দক্ষিণ এশিয়া
সুপ্রতিবেশীসুলভ যে দৃষ্টান্ত ভারত স্থাপন করতে পারে
খাজা মাঈন উদ্দিন
খাজা মাঈন উদ্দিন
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০০ | আপডেট: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৩:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
আগস্টের আকস্মিক ঢল যেভাবে নেপালের জনপদ ভাসিয়ে নিল, তা বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ সতর্কবার্তা। ভাবতে পারি, যদি আমাদের উজানে, ভারতে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ওপর নির্মিত বাঁধগুলো ভেঙে যায় কিংবা নদীর পানি ফুলে-ফেঁপে উঠে বিস্তীর্ণ দুই কূল ছাপিয়ে যায়, তখন কী উপায় হবে ভাটির বাংলাদেশের মানুষের?
এ রকম শঙ্কা থেকেই ভারতের একটি বিদ্যুৎ ও পানি সংরক্ষণ প্রকল্পের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনতা প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। ফলে সে দেশের সরকার প্রকল্পটির বাস্তবায়ন স্থগিত রেখেছে। ১৩ বিলিয়ন ডলারের ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রজেক্ট’ (এসইউএমপি) নেওয়া হয়েছিল চীনের তিব্বতের ভাটিতে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে।
এ ধরনের কোনো প্রকল্প যদি দুই দেশের মধ্যকার অভিন্ন নদীগুলোর যে কোনোটির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে, তা যে বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে– তাতে সন্দেহ থাকার সুযোগ নেই।
উজানে ঠিক কতগুলো পয়েন্টে পানি প্রত্যাহার কিংবা জলবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প, বাঁধ ও ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়েছে, তার কোনো সরকারি তথ্য নেই আমাদের কাছে। অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন বা প্রত্যাহার বিষয়ে যৌথ অববাহিকার দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা করতে ভারতের অনীহা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। ভাটিতে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো থেকে পানি প্রত্যাহারের কারণেও নয়াদিল্লিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ততটা সমালোচনার মুখে পড়তে হয়নি। কিন্তু এর ফলে বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী বাংলাদেশ নামক অনন্য ব-দ্বীপটি হয়তো তার চিরায়ত বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলবে একসময়।
এখন পর্যন্ত নদী নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মাত্র একটি চুক্তি রয়েছে– গঙ্গা পানি বণ্টন। এই চুক্তির মেয়াদও শেষ হতে যাচ্ছে চলতি বছর। ফেনী ও কুশিয়ারা নিয়ে দুটি সমঝোতা রয়েছে, কিন্তু সেগুলোরও প্রয়োজন ও কার্যকারিতা নিয়ে আছে প্রশ্ন।
সিয়াং প্রকল্পের কারণে ভারতের আসাম রাজ্য এবং ভাটির দেশ বাংলাদেশ ভয়াবহ পানি সংক্রান্ত, পরিবেশ এবং কৌশলগত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, প্রায় ১১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে পরিকল্পিত প্রকল্পটি তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো নদীতে চীনের বিশাল ‘মেডগ প্রকল্পে’র পাল্টা প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা হিসেবে হাতে নিয়েছিল ভারত।
এই বাঁধ নির্মাণের পক্ষে এমন কিছু যুক্তি খাড়া করা হচ্ছে, যেগুলো প্রথম চোটেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। বলা হচ্ছে, ‘এই বাঁধ জমিয়ে রাখা পানি শুষ্ক মৌসুমে ছেড়ে দেবে, যা পানির নিম্নস্তরকে স্থিতিশীল রাখবে এবং আসাম ও ভাটির দেশ বাংলাদেশে কৃষি ও গৃহস্থালির কাজে মিঠাপানির জোগান নিশ্চিত করবে।’ তবে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নদী বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আদতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় হুট করে অতিরিক্ত পানি ছাড়ার কারণে ভাটিতে আকস্মিক প্লাবন এবং নদীর তলদেশে ব্যাপক পলি জমার ঝুঁকি তৈরি করবে।
সিয়াং প্রকল্পের মতো অবকাঠামো যদি হিমবাহ গলা প্লাবন বা চীনের ইচ্ছাকৃত পানি ছেড়ে দেওয়ার ধাক্কা সামলাতে পারে, তবে বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের মতো ভাটির উন্নয়ন প্রকল্পের বিরোধিতা করার পেছনে নয়াদিল্লির নৈতিক যুক্তিটা কোথায়? বরং সিয়াংয়ের বাঁধ বাংলাদেশের ক্ষতি করবে; পক্ষান্তরে তিস্তা ব্যারাজ তো ভারতকে স্পর্শ করবে না!
অন্যদিকে আসামের জনবসতিতে আঘাত হানার আগেই উজানের যে কোনো ধাক্কা সামলানোর জন্য যদি সিয়াংয়ের এই বিশাল জলাধার নির্মাণের চিন্তা করা হয়ে থাকে, তবে স্থানীয় মানুষ কেন এটাকে এতটা সন্দেহ করছে?
সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ‘সিয়াং ইন্ডিজেনাস ফার্মারস ফোরাম’ এবং ‘আদি বানে কেবাং’-এর মতো স্থানীয় সংগঠনগুলো ব্যাপক উচ্ছেদ, গ্রাম প্লাবিত হওয়া এবং তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কা করছে এবং এ প্রকল্পের প্রাথমিক সমীক্ষায় বাধা দিচ্ছে।

এর আগে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অবলম্বন সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর প্রধান উৎস বরাক নদের ওপর ‘টিপাইমুখ বাঁধ’ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল ভারত। মণিপুর রাজ্যে প্রস্তাবিত এক হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের সেই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি অবশ্য স্থানীয় পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের মুখে স্থগিত রয়েছে।
অরুণাচলের বিতর্কিত মেগা প্রকল্পটি অবস্থিত সক্রিয় এক ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে। ফলে যে কোনো কাঠামোগত ত্রুটি বা বিশাল জলাধার থেকে হঠাৎ পানি ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা আসামের সমভূমি এবং বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলে আকস্মিক এবং বিপর্যয়কর বন্যা ডেকে আনতে পারে।
সুতরাং সিয়াং প্রকল্পের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ সরাসরি জড়িত। তিব্বত থেকে উৎপন্ন হয়ে ‘ইয়ারলুং সাংপো’ নামে প্রবাহিত হয়েছে সিয়াং নদীটি। এরপর আসামে প্রবেশ করে এটি ব্রহ্মপুত্র নদের মূল প্রবাহে পরিণত হয়। ব্রহ্মপুত্র বাংলাদেশে প্রবেশ করে যমুনা নাম ধারণ করেছে এবং আরও ভাটিতে গঙ্গার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এই সিয়াং-ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকায় ভারত ও বাংলাদেশের প্রায় ১৩ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা এই নদীর ওপর নির্ভরশীল।
তাই ভাটির দেশ বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্নকারী আন্তঃসীমান্ত নদীর প্রবাহকে প্রভাবিত করে, এমন যে কোনো অবকাঠামো নির্মাণকে পানি বণ্টন ও নদী ব্যবস্থাপনার আনুষ্ঠানিক আলোচনার অপরিহার্য অংশ করা বাঞ্ছনীয়।
কী আশ্চর্য! দিল্লি এখন বিহারের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের জলবিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপনের জন্য দিনাজপুরের ওপর দিয়ে একটি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণে ঢাকার সহযোগিতা চাইছে! এই জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে সেই নদীগুলোতে বাঁধ দিয়ে, যেগুলোর ন্যায্য পানির হিস্যা থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত।
এ কাজ কি একটি প্রতিবেশী দেশকে বারবার শোষণ করার শামিল নয়? শেখ হাসিনার শাসনামলে দিল্লি বাংলাদেশকে যে লাইন অব ক্রেডিট দিয়েছিল, তার একটি অংশ ছিল বাংলাদেশের রাস্তাঘাট নির্মাণের জন্য; যে রাস্তা আবার ভারত ব্যবহার করার কথা কোনো ট্রানজিট ফি না দিয়েই। অথচ ভারতকে করিডোর দেওয়ার বিষয়টি তখন দেশের মানুষের কাছে ছিল এক অপ্রিয় সিদ্ধান্ত।
দক্ষিণ এশিয়ায় জ্বালানি সহযোগিতার বড় বড় বুলি আওড়ানো ব্যক্তিরা যুক্তি দেন, প্রস্তাবিত ভারত-দিনাজপুর আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ নেপাল ও ভুটান থেকে সস্তায় জলবিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ পেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই দুটি দেশকে বিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি নিতে হবে। তাহলে ভারতের আদানির কাছ থেকে কেনা চড়া দামের বিদ্যুতের ভবিষ্যৎ কী হবে? এই বিশেষজ্ঞরা কিন্তু প্রশ্ন তোলেন না, বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল) মোটরযান চুক্তিটি এত ঢাকঢোল পেটানোর পরও কেন কার্যকর হতে পারল না?
হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলো যেহেতু একই প্রতিবেশগত ব্যবস্থায় বসবাস করে এবং বাতাস ও পানির মতো প্রকৃতির অভিন্ন সম্পদ ভাগাভাগি করে, তাই যৌথ কল্যাণের জন্য একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। তবে বহুপক্ষীয় কাঠামোর মাধ্যমে পানি বণ্টন বিরোধের সমাধান হবে– সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। এবং ভাটির দেশ বাংলাদেশের ক্ষতি করা বন্ধ হয়ে যাবে– এমন আশা করাও কঠিন।
চীনের মেডগ প্রকল্প নিয়ে ভারতের নিজের উদ্বেগ যেমন রয়েছে, তেমনি নয়াদিল্লির সামনে সুযোগ এসেছে বাংলাদেশের সঙ্গে অভিন্ন নদীর পানি ন্যায্যতার ভিত্তিতে বণ্টনের জন্য একটি ‘আমব্রেলা অ্যাকর্ড’ সই করে সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করার।
খাজা মাঈন উদ্দিন: সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
khawaza@gmail.com
- বিষয় :
- খাজা মাঈন উদ্দিন