ডভাবে পদ-ক্রমানুক্রমিকতানির্ভর, সুতরাং সেখানে অর্থনৈতিক জবাবদিহির ব্যাপারটি অনুপস্থিত। কীভাবে অর্থের জোগান হচ্ছে এবং কী প্রকারে অর্থ ব্যয়িত হচ্ছে, সে ব্যাপারে নেতার কোনো দায়বদ্ধতা নেই অনুসারীদের কাছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতি মৌলবাদী কাঠামোতে অর্থনৈতিক জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি গৌণ করে তোলে। নেতার চূড়ান্ত ক্ষমতা তাকে অর্থনৈতিক স্বেচ্ছাচারী করে তুলতে পারে অনায়াসে।
মৌলবাদের রাজনীতি ও অর্থনীতির একটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে এবং এটি ক্রমবর্ধমান। বিভিন্ন দেশে বা সমাজে অবস্থিত মৌলবাদী শক্তিগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং তারা একে অন্যের সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে সম্পর্কিত। রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার আদান-প্রদান এবং অর্থ ও অন্যান্য প্রকারের সহায়তার মাধ্যমে মৌলবাদী শক্তিগুলো একে অন্যকে নিবিড় পৃষ্ঠপোষক করে তোলে। সমগ্রের বিস্তার, অস্ত্রের গোপন চালান এ প্রক্রিয়ার অন্যতম দুটি দিক। মৌলবাদের নির্দিষ্ট কোনো ভূখণ্ড নেই, এর প্রয়োজন হয় না ছাড়পত্রের বা অনুমতির আন্তঃদেশীয় বিস্তারে। তবে নানা দেশে মৌলবাদের অবস্থানের কিছু হেরফের আছে। কোনো কোনো দেশে মৌলবাদ নতুন করে শিকড় গাড়ছে, কোথাও কোথাও মৌলবাদ তার পুরোনো অবস্থান সংহত করছে, কখনও কখনও মৌলবাদ আক্রমণাত্মক বিস্তৃত রূপ ধারণ করছে।
মৌলবাদ হচ্ছে এক ভয়াবহ অজগর বা রূপকথার সেই রাক্ষসের মতো, যার এক পা কাটলেও অন্য পা দিয়ে জাপটে ধরে বা যার এক মাথা কেটে ফেললেও অন্য মাথা জন্ম নেয়। কাটলেও সহজে মাথা বেরিয়ে আসে। চূড়ান্ত বিচারে মৌলবাদ হচ্ছে ভয়াবহতম এক সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ, যা জীবন, প্রগতি, সংস্কার, মানবতা ও সুন্দর-বিরোধী। শক্তি প্রয়োগে একে রোধ করা যায় না, স্বল্পমেয়াদি চেষ্টায় একে হয়তো কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু নির্মূল করা যায় না। এর মৃত্যুঘণ্টা বাজানোর একটাই শর্ত–সমবেত প্রচেষ্টায় শক্ত হাতে এর পরিপূর্ণ মূল উৎপাটন ও বিনাশ।
ড. সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি,
নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
- বিষয় :
- রাজনীতি