বাজেট
ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টিন এবং কালো টাকা সাদা করার তেলেসমাতি
জাকারিয়া স্বপন
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ২২:০৯
একই সঙ্গে মন ভালো আর খারাপ করার গল্প বলি!
এই বাজেটে যখন বলা হলো, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে টিন নম্বর দিতে হবে, তখন মনটা ভালো হয়েছিল। বাজেটের আগে যখন শুনেছিলাম, এখন থেকে আর কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকবে না, তখনও মনটা ভালো হয়েছিল। আবার যখন দেখলাম, দুটি সিদ্ধান্ত থেকেই সরকার সরে এসেছে, তখন মনটা আবার খারাপ হয়ে গিয়েছিল!
অবশ্য সোমবার জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কালো টাকা সাদা করার বিধান প্রত্যাহারের প্রস্তাব এনেছেন (সমকাল অনলাইন, ২৯ জুন ২০২৬)।
ব্যক্তিগত জীবনে, বাংলাদেশের কাছে চাইবার আমার কিছু নেই। এই দেশ আমাকে অনেক দিয়েছে। তবে দেশটা ভালো পথে চলুক, উন্নতি করুক, মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হোক, দরিদ্র মানুষগুলো তাদের জীবনটা আরেকটু স্বাচ্ছন্দ্যে কাটাক, তাদের বাচ্চাগুলো ভালো লেখাপড়া করুক– এগুলো দেখতে ভালো লাগে। যখন মনে হয়, দেশটা সেই পথে এগোচ্ছে, মনটা ভালো থাকে। এটুকুই চাওয়া। আমার চারপাশের অসংখ্য মানুষকে দেখেছি, তাদের চাওয়াটুকুও একই রকম। সাধারণ মানুষের এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার নেই। কিন্তু এই সামান্য চাওয়াটুকু খুবই অসামান্য হয়ে ওঠে বাংলাদেশে। নানা ধরনের চাপে সে ঠিক পথে থাকতে পারে না। তখন অন্য সবার মতো, আমারও মন খারাপ হয়।
আজকে তেমন দুটি বিষয় নিয়ে লিখে রাখি। আমি জানি, এই লেখার পরই কোনো সিদ্ধান্ত পাল্টে যাবে না। তবে যারা পড়বেন, তারা হয়তো আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি দেখতে পাবেন।
ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টিন নম্বর বিতর্ক
একটি আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা, বৈষম্যহীন ব্যবস্থা তৈরি করতে হলে ভালো সিস্টেম তৈরির কোনো বিকল্প নেই। একটি সমাজ যত বেশি সিস্টেমের ওপর নির্ভর করতে পারবে, তত বেশি বৈষম্যহীন হবে। এ টুকু বোঝার জন্য বিশাল সমাজ বিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নেই।
একজন নাগরিক যদি জানেন, সে কি পেতে পারে, আর কি পেতে পারে না– এবং সেটা সবার জন্য সমান, তাহলেই সেটা একটা ভালো সমাজ, ভালো রাষ্ট্র। আর এই ধরনের সেবা যদি নিশ্চিত করতে হয়, তাহলে লাগবে সঠিক সিস্টেম। একজন রোগীর সেবা পেতে যদি প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করতে হয়, তখন বুঝতে হবে আমাদের সিস্টেম ব্রোকেন। এখনও সিস্টেম তৈরি হয়নি।
একটি ছোট ভূখণ্ডে যখন এত বেশি মানুষের চাপ, সেখানে তো সিস্টেম আরও বেশি লাগবে। কারণ, একটু রিসোর্সের জন্য হাজার হাজার মানুষ ছুটছে। কেবল ভালো সিস্টেমই পারে, এই ধরনের এলোমেলো ব্যবস্থাকে সঠিক পথে আনতে। সঠিক সেবা নিশ্চিত করতে।
ব্যাংক খাতে টিন যুক্ত করা ছিল তেমন একটি সিস্টেম তৈরির একটি পিলার। যখন দেখছিলাম, এটা করা হবে– তখন মনটা ভালো হয়েছিল এটা ভেবে যে, দেশ আরেকটু সিস্টেমের দিকে এগুলো। একটি আধুনিক রাষ্ট্রে, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ট্যাক্স বা জাতীয় পরিচয়ের যোগাযোগ থাকবে না, সেটা কীভাবে হতে পারে?
বাংলাদেশে আমি অসংখ্য মানুষকে চিনি, যারা তাদের ড্রাইভারের নামে, কাজের লোকের নামে, কিংবা গ্রামের দরিদ্র আত্মীয়দের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে সেগুলো নিজেরা ব্যবহার করেন। লোন নেন, বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন করেন। কিছুদিন আগে অর্থমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, দেশে প্রায় ১৯ কোটির বেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে। তিনি বলেননি, কত কোটি মানুষ এই ১৯ কোটি অ্যাকাউন্টের মালিক। আর তিনি বলিননি, কত কোটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টিন নম্বর নেই।
এই বাড়তি তথ্য দুটি হয়তো কেউ চায়নি। আমার খুব জানার ইচ্ছে। কোনো একজন সংসদ সদস্য কি দয়া করে এই তথ্যটুকু চাইতে পারেন। তাহলে বেশ ভালো একটি বিশ্লেষণ করা যেত।
দরিদ্র মানুষের টিন থাকবে না, তাই তারা ব্যাংকিং সেবার বাইরে চলে যাবে– এই যুক্তিতে টিন নম্বর নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হলো। ঠিক আছে, সবাইকে টিন দিতে হবে না। তবে নিচের প্রস্তাবটুকু অন্তত প্রয়োগ করুন।
ক. সবাইকে এনআইডি অথবা টিন নম্বর যে কোনো একটি দিতে হবে। এটা ব্যাংক হোক, কিংবা যে কোনো আর্থিক সেবা হোক (এমএফএস ওয়ালেট ইত্যাদি)।
খ. এনবিআর সাধারণ নাগরিকদের আর টিন দেবে না। তাদের এনআইডি হবে টিন নম্বর। আর যাদের এনআইডি নেই, তারা নতুন করে আবেদন করে টিন নম্বর নেবে (যেমন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিদেশি নাগরিক ইত্যাদি)।
এটুকু করতে পারলে, সিস্টেম তৈরিতে বাংলাদেশ একটু এগিয়ে গেল। এক দিনে তো আর সব হবে না। তবুও এক বছরে এইটুকু হোক।
কালো টাকা সাদা করার উপায়!
সরকার যখন বলছিল, তারা কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখতে চায় না, তখন মনটা এই কারণে ভালো হয়েছিল যে, যাক এই নতুন সরকারের কিছুটা হলেও মেরুদণ্ড আছে। তারা বাইরের চাপের কাছে মাথা নিচু করছে না। কিন্তু আমার সেই মন ভালোটা বেশি দিন টিকল না।
যখন কালো টাকা বন্ধ নিয়ে আলোচনা চলল, তখন কিছু কিছু ব্যবসায়ী সমালোচনা শুরু করলেন! তাদের কথাবার্তা শুনে বুঝতে পারলাম, তাদের ব্যবসায় কালো টাকা প্রভাব ব্যাপক।
এমন চরম একটি অন্যায় আবদার আমাদের কেন মেনে নিতে হবে? এর অর্থ কি এই দাঁড়াল না যে, এই দেশে ঘুষ আর দুর্নীতি ছাড়া বড়লোক হওয়া যাবে না? এটাই কি বাংলাদেশ নয়? এটাই কি গত ৫০ বছরে গড়ে ওঠেনি? সেই প্রথা কি আমাদের আরও চলতে দিতে হবে?
যদি কোনো একজন অর্থনীতিবিদ আমাকে একটু বুঝিয়ে বলতে পারেন, কালো টাকা ছাড়া এই দেশে কোন কোন খাতের ব্যবসা হবে না, আমি সেদিন এই দেশ নিয়ে ভাবনাটা ছেড়ে দেব, এই দেশে নিজের নামে কোনো সম্পদ করব না, ঘরবাড়ি বানানোর চিন্তাটাও মাথা থেকে ফেলে দেব!
একদিকে আমরা ভালো সিস্টেমের কথা বলি, আর পাশপাশি পুরো জাতিকে (বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে) দেখাচ্ছি, চুরি কর!
এই সিস্টেম কি আমরা কখনই পাল্টাতে পারব না, নাদির আলী?
পুনশ্চ: ময়মনসিংহে আমার পৈতৃক ভিটে ছাড়া নামে/বেনামে পৃথিবীর কোথাও আমার কোনো জমি কিংবা ঘরবাড়ি নেই!
জাকারিয়া স্বপন: তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ
zs@priyo.com
- বিষয় :
- বাজেট
- কালো টাকা সাদা